আল-আসমায়ি রহিমাহুল্লাহ এক মহাসাফল্যের গল্প

0
56

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

মানুষের বিভিন্ন স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তাকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখিনও হতে হয়। তাবে তাদের মধ্যে যারা সেই সকল বাধা পেড়িয়ে সামনে এগুতে থাকে সে-ই সফল হয় এবং সে-ই তার স্বপ্নের চূড়ায় পৌছতে পারে। সুতরাং মানুষের মধ্যে কেউ তার স্বপ্ন পূরণের জন্যে সকলধরনের কষ্ট-মাশাক্কাত সহ্য করে, আবার কেউ কষ্ট দেখে গর্তে লুকাতে চায়।

আর সফলতা তাে বলা হবে তখনই যখন তা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছানাে হবে। স্বপ্ন-পাহাড়ের চূড়ায় পৌছানাের ক্ষেত্রে মানুষের হিম্মত ও মনােবল বিভিন্নধরনের হয়ে থাকে। তাদের কেউ পাহাড়ের কিছুটা উঠে নেমে যায়, কেউ চার ভাগের একভাগ, কেউ চার ভাগের তিনভাগ উঠে নেমে যায়; কিন্তু কিছু কিছু মানুষ থাকে যাঁরা তাঁদের লক্ষ্যের চূড়ায় পৌছানাের আগ পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না। যখন সে চূড়ায় পৌছে কেবল তখনই অনুভব করে যে, সে কিছুটা সফল।

প্রতি বিষয়েরই একটা চূড়া রয়েছে, যেমন পড়ালেখার চূড়া, ব্যবসাবাণিজ্যের চূড়া, আবিষ্কারের চূড়া, হিফযুল কুরআনের চূড়া, বয়ান বক্তৃতার চূড়া, সন্তান লালন-পালনের চূড়া, পরিবারের সাথে উঠা-বসা, চলা-ফেরার আদব-আখলাকের চূড়া, এক কথায় প্রতিটি বিষয়েরই একটা সর্বোচ্চ চূড়া রয়েছে; কিন্তু মানুষ তার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্নভিন্ন হয়ে থাকে।

এখন আমরা এ বিষয়ে অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছার ক্ষেত্রে আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমায়ি রহ.-এর আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনবাে। যদিও ইলমের প্রতিটি শাখায় আসমায়ির বিচরণ ছিলাে; কিন্তু তার প্রসিদ্ধি ছিলাে ভাষাবিধ হিসেবে।

আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমায়ির যদিও ইলমের প্রায় প্রতিটি বিষয়ে অনেক দক্ষতা ছিলাে; কিন্তু তিনি একজন ভাষাবিদ হিসেবেই বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমি এখন আপনাদের সামনে যে ঘটনা উল্লেখ করবাে তা শায়খ তানুখি তার ‘আল ফারায বাদাশ শিদ্দাত নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমায়ি বসরায় বসবাস করতেন, তিনি ছিলেন ইলম-পিপাসু। তিনি প্রতিদিনই কোনাে না কোনাে ইলমের শায়খের নিকট ইলম শিখার জন্যে যেতেন। আজ তাফসিরের শায়খের কাছে, কাল হাদিসের শায়খের কাছে, এর পরের দিন সাহিত্যের শায়খের কাছে, এভাবে একেক দিন একেক শায়খের নিকট গিয়ে ইলম শিক্ষা করতেন। ইলমের দিকে অধিক মনােযােগী হওয়ার কারণে তিনি রুজি-রুজগারের প্রতি মন দিতে পারতেন না।

তার বাড়ির পাশেই ছিলাে এক সজি-বিক্রেতার দোকান। আসমায়ির বাড়িটি ছিলাে এলাকার একেবারে শেষ মাথায়, বাড়ি থেকে বের হয়ে মসজিদ অথবা শায়খদের নিকট যাওয়ার পথে সজি-বিক্রেতার দোকান পড়তাে এবং সজি-বিক্রেতার সাথে তার দেখা হতাে। শায়খ আসমায়ির বয়স তখন বিশ বছরের কম। প্রতিদিন যাওয়া আসার পথে সজি-বিক্রেতা তাকে জিজ্ঞেস করতাে আসমায়ি! তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ? আসমায়ি বলতেন, আমি এখন আমার তাফসিরের শায়খের নিকট তাফসির শিখার জন্যে যাচ্ছি। এরপর বিকেলে ফিরে আসার সময় তাকে আবার প্রশ্ন করতাে, আসমায়ি তুমি এখন কোথা থেকে এলে? তিনি বলতেন, আমি এখন আমার সাহিত্যের শায়খের নিকট থেকে আসলাম। পরদিন সকালে আবার তাকে জিজ্ঞেস করতাে, তুমি এখন কোথায় যাও? তিনি বলতেন, আমি আমার হাদিসের শায়খের নিকট হাদিস লিখতে যাচ্ছি। এভাবে প্রতিদিন তার যাওয়া-আসার সময় সজি-বিক্রেতা তাকে প্রশ্ন করতাে, কোথায় যাচ্ছ? কোথা থেকে এলে? আর তিনিও তাকে উত্তর দিতেন, অমুক শায়েকের নিকট যাচ্ছি, অথবা অমুক শায়েখের কাছে থেকে এলাম।

শায়খ আসমায়ি এভাবেই ইলম অর্জনের পিছনে তার দিন-রাত মেহনত করছেন। এমন সময় একদিন সেই সজি বিক্রেতা তাঁকে বলল, আসমায়ি তুমি কি এভাবে এঁদের পিছনে ঘুরে ঘুরে তােমার সময় নষ্ট করাে না? ফলে তুমি এঁদের থেকে কিছুই পাবে না। আসমায়ি বললাে, আমি ইলম অর্জন করছি, কুরআন মুখস্থ করছি, ভাষা শিখছি, কবিতা শিখছি। লােকটি তাকে আবারও বললাে, তুমি তােমার সময় নষ্ট করাে না। আসমায়ি বললাে, না; এতে আমার সময় নষ্ট হয় না বরং আমার উপকার হয়। এবার সজি-বিক্রেতা তাঁকে বললাে, আসমায়ি আমার একটা মতামত শুনবে? (ভাই! তুমি একবার লক্ষ কর, উঁচু মনােবল আর নিচু মনােবল কাকে বলে?) এই যে, তুমি সকাল-বিকাল কষ্ট করে যে কিতাবগুলাে বহন করাে, (তখনকার কিতাব এখনকার মত এতাে ছােটছােট ও সুন্দর সুন্দর ছিলাে না। তখনকার কিতাব ছিলাে অনেক বড়। দোয়াতের কালি দিয়ে বড় বড় করে লেখা। উস্তাদ দরসে হাদিস বলতেন আর ছাত্র দোয়াতে কলম ভিজেয়ে মােটা মােটা কাগজে লিখতাে।

এখনকার মত পকেট থেকে ছােট ও সুন্দর কলম বের করে নােট বুকের মধ্যে লেখা যেতাে তাই তাঁদের একদিনের দরসের লেখা হয়ে যেতাে অনেক, কখনাে কখনাে তা মাথায় করে বহন করতে হতাে। আর আসমায়ি রহ. সকাল-বিকালে তাঁর লেখা বইগুলাে নিয়ে শায়খের দরসে আসা-যাওয়া করতেন।) সজি-বিক্রেতা তাকে বলল, আমার একটা মতামত শুনবে? এই যে তােমার কিতাবগুলাে তুমি সকাল-বিকেল যা কষ্ট করে বহন করে নিয়ে যাও সেগুলাে আমাকে দিয়ে দাও, বনিময়ে আমি তােমাকে কিছু সজি দিব। আসমায়ি বললেন, আমি তােমাকে তা দিব না আর আমার কাছে এর সমতুল্য কিছুই নেই। তখন লােকটি তাকে ঠাট্টা করে বলল, আসমায়ি শুনাে! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তিনি বললেন সেটা কী? তুমি তােমার সকল কিতাবগুলাে নিয়ে এসাে এবং সেগুলােকে বড় একটা বালতির মধ্যে পানি দিয়ে ভিজাও, অতঃপর আমি তােমার সাথে একত্র হয়ে দেখবাে সেখান থেকে কীধরনের রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালাে?

আসমায়ি বলেন, আমি তখন ছিলাম ছােট বালক, তাই আমি চুপ করে বাসায় ফিরে গেলাম। এরপর থেকে আমি ফজরের পূর্বেই বাড়ি থেকে বের হতাম, যাতে করে বের হওয়ার সময় সজি-বিক্রেতার সাথে আমার দেখা না হয় এবং তার সাথে আমার কথা বলতে না হয়। এবং রাতে ইশার পর যখন সজি-বিক্রেতা তার দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যেতাে তখন আমি বাড়িতে ফিরতাম, যাতে করে সে আমাকে দেখতেই না পায়। আসমায়ি রহ. বলেন, এরপর কঠিন দরিদ্রতা আমাকে ঘিরে ফেলে, যার ফলে আমি আমার বাড়ির আসবাবপত্র, বিছানা-পাটি সবকিছুই বিক্রি করে দিলাম, এমনকি আমি আমার পরনের একটিমাত্র জামা রেখে বাকি সবগুলাে বিক্রি করে দিলাম। এরপর আমার অবস্থা দিন দিন আরাে খারাপ হতে লাগলাে; আমার মাথার চুল লম্বা হয়ে গেল, গােসল না করতে করতে শরীরে ও কাপড়ে ময়লা জমে গেল, কারণ চুল কাটার মত ও গােসল করার মত কোনাে টাকা আমার ছিলাে না। অর্থাৎ আমি খুবই কঠিনভাবে জীবন কাটতে লাগলাম।

আমার যখন এই অবস্থা তখন একদিন বসরায় নিজ গ্রামে হাঁটছি, তখন হঠাৎ একলােকের চিকার শুনতে পেলাম; সে বলছে, কে আসমায়িকে চিনে এবং আমাকে আসমায়ির নিকট নিয়ে যাবে? কে আসমায়িকে চিনে এবং আমাকে আসমায়ির নিকট নিয়ে যাবে? তখন মানুষ আমার দিকে ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিল। অতঃপর সে আমার নিকট এলাে এবং আমাকে দেখে বলল, তুমিই কি কবি সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ আসমায়ি? আমি বললাম, হাঁ আমিই আসমায়ি ।তখন সে বললাে, আমি বসরার আমির মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশিমির নিকট থেকে এসেছি, তিনিই আমাকে তােমার নিকট পাঠিয়েছেন। তিনি তােমাকে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন; কিন্তু তুমি তাে এই অবস্থা ও এই চেহারায় তার। সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। তােমার অবস্থা খুবই নােংরা, চেহারায় ময়লা, কাপড়গুলাে ময়লা ও নােংরা, চুলগুলাে বড়বড় ও এলােমেলাে; অনেক দিন থেকে কাটা হয় না।

অর্থাৎ তুমি এই অবস্থায় আমিরের সাথে দেখা করতে যেতে পারাে না। আমি তাকে বললাম আল্লাহর শপথ, গােসলখানায় গিয়ে গােসল কার মত সামর্থ্য আমার নেই। আগের যুগে বিভিন্ন জায়গায় বড়বড় গােসলখানা থাকত, মানুষ সেখানে গিয়ে টাকা দিয়ে গােসল করতে হতাে। সেখানে ঠান্ডা পানি, গরম পানি উভয়টার ব্যবস্থা থাকত। থাকত সাবান-শ্যম্পুর ব্যবস্থাও, টাকার বিনিময় মানুষ সুবিধা ক্রয় করে নিত। অর্থাৎ আমার কোনাে টাকা নেই যে, আমি তা দিয়ে গােসলখানায় গিয়ে গােসল করবাে এবং আমার এমন সামর্থ্যও নেই যে, আমি সেলুনে গিয়ে চুল কাটাবাে। তখন লােকটি বললাে, ঠিক আছে তুমি এখানে অপেক্ষা করাে, আমি আসছি। অতঃপর সে আমিরের নিকট ফিরে গেল এবং কিছুক্ষণ পর এসে বলল, এই নাও এক হাজার দিরহাম; এটা আমির পাঠিয়েছেন, এটা দিয়ে তুমি তােমার অবস্থার পরিবর্তন করাে, তারপর আমার সাথে এসাে। তখন আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ! এটা বরকতের শুরু মাত্র।

সে কিন্তু তখনও জানে না যে, আমির তার কাছ থেকে কী চায়? সে বলে, অতঃপর আমি তার থেকে টাকাগুলাে নিয়ে ভাল কাপড় কিনলাম, সেলুনে গিয়ে চুল কাটালাম, গােসলখানায় গিয়ে গােসল করলাম, অতঃপর আমিরের নিকট গেলাম। সে আমাকে দেখে বলে তুমি কি কবি ও সাহিত্যিক আসমায়ি? আমি বললাম, হাঁ।

সে বলল, খলিফা হারুনুর রশিদ নিজ ছেলের শিক্ষা-দীক্ষার জন্যে একজন কবি, সাহিত্যিক ও আলেমের জন্যে আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। আমি মানুষের কাছে জানতে পেরেছি যে, তুমি কবি সাহিত্যিক, পড়তেও পারাে লিখতেও পারাে। সুতরাং তুমি চাইলে খলিফার ছেলের ব্যক্তিগত শিক্ষক হতে পার। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি রাজি। তখন সে আমাকে বললাে, এই নাও তােমার পথের খরচ; তুমি বাগদাদে চলে যাও। সে বলে অতঃপর আমি আমার বাড়িতে ফিরে এলাম এবং সেখানে থাকা আমার সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে নিলাম এবং একজনকে আমার বাড়ি দেখাশুনার দায়িত্বে দিয়ে বাগদাদে চলে গেলাম। অতঃপর আমি বাগদাদে গিয়ে খলিফার সাথে দেখা করলাম। খলিফা আমার আদব-আখলাক, কবিতা ও কবিতার ভাষা-অলঙ্কার দেখে খুবই আশ্চর্য এবং খুশি হলেন।

এই লােকটি দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে পৃথক করে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইলমের মজলিসে হাঁটু গেড়ে বসেছিলাে এবং নিজ মেহনতে নিজের কথা বলার স্টাইল, কবিতা ও ভাষার প্রচলিত রীতির মধ্যে পরিবর্তন এনেছেন এবং নতুন এক সাহিত্য-রীতি চালু করেছেন। যারা জীবনে পরিবর্তন আনতে চায়, ভাষায় পরিবর্তন আনতে চায় আমি তাদেরকে তাঁর কিতাব পড়তে বলি, তাঁর কাছ থেকে শিখতে বলি।

সে যখন খলিফার সামনে গেলেন, খলিফা তার আদব-আখলাক কবিতা ও কবিতার ভাষালঙ্কার দেখে খুবই বিস্মিত ও খুশি হলেন। এবং তাকে বললেন, আমি চাই তুমি আমার ছেলের শিক্ষক হবে এবং তার শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নিবে। সে বলে, অতঃপর রাজপ্রাসাদে আমার থাকার জন্যে একটা কামরা ঠিক করা হল এবং আমি শাহজাদাকে পড়ানাে শুরু করলাম। আসমায়ি খলিফার নিকট কয়েক বছর থেকে তার ছেলেকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিল, সে তাকে ভাষা শিখায়, কুরআনুল কারিম হিফয করায়, কবিতা শিখায়। আসমায়ি বলেন, খলিফা আমার জন্যে একটা বেতন নির্ধারণ করেন; কিন্তু বেতনটা ছিলাে আমার প্রয়ােজনতিরিক্ত, কারণ আমার থাকা-খাওয়াসহ সকল খরচ খলিফার প্রাসাদ থেকেই ব্যবস্থা করা হত।

তাই আমি আমার বেতনের টাকা জমা করে বসরায় আমার গ্রামে পাঠিয়ে দিতাম। এবং সেখানে আমার ছােট বাড়িটির পরিবর্তে বড় একটা বাড়ি ক্রয় করলাম। অতঃপর মানুষজন এসে খলিফার নিকট প্রেরণ করার জন্যে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন চিঠি-পত্র এবং আবেদন-দরখাস্ত লিখিয়ে নিত, কারণ আমার ভাষা ছিলাে অনেক উচ্চাঙ্গের ও আবেদনপূর্ণ, যার মাধ্যমে তারা খলিফার কাছ থেকে তাদের উদ্দিষ্ট বস্তু হাসিল করতে পারতাে আর এজন্যে তারা আমাকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কিছু একটা দিত। আমি খলিফার ছেলের গৃহ-শিক্ষক হওয়ার কারণে খলিফার নিকট যেকোন সময় যেতে পারতাম, তাই বিভিন্নজন আমার মাধ্যমে খলিফার কাছে তাদের প্রয়ােজনের কথা জানাতাে এবং তারা অনেক সময় খুশি হয়ে আমাকে অনেক কিছু দিত। এভাবে আমার অনেক সম্পদ হয়ে গেল আমি তা দিয়ে আমার গ্রামে একটি ফসলের ক্ষেত ও অনেকগুলাে বাগান ক্রয় করলাম।

তিনি বলেন, একদিন খলিফা আমাকে বললেন, আমি চাই আমার ছেলে জুমআর খুত্ব দিবে, এটা কি সম্ভব? আমি বললাম, হাঁ অবশ্যই সম্ভব। তখন তার ছেলের বয়স ছিলাে সতের-আঠার বছর। আর এটা আসমায়ি তাকে সাত বছর পড়ানাের পরের ঘটনা। সে বলে, আমি শাহজাদাকে একটা খুৎবা মুখস্থ করালাম এবং তাকে বারবার তা অনুশীলন করালাম। অতঃপর এক জুমআর দিন সে মিম্বারে আরােহণ করলাে এবং খুবা দিল, মানুষ তার খুৎবা শুনে খুবই আশ্চর্য হল। তার খুৎবার প্রতিটি দিকই ছিলাে খুবই উঁচু মানের ভাষা বক্তব্য ও বিষয়বস্তু; সবকিছুই চমৎকার সুন্দর। এরপর চার দিক থেকে আমার নিকট সম্পদ আসা শুরু করলাে, কারণ মানুষ তখন জেনে ফেলেছে যে, আমি তাকে এতাে সুন্দর করে শিক্ষা দিয়েছি।

এরপর একদিন খলিফা আমাকে বলল, হে আবদুল মালেক আলআসমায়ি! আল্লাহ তাআলা তােমার হায়াতে বরকত দান করুন। আমার ছেলে কুরআন হিফয করেছে, কবিতা ও অলঙ্কার-শাস্ত্র শিক্ষা করেছে, হাদিস শিখেছে এবং এখন সে আমার সভাসদদের একজন। আমি মনে করি তার সাথে আর তােমাকে থাকতে হবে না। এখন তুমি কি আমাদের নিকট থেকে যাবে? তাহলে তােমাকে অভিনন্দন। আর বসরায় ফিরে যেতে চাইলে যেতে পার। আমি বললাম, আমি বসরায় ফিরে যাব। তখন সে বলল, আমার কাছে তুমি যা ইচ্ছে তাই চাইতে পরাে, আমি তােমাকে তা দিব। আমি বললাম, আল্লাহ আপনার হায়াতে বরকত দান করুন, বসরার আমার বাড়ি আছে, বাগান আছে, আমার আর কিছুরই প্রয়ােজন নেই। তখন তিনি বললেন, না বরং আমি তােমাকে এই উট ও গবাদি পশুগুলাে দিচ্ছি।

অতঃপর সে আমার সাথে অনেকগুলাে উট ও কোনাে ইচ্ছে থাকলে আমাকে বল। আমি বললাম, ঠিক আছে আমার একটা আকাভক্ষা হল, আপনি বসরার আমির মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমিকে একটা চিঠি লিখে পাঠাবেন যে, সে যখন আমার আগমনের কথা শুনবে তখন নিজ লােকজন নিয়ে আমাকে অভিনন্দনের জন্যে এগিয়ে আসবেন এবং বসরার সকল লোক তার প্রাসাদে তিন দিন আমাকে সালাম করবে ও অভিনন্দন জানাতে আসবে। অর্থাৎ তিনি নিজের জন্যে কিছুটা সম্মান কামনা করলেন। খলিফা বসরার আমিরের নিকট চিঠি পাঠাল। অতঃপর বসরার আমির মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমি লােকজন নিয়ে আসমায়ির আগমনের অপেক্ষা করতে লাগলাে।

এরপর যখন তারা আসমায়ির আগমনের কথা শুনতে পেল, তাকে অভিনন্দন জানানাের জন্যে শহরের বাইরে এলাে এবং তাকে যথাযথ সম্মান করে অভিনন্দন জানাল। মানুষজন তার অপেক্ষায় ছিল। আমিরের কাছ থেকে তিনি তার প্রাসাদে চলে এলেন, সেখানে প্রথম দিন বসরার বড়বড় ব্যবসায়ী এবং সম্মানিত লােকজন তাকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলাে। এর পরের দিন তাদের চেয়ে যারা নিম্ন পর্যায়ের তারা তাঁকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলাে। আর তৃতীয় দিন সাধারণ মানুষ তাকে অভিনন্দন এবং সালাম জানাতে আসল।

আসমায়ি বলেন, মানুষ যখন আমাকে সালাম করছে এবং অভিনন্দন জানাচ্ছে, তখন আমি তাদের মধ্যে এক লােককে দেখলাম খুবই জীর্ণশীর্ণ পােশাকে, মুজা ব্যতীত শুধু চটি জুতা পরে আমাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে, যার চেহারা থেকেই দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। সে যখন আমার কাছে আসলাে এবং আমাকে সালাম করে বলল, হে আবদুল মালেক! অর্থাৎ সে আমাকে কোনাে ধরনের উপাধি ছাড়াই আমার নাম ধরে ডাকল। আমি একথা শুনে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, কারণ খলিফা ব্যতীত কেউ আমাকে কোনাে খেতাব ছাড়া শুধু আমার নাম ধরে ডাকে না। সুতরাং তার ডাক শুনে আমার খলিফার কথা মনে পড়ে গেল, কারণ খলিফা আমাকে শুধুমাত্র আবদুল মালেক বলে ডাকতেন। শাহজাদার শিক্ষক ফযিলাতুশ শায়খ এধরনের কোনাে লকব ব্যতীত শুধু আবদুল মালেক বলেই ডাকতেন।

সুতরাং তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকে চিনতে পারলাম এবং তাকে আমি বললাম, তুমি কি সেই সজি-বক্রেতা নও?সে বললাে, হাঁ। আমি বললাম, তােমকে করা আমার সেই নসিহত কি তােমার মনে আছে যে, আমি তােমাকে বলেছিলাম, তােমার সকল কিতাব একত্র করে একটি বড় বালতির মধ্যে রেখে তার উপর পানি ঢাললা এবং আমরা দেখবাে তার থেকে কোন রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালাে? তােমার কি সেই নসিহত মনে আছে? সে বললাে, হাঁ আমার মনে আছে। আমি বললাম, হাঁ আমিও তােমার কথামতাে আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলাে পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি, অতঃপর তা মুখস্থ করে আমার অন্তরের মধ্যে রেখে দিয়েছি, অতঃপর তার উপর আমার আগ্রহ ঢেলে, আমার সময়কে হেফাযত করে তা বারবার পড়েছি এবং যথাসাধ্য পরিশ্রম করেছি। অতঃপর সেখান থেকে যা বের হয়েছে তা তাে তুমি দেখতেই পাচ্ছাে। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদা তাে আছেই।

হাঁ, ইলম মানুষকে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই একবার সম্মান দান করে। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেছেন : তােমাদের মধ্যে যারা ইমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। তােমরা যা কিছু করাে আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।‘ [সুরা মুজাদালাহ, আয়াত : ১১]

অনেক উলামায়ে কেরাম বলেন এখানে মর্যাদা দ্বারা উদ্দেশ্য হল আখেরাতের মর্যাদা এবং সাথে সাথে দুনিয়ার মর্যাদাও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মর্যাদাকে বৃদ্ধি কর দেন, কারণ তাঁরাই হল দেশের প্রধান সম্পদ। আসমায়ি যদি কবিতা, ভাষা ও সাহিত্য আয়ত্ত করা; ভাষা ও সাহিত্যে তার সমসাময়িক অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে তার এতাে মর্যাদা হয়ে থাকে, তাহলে তােমার কি মনে হয় যারা কুরআন, হাদিস ও ফিকহ আয়ত্ত করবে এবং মানুষের মাঝে ফাতওয়া দিবে, পরস্পরের মাঝে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা করবে তাদের মর্যাদা কতটা উপরে হবে? নিঃসন্দেহে সেটা তাে আরাে উত্তম; আরাে মর্যাদাবান, কারণ একজন ইমাম, একজন ফকিহ- কবি ও সাহিত্যিকের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম।

লােকটি আসমায়ির সামনে এসে দাঁড়াল, আর তখন তিনি তাকে বললেন, হাঁ আমি তােমার কথামতাে আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলাে পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি। অতঃপর তা মুখস্থকরে আমার অন্তরে স্থান দিয়েছি এবং এর উপর তা পড়েছি এবং কঠোর পরিশ্রম করেছি।

অতঃপর সেখান থেকে যে রত্ন বের হয়েছে তা তাে তুমি দেখতেই পাচ্ছ। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদা তাে আছেই। তখন সজি-বিক্রেতা তাকে বলল, আমি তােমার কাছে একটি কাজ চাচ্ছি, আশা করি তুমি আমাকে একটা কাজ দেবে। তােমার সকল কিতাব একত্র করে আমাকে দাও, আমি তার বিনিময়ে তােমাকে কিছু সজি দেব; একথা বলার পরিবর্তে লােকটি তাঁকে বলছে, তােমার কাছে আমাকে একটা কাজ দাও। আসমায়ি বলেন, আমি তখন তাকে আমার একটা বাগানের প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করলাম।

হে ভাই! আপনাদের সকলের প্রতি আমার একটা বার্তা হল।

‘তুমি খেজুর চিবিয়ে খেতে পারাকে মর্যাদার মনে করাে না। তুমি যতক্ষণ তােমার ধৈর্যকে চেটে খেতে না পারবে, ততক্ষণ মর্যাদার আসনে পৌছতে পারবে না।’

সুতরাং যে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছতে চায়, তাকে অবশ্যই কোনাে একটা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এবং সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে তার সামর্থ্যের পুরােটা দিয়ে ধৈর্যের সাথে মেহনত করতে হবে। হােক তার লক্ষ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে চূড়ায় পৌছবে অথবা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বা ইলমের ক্ষেত্রে। তার লক্ষ্য যেটাই হােক তাকে চূড়ান্তভাবে মেহনত করে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে; তাহলেই সে ঐ বিষয়ের চূড়ায় পৌছতে পারবে।

হে ভাই, তুমি আজ যে হাফেযে কুরআনকে দেখাে, মানুষ যার তেলাওয়াত শুনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে; যে দায়িকে দেখাে, মানুষ ভালবেসে তাদের দাওয়াত দেয়; তাদের সম্মান করে। যে বক্তাকে দেখাে, মানুষ তাঁদের বয়ান শুনার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ভিড় জমায়, তারা কিন্তু এমনি এমনি এই স্তরে এসে পৌছাই নি; বরং এই স্তরে পৌছার জন্যে তাদের অনেক কষ্ট ও মেহনত-মুজাহাদা করতে হয়েছে, তারপরেই তারা এই স্তরে এসে পৌছেছে।

আসমায়ি নিজ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে। সে এর জন্যে অনেক মেহনত করেছে, অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠেছে এবং রাত্রে দেরিতে ঘুমাতে গিয়েছে, তার বেশিরভাগ সময়ই ইলম অর্জনের পিছনে ব্যয় করেছে এবং পড়ালেখার কাজে প্রায় পুরাে সময়টাই ব্যয় করেছে। এর জন্যে ধৈর্যের সাথে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছে। নিজেকে অনেক প্রিয় চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থেকেছে। মানুষের ঠাট্টা-উপহাস সহ্য করে ইলমের পিছনে লেগে থেকেছে। তারপরেই তাে সে নিজ লক্ষ্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছতে পেরেছে। আর আমরা এতাে বছর পরও এই আসমায়িকে চিনি। তার কথা আলােচনা হলে আমাদের অনেকেই তাকে চিনতে পারি।

সুতরাং, আমরা যদি তার মত কোনাে বিষয়ের চূড়ায় পৌছতে চাই তাহলে আমাদেরও তাঁর মত মেহনত-মুজাহাদা করতে হবে, এবং দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হবে। কেউ যদি শিক্ষা অর্জন করতে চায়, আলেম হতে চায়, ফকিহ হতে চায় বা অন্য কিছু হতে চায় তাহলে তাকেও তার মত কোনাে দিকে না তাকিয়ে লক্ষ্যপানে ছুটে যেতে হবে। সফল লােকদের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে এবং এমন লােকদের সাথে চলতে ও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে তার লক্ষ্যে পৌছতে উৎসাহ দিবে; তার মনােবলকে কখনই ভেঙ্গে দিবে না।

আল্লাহ তাআলার নিকট এই কামনা করি যে, তিনি আমাদেরকে কল্যাণ দান করবেন। এবং এসকল ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করবেন। নিশ্চয় ঘটনা সমূহের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা।

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১১৭ – ১২৮

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন