এক সাহাবির প্রেম

0
60

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

এক সম্ভ্রান্ত সাহাবি ও এক মহিলার মাঝে জাহেলি যুগে প্রেম-সম্পর্ক ছিলাে। যখন ইসলামের শুভাগমন ঘটলাে, তখন সে সাহাবি ইসলাম কবুল করলেন।একদিন এক সঙ্কটময় মুহূর্তেএকে অপরের সাথে দেখা; তা ছিলাে খুবই কোমল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত এবং নিজ-দেশে থেকে অনেক দূরে; ফলে মহিলার সাথে তিনি যে কোনাে আচরণ করতে পারতেন। কে সেই সাহাবি? ঐ মহিলার সাথে তার কী হয়েছিলাে? ঐ অবস্থা থেকে আল্লাহ তাকে কীভাবে রক্ষা করলেন? তার সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান কী ছিল? এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কি কোরআনে কোনাে আয়াত নাযিল করেছেন?

তিনি হচ্ছেন সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ আল-গনাবি রা.। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন এবং ইসলামের খুঁটিগুলাে মযবুত করে সাহাবায়ে কেরামকে ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দিতে শুরু করলেন তখন একেক সাহাবি একেক কাজে লেগে গেলেন; যেমন হাদিস মুখস্থ, হাদিস লেখা, যুদ্ধাভিযানে বের হওয়া ইত্যাদি।

সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ রা. ছিলেন কর্মতৎপর বীর-বাহাদুর বলিষ্ঠ একজন পুরুষ। তিনি ভালােভাবে হাদিস আয়ত্ত করতে পারতেন না, যেমন আবু হুরায়রা রা, করতে পারতেন; কিন্তু তিনি অন্যসব কাজে বেশ পারদর্শী ছিলেন; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফের কোরাইশদের নিকট মুসলিম বন্দিদের উদ্ধার করতে পাঠাতেন। মুসলিম বন্দিদের সেখানে হাত-পা বেঁধে রাখা হত। তিনি এসে দেয়াল টপকিয়ে ঘরে ঢুকে একজন একজন পিঠে বহন করে দূরে কোনাে এক নিরাপদ স্থানে এনে বাঁধন খুলে দিতেন। এরপর তাদেরকে মদিনায় পালাতে সাহায্য করতেন। কোরাইশ ও মুসলিমদের মাঝে তখনাে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। কোরাইশরা মুসলিমদেরকে বন্দি বা অপহরণ করার চেষ্টায় থাকত। একবার কাফের কোরাইশদের একটি দল তদোদ্দেশ্যে মদিনার দিকে আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার পাশে সদকার উট চড়াতে দিতেন। কোরাইশের সে দলটি আক্রমণ করেউটগুলাে চুরি করে নিয়ে যায়; সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী কসওয়া এবং একজন মুসলিম নারীকে নিয়ে যায়, যে ঐ সময় উট চড়াচ্ছিলাে; কিন্তু আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন, তাই সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। মুসলিমরা তাদের উপর যুলুম করত না, বরং তারাই প্রথম মুসলিমদের উপর যুলুম করে যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

যারা তােমাদের উপর যুলুম করবে তােমরাও তাদের উপর ঐ পরিমাণ যুলুমের বদলা গ্রহণ করাে যে পরিমাণ তােমাদের উপর যুলুম করেছে। আর তােমরা আল্লাহকে ভয় করাে এবং জেনে রাখাে যারা দীনদারপরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন।’ [সুরা বাকার: ১৯৪]

অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:আর মন্দের বদলা অনুরূপ মন্দ দ্বারাই দেওয়া হবে।” অর্থাৎ তােমরা আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করবে আমরাও তােমাদের সাথে সেরূপ আচরণ করব। তাে মারসাদ রা. মুসলিম বন্দিদের চুরি করে মুক্ত করেন।‘ [সুরা শুরা: ৪০]

একদিন মারসাদ রা. মক্কার উদ্দেশ্যে বেরুলেন। যে বাড়িতে একজন মুসলিম বন্দি ছিলাে, সে-বাড়ির দিকে চুপেসারে অগ্রসর হতে হতে বাড়ির কাছে এসে পড়লেন। এরপর বাড়িতে তিনি ঢুকতে যাবেন অমনি তাঁকে এক মহিলা দেখে ফেলল; তার নাম ইনাক। এই মহিলাই জাহেলি যুগে মারসাদ রা.-এর প্রেয়সী ছিল। যখন একে অপরকে দেখে ফেললাে,তখন তিনি দেয়ালের ছায়ায় লুকালেন; চাঁদের আলােতে তখন দেয়ালের ছার পড়েছিল। মহিলা তার কাছে এসে বলল, মারসাদ! স্বাগতম, তােমার আগমন শুভ হােক! তিনি কথা না বলে চুপ করে রইলেন। মহিলা বলল, হে মারসাদ! আসাে, একসাথে রাত কাটাই। তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যভিচার হারাম করেছেন; অথচ তখন তিনি নিজ-ভূমি থেকে দূরে অন্য গ্রামেপাহাড়ের উপত্যকায় ছিলেন। রাতের আঁধারে দেয়ালের ছায়ায় লােকচক্ষুর অন্তড়ালে ছিলেন; আল্লাহ ছাড়া তাকে কেউ দেখছিলাে না। তিনি আত্মগােপন করে আছেন। এক দিকে ঐ মুসলিম বন্দি মুক্তির অপেক্ষায় আছে, অপর দিকে এ মহিলা তাকে ডাকছে এবং তিনি ভিনদেশে আছেন। এখানে এমন কোনাে মুসলিম বা অমুসলিম নেই যে তাকে পর্যাবেক্ষণ করবে।তিনি আল্লাহকে পরােয়া না করে যদি তা করতে চাইতেন তবে অতি সহজেই তা হয়ে যেতাে; কিন্তু তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যভিচার হারাম করেছেন। সে বলল, আরে এসাে, এখানে আমাদের কেউ দেখবে না। তিনি বললেন, না; হে ইনাক! আল্লাহ তাে ব্যভিচার হারাম করেছেন। মহিলা বলল, এসাে, নইলে চিৎকার এইতাে দিলাম…।

তিনি মহিলার সামনে থেকে দৌড় দিবেন, অমনি সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, হে কোরাইশের লােকেরা! হে কোরাইশের লােকেরা! এই যে এই লােক তােমাদের বন্দিদের ছিনিয়ে নিতে এসেছে, সে তােমাদের বন্দিদের নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তাকে ধরাে…। এই আওয়ায শুনে অনেকেই সেদিকে ছুটে গেল এবং তাকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল; কিন্তু ততক্ষণে তিনি এক বাগানে লুকিয়ে পড়েছেন। কিছুক্ষণ পর যখন খোঁজাখুঁজি বন্ধ হয়ে গেল, তখন আবারও তিনি ঐ বাড়িতে আসলেন। আপনারা এমন সাহসিকতা কি কখনাে দেখেছেন না শুনেছেন!? তিনি একথা বলেননি, আলহামদুলিল্লাহ, কোনাে রকম প্রাণে বেঁচেছি; বরং তিনি বলেছেন, আমার একটা লক্ষ্য আছে; যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে আমি মক্কায় এসেছি তা পূর্ণ না করে আমি মক্কায় যাচ্ছি না; তাই তিনি মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে বলেন নি, আলহামদুলিল্লাহ, তারা তাে আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল। আল্লাহ আমকে বাঁচিয়েছেন, আমি কোনাে রকম জান নিয়ে মদিনায় ফিরতে পেরেছি। বরং তিনি আবার এসে দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েন এবং বন্দিকে পিঠে বহন করে দরজা খুলে বের হয়ে আসেন। তারপর দূরে এক নিরাপদ স্থানে এসে বন্দির বাঁধন খুলে দিলেন। এবার তারা মদিনা পানে হাঁটা শুরু করলেন।

বেশ কয়েকদিন চলার পর তাঁরা মদিনায় এসে পৌছলেন। মক্কা-মদিনার মাঝে পাঁচশত কিলােমিটার দূরত্বের পথ। তাঁরা এ পুরাে সফরে কখনাে গিরিপথআর কখনাে মরুপথ অতিক্রম করেছেন। এখন আপনি মারসাদ রা. ও তাঁর সঙ্গী সাহাবির চিত্রটি একটু মনে ধারণ করুন, বিস্ময়ে ভরে যাবে আপনার মন। তারা কখনাে পায়ে হেঁটে, কখনাে উটের পিটে চড়ে আরােহণ করেছেন। অপর দিকে মারসাদ রা. মক্কা মদিনার এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন আর তার মন-মগজে ইনাকের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং স্মরণ হচ্ছে রাতের ঐ নিরালামুহূর্তের কথাও। আবার পূর্বের দুঃখ-কষ্ট ও ভালােবাসার স্মৃতিগুলােও তাঁর মনে ফের জেগে উঠছে। তিনি পায়ে হাঁটছেন বা উটে আরােহণ করছেন, তাঁর মন শুধু সে মহিলাকে নিয়েই ভাবছে। এভাবে একদিন-দুইদিন করে অতিবাহিত হচ্ছিল আর মদিনা কাছে আসছিল। অবশেষে তারা মদিনায় এসে পৌছলেন।

বন্দি পরিবারের কাছে গেল আর মারসাদ রা. মসজিদে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং ঘটে যাওয়া সবকিছুর বিবরণ দিলেন। তিনি ঐ মহিলাকে ভালােবাসেন এবং তাঁর সাথে পুর্ব-সম্পর্কের কথাও জানালেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি ইনাককে বিয়ে করতে পারি? তাকে স্ত্রী-রূপে গ্রহণ করতে পারি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, হে মারসাদ! আল্লাহ ব্যভিচার হারাম করেছেন। তিনি (মারসাদ রা.) বললেন, আমি কি তাকে কি বিয়ে করতে পারি? তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-

ব্যভিচারি পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিবাহ করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে।‘ [সুরা নূর: ৩] 

আল্লাহ তাআলা পূর্ণাঙ্গ সমাধান নাযিল করলেন। মারসাদ রা. প্রথমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুধু পরামর্শ করতে এসেছিলেন; কিন্তু সেখানে এসে পূর্ণাঙ্গ সমাধান পেয়ে গেলেন। এটাই শরয়ি নিয়ম। মানুষ যখন কোনাে সমস্যায় পড়বে, তখন কর্তব্য হল কোনাে অনুগ্রহশীল ও কল্যাণকামী মুরব্বি বা শায়খের কাছে তা পেশ করা। অথবা মা-বাবা বা কোনাে বুঝমান বড় ভাইয়ের কাছে বলা, যে তাকে কোনাে অন্যায় কাজে প্ররােচিত করবে না; যাতে সমস্যার সমাধান হয়। মারসাদ রা. যখন অনুভব করলেন, তার মন পূর্বের অবস্থার দিকে ঝুঁকছে তখন তিনি মনকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেননি। বরং তিনি মনের ডাক্তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। গিয়ে সবকিছু খুলে বলেছেন। তিনি বলেছেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি একটি প্রেমরােগে আক্রান্ত হয়েছি। ইনাকের প্রতি আমার ভালােবাসা উথলে উঠতেছে। আমি ইনাককে বিয়ে করে ফেলি? তাকে বিয়ে করব কি? তাে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উত্তরণের সরাসরি পন্থা বলে দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হল, এটা কি তাঁর ও ইনাকের মধ্যকার সমস্যার সমাধান? ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী নারী বা মুশরিক নারীকেই বিবাহ করবে।’ এ আয়াতের কী অর্থ? এ আয়াত কি শুধু একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, না আমাদেরকে কোনাে ফিকহি বিধান সম্পর্কে জানান দিচ্ছে? এটাও আমাদেরকে ভলােভাবে বুঝতে হবে, যাতে আমরা যথাযথভাবে সমস্যার সুরাহা করতে পারি।

ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেবিবাহ করবে।” [সুরা নুর: ৩]

আল্লাহ তাআলার এ বাণীর অর্থ, যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে; তা থেকে তাওবা করে না। তার সাথে যে নারী বিবাহে সম্মত হয় সে ব্যভিচারিণী নারীর মতই অনিষ্ট হবে। এটা কীভাবে? অবশ্য এর অর্থ এটা নয় যে, ঐ নারীর ব্যভিচারের গােনাহ হবে; কিন্তু এ ব্যক্তি যখন সহবাস ও মেলামেশা করবে, তখন সে স্ত্রী ও বেশ্যা নারীদের মাঝে কোনাে পার্থক্য করবে না। সে একবার স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে, অন্যবার অন্য নারী সাথে মিলিত হবে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এর মাঝে আর তার মাঝে শুধু একটি শরয়ি বন্ধন রয়েছে। সুতরাং সে তার দৃষ্টিতে অন্যান্য বেশ্যা নারীর মতই মনে হবে; ফলে সেও বেশ্যা নারীর মত হয়ে যাবে। এর অর্থ এ নয় যে, তার ব্যভিচারের গােনাহ হবেঅথবা সে কোনাে মুশরিকা নারীকে বিবাহ করবেযে তার সাথে কোনাে ব্যভিচারী পুরুষ মিলিত হওয়া পছন্দ করে যেমন তার সাথে তার স্বামী মিলিত হয়।এ কারণে যে ব্যক্তি ব্যভিচারী বলে পরিচিত (আল্লাহর পানাহ) তার কাছে কাউকে বিবাহ দেওয়া ঠিক নয়। এমন হুকুম ঐ নারীর ব্যাপারেও প্রযােজ্য হবে, যার ব্যভিচারী হওয়ার বিষয়টি সমাজে পরিচিত; তাকে বিবাহ করা ঠিক হবে না।

অবশ্য যে তাওবা করে ভাল হয়ে গেছে এবং অবস্থার সংশােধন হয়েছে তার কথা ভিন্ন। আর যে পুনরায় তাতে ফিরে যাবে,আল্লাহ তার প্রতিশােধ নিবেন।আল্লাহ যখন তাওবার কারণে শিরিকসহ অন্যান্য সব বড় গুনাহ ক্ষমা করে দেন, তখন ব্যভিচারের গােনাহের ব্যাপারে আপনার কী ধারণা? অনুরূপ কথা ব্যভিচারিণী নারীর ক্ষেত্রেও। যখন সে তাওবা করে ভালাে হয়ে যাবে এবং তার অবস্থার সংশােধন হবে তখন তাকে কোনাে মুমিন বিবাহ করতে পারবে; কিন্তু তাওবার পূর্বে যে তাকে বিবাহ করবে তাকেও ব্যভিচারী হিসাবে মনে করা হবে।

তাে, যখন কোনাে ব্যক্তি দীনি বিষয়ে সমস্যার কারণে অন্যের কাছে যায় তখন সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। সাহাবায়ে কেরাম রা.এর মনে কোনাে বিষয়ে খটকা-দ্বিধা বা সন্দেহ লাগলে সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সমাধান চাইতেন। পূর্বের ওলামায়ে কেরামও এভাবে তাদের শায়খদের কাছে যেতেন। ছাত্ররা ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর কাছে এসে সমস্যার কথা জানাতেন। বলতেন,শায়খ! আমার মনে এমন এমন কথা অনুভব করছি। এর কোনাে সমাধান আছে কি? এভাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়িরহিমাহুমুল্লাহর কাছেও তাদের ছাত্ররা আসততা এবং সমস্যার সসন খুঁজতাে।

এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: আর যখন তাদের কাছে কোনাে শাস্তি বা ভীতিকর কোনাে সংবাদ পৌঁছে, তারা তা (যাচাই না করেই) প্রচার শুরু করে দেয়।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন: আর যদি তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবা তাদের কর্তৃত্ববান লােকদের কাছে নিয়ে যেতাে, তাহলেতাদের মধ্যে যারা তথ্যানুসন্ধানী তারা এর যথার্থতা জেনে নিতাে। এবং (হে মুসলিমগণ!) তােমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত না হতাে, তাহলে তােমাদের অল্প কতিপয় লােক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ শুরু করতাে!‘ [সুরা নিসা: ৮৩]

আল্লাহ তাআলা আদেশ করছেন যে, যখন কোনাে ব্যাপারে সমস্যা দেখা দিবে তখন কর্তব্য হবে সেই ব্যাপারটি নিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দারস্থ হওয়া। তাঁর জীবদ্দশায় যেমনটি সাহাবায়ে কেরাম করতেন। আর তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁদের কর্তৃত্ববান, আলেম-উলামা বা জ্ঞানী-গুণীজনদের শরণাপন্ন হওয়া। যেনাে তারা ব্যাপারটির সমাধান করে দেন।

এ কারণে হানজালা রা.-এর মনে যখন কোনাে বিষয়ে খটকা লাগতাে তখন তিনি সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হতেন অথবা যিনি সমাধান দিতে পারবেন তাঁর কাছে বিষয়টি শেয়ার করতেন। একবার আবু বকর রা.-এর সাথে হানাজালা রা. দেখা করলেন। তাঁকে বললেন, হানজালা তাে মুনাফেক হয়ে গেছে! আবু বকর রা, তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাে কীভাবে হলে? তিনি বললেন, যখন আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি; জান্নাতজাহান্নাম সম্পর্কে তার আলােচনায় আমার অন্তর এতটা বিগলিত হয়, যেনাে জান্নাত-জাহান্নাম আমার সামনে উপস্থিত; কিন্তু যখন তার কাছ থেকে চলে এসে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে হাসি-রসিকতা করি তখন এর অধিকাংশটাই ভুলে যাই। আবু বকর রা. বললেন, এমন অবস্থা তাে আমিও অনুভব করি। যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি তখন আমার কলব এতটাই নরম হয়, যেনাে আমি জান্নাতজাহান্নামের সামনে অবস্থান করছি; কিন্তু সেখান থেকে চলে গেলে সেই নম্রতা আর বাকি থাকে না।

পাঠক! এটি একটি স্বভাবজাত ব্যাপার। আপনি যখন সালাত আদায় করবেন বা দোয়া-দরুদ পড়ে কাঁদবেন তখন আপনার মন স্বভাবতই নরম হবে। আর যখন সালাত বা দোয়া শেষ হবে তখন আপনার মন আগের অবস্থায় ফিরে যাবে;ঐ নরম অবস্থা আর থাকবে না, অথবা অন্ততপক্ষে কিছুটা হলেও কমে যাবে। তাে আবু বকর (রা.) হানজালা (রা.) কে বললেন, চলাে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাই।

বর্তমানে আলেম-উলামার সাথে যােগাযােগ করা এবং তাঁদের কাছে সমস্যার কথা বলা সহজ হয়ে গেছে, কারণ বিভিন্ন মজলিসে এবং নামায পড়তে গিয়ে বা মােবাইল ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাদের সাথে কথা আদান প্রদান করা অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। কোনাে প্রসিদ্ধ আলেম বা কোনাে প্রসিদ্ধ দায়ির কাছে যাওয়া শর্ত নয়। যিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন, আপনি তার কাছে যাবেন না। বরং আপনি প্রত্যেক এমন বক্তির কাছে যান যার কাছে শরয়ি ইলম আছে, যদিও তিনি তেমন একটা প্রসিদ্ধ নন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল, যার কাছে আপনি যাবেন তার কাছে যেনাে এই পরিমাণ শরয়ি ইলম থাকে, যা দিয়ে তিনি আপনার সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। যেমন হানজালা রা. আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়েছিলেন, কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনাে কখনে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপস্থিতিতে আবু বকর রা.-এর শরণাপন্ন হয়ে বলেছিলেন, হানজালা তাে মুনাফেক হয়ে গেছে।

যাই হােক, এরপর তাঁরা উভয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলেন। হানজালা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! হানজালা তাে মুনাফেক হয়ে গেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কীভাবে? তিনি বললেন, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি আর আপনি জান্নাত-জাহান্নামের আলােচনা করেন, তখন আমাদের কলব এতটা নরম হয় যেনাে জান্নাত-জাহান্নাম আমাদের সামনে উপস্থিত। অন্যদিকে যখন আপনার কাছ থেকে চলে আসি এবং স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে হাসিমজা করি, তখন আমরা এর অনেকটাই ভুলে যাই। হানজালা রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি অন্তঃকরন সমস্যাকে খােলাখুলিভাবে পেশ করেছেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তৎক্ষণাত এর সমাধান করেছেন। তিনি যদি ব্যাপারটিকে আমলে না নিতেন, মনের ভিতর রেখে দিতেন এবং মন থেকে এর কল্পনা-জল্পনা বের করে দিতেন, তবে হয়তাে এটিই তাঁকে প্রকৃত নেফাকের দিকে নিয়ে যেতাে। অথবা তিনি একসময় বলতেন, আমি তাে মুনাফেক। আমি সালাত সিয়াম করব কেনাে? হয়তাে শয়তান তাকে এতদূর পর্যন্ত ঠেলে দিতাে; কিন্তু তিনি কাল বিলম্ব না করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে গেছেনএবং বলেছেন, আপনার কাছে থাকাকালীন আমাদের অন্তর নরম থাকে; আপনার কাছ থেকে চলে গেলে অন্তর পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে হানজালা! আমার কাছ থেকে যাওয়ার পরও যদি তােমাদের সে অবস্থাই থাকত, তাহলে ঘর-বাড়ি এবং পথে-ঘাটে ফেরেশতারা তােমাদের সাথে মােসাফাহা করত; কিন্তু হে হানজালা! এটা একসময় আর ওটা ভিন্ন। সময়। অর্থাৎ একটা সময় ভয়-ভীতি আর কান্নাকাটি হবে; আরেকটা সময় হাসি-রসিকতা আর আনন্দ-বিনােদন হবে।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদেরও কর্তব্য হবে মারসাদ রা.-এর মত কাজ করা। সমস্যা নিয়ে সরাসরি কোনাে কল্যাণকামী-হীতাকাক্ষী আলেম বা মুরব্বির কাছে যাওয়া। তাই কোনাে যুবক বা যুবতী কোনাে সমস্যায় পড়লে করণীয় হবে সত্বর কোনাে অভিজ্ঞ বিশ্বস্ত আলেম বা শায়খের কাছে যাওয়া। আর এদের কর্তব্য হবে মনােনিবেশের সাথে তাদের সমস্যার কথা শােনা এবং সমস্যা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করা; বিশ্বস্ততা ও কর্তব্যপরায়ণতার পরিচয় দেওয়া। তাহলে তাদের সমস্যা আর সামনে এগুবে না এবং সব জায়গায় তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হবে না। আর সাবধান! আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ রাখুন এবং এর একান্ত বিষয়টিকে ঝেড়ে ফেলুন; যাতে অন্য কেউ এ গােপন বিষয় সম্পর্কে জানতে না পারে।

পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে মিনতি! তিনি যেনাে আমাদের সকলকে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদেরকে উপকৃত ও উপকারী হিসেবে মনােনীত করেন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ৩০৩ – ৩১২

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন