আত্মবিশ্বাস ঘন মেঘমালাকেও সরিয়ে দেয়

0
67

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

আল্লাহর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ও কঠিন পরিশ্রম বাধার সকল প্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। তুমি অধিক সম্পদের উপর ভরসা করতে পারাে না এবং ভরসা করতে পারাে না শরীরিক শক্তির উপর, তীক্ষ্ণ মেধার উপর, এবং কোনাে জাতি-গােষ্ঠী বা দলের উপর; কিন্তু তুমি ভরসা করতে পারবে আত্মবিশ্বাসী একটি মনকে যা সত্য চিনে এবং ইসলামি চিন্তা-চেতনা লালন করে।

আমি আজ থেকে পনের বছর পূর্বে সুইডেন গিয়েছিলাম এবং সেখানের ‘মালমু শহরের একটি মসজিদে পনের বছরের এক প্রতিবন্ধী বালকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ছেলেটি মূলত সুমালিয়াে বংশদ্ভূত সুইডেনের নাগরিক। ছেলেটি প্রতিবন্ধী, হাত পা অচল, কথা বলতে পারে না। অথচ তার হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি নিজের চোখে। তাকে দেখেছি, বালকটি মারাত্মক প্রতিবন্ধী; কিন্তু সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়। এখন প্রশ্ন হল ছেলেটি কীধরনের প্রতিবন্ধী? কীভাবে এমন একজন প্রতিবন্ধীর হাতে এত মানুষ মুসলমান হল? এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। এ বিষয় নিয়েই আমাদের সামনের আলােচনা।

সুইডেনে থাকাকালে একদিন সুইডিস এক বন্ধু জানালাে যে, আজ আমরা ‘মালমু’ শহরের এক মসজিদ-পরিদর্শনে যাবাে। মালমুতে তখন মুসজিদ ছিলাে মাত্র একটি। অবশ্য এটা ছাড়াও অনেক জায়গায় সালাত আদায়। করা হত। যেমন অফিসের হলরুম, বেডরুম এরকম বিভিন্ন জায়গায়। সালাত আদায় হতাে; কিন্তু মেহরাব, মিম্বার ও মিনারসহ যে মসজিদ বুঝায় তা ছিলাে মাত্র একটি। অর্থাৎ আজ থেকে পনের বছর আগে। মালমুতে মাত্র একটি মসজিদ ছিল। পরে মসজিদের সংখ্যা আরাে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরােপের মসজিদগুলাে অন্যান্য জায়গার চেয়ে একটু ভিন্নধরনের হয়ে থাকে। মালমুর মসজিদটির চারপাশে ছিলাে সবুজশ্যামল বাগান। আমরা যখন মসজিদে প্রবেশ করলাম তখন সালাতের সময় ছিলাে না। সময়টা ছিলাে পূর্বাহ্ন। মসজিদে প্রবেশ করে দেখি সেখানে চেয়ারের উপর একজন যুবক ছেলে বসা। ছেলেটি সুমালিয়াে বংশদ্ভূত সুইডেন-নাগরিক। ছেলেটি প্রতিবন্ধী, হাত, পা নাড়াতে পারে চেয়ারের দুই হাতলের সাথে তার দুই হাত বাঁধা, কারণ তার হাত সর্বদা কাঁপতে থাকে, হাতের উপর তার কোনাে নিয়ন্ত্রণ নেই।

অনুরূপভাবে তার পা দুটোও চেয়ারের পায়ার সাথে বাঁধা, কারণ তার পা-ও অল; সর্বদা কাঁপতে থাকে। সাথে সাথে সে বাকপ্রতিবন্ধীও; কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল ছেলেটি একজন দায়ি, সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়। যদিও সে কথা বলতে পারে না; কিন্তু সে ইংরেজি, সুইডিস ও সুমালিয়াে ভাষা বুঝে।

আমি ছেলেটির কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলাম এবং তার কপালে চুমু খেলাম। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেমন আছাে? ছেলেটি আরবি বুঝে না, তাই আমি ইংরেজিতে বললাম, তুমি কেমন আছাে?। এরপর তাকে অসুস্থতায় ধৈর্যধারণের ফযিলত শুনালাম এবং শান্তনা দিলাম। আমি এক বন্ধুকে কাছে ডেকে আমার কথার তরজমা করতে বললাম। বন্ধুটি আমার কাছে আসলাে, তখন আমি ছেলেটিকে একটি হাদিস বললাম, (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছে)বন্ধুটি এটুকুর তরজমা করলাে।

আমি বললাম,  (মুমিন যেসব মুসিবতে আক্রান্ত হয়।) বন্ধুটি এর তরজমা করলাে। এরপর  আবার বলেন আমি আবার বললাম, এবার সে বললাে, শায়খ! আমি এই আরবিটা বুঝতে পারছি না। তখন আমি এর ব্যাখ্যা করে দিলাম। বন্ধুটি ছিলাে ইরাকি বংশদ্ভূত সুইডিস নাগরিক। অতঃপর সে চলে গেল, আমি হেসে দিলাম। আমি তাকে ডেকে বললাম, আপনি আসেন, আমি আপনাকে আরবিতে এর ব্যাখ্যা করে দিবাে কিন্তু সে আর সামনে আসলাে না। অন্য একজন সামনে আসলাে এবং ছেলেটিকে আমার কথা তরজমা করে শুনাল।

এ বিষয় শেষ করে আমি তাকে বললাম, শুনেছি তােমার হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে? এটা কীভাবে হয়েছে? আমাকে একটু ব্যাখ্যা বরে বলাে। তখন ছেলেটি তার এক সাথীর দিকে তাকাল। সুইডিস সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই ছেলের জন্যে সকালে দুইজন এবং বিকেলে দুইজন করে লােক ঠিক করে দেওয়া আছে। যারা তাকে সঙ্গ দেয় এবং তার খেদমত করে ও বিভিন্ন প্রয়ােজন পূরণ করে দেয়। ছেলেটি তার মাথা দিয়ে এদের একজনের দিকে ইশারা করলাে আর লােকটি পালকি সাদৃশ একটা বাক্স নিয়ে এলাে। তাতে লাঠির মধ্যে পেঁচানাে অনেকগুলাে বেনার দেখতে পেলাম এবং প্রতিটি বেনারের মধ্যে অনেকগুলাে ঘর আঁকা ছিলাে ও প্রতিটি ঘরের মধ্যে বিভিন্ন বাক্য লেখা, যেমন কোনােটিতে লেখা আমি পানি চাচ্ছি, কোনােটিতে লেখা আমি টয়লেটে যাব, আমার মার সাথে সাক্ষাৎ করবাে, আমার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করবাে ইত্যাদি বিভিন্ন প্রয়ােজনের কথা লেখা আছে। তার যখন যেটার প্রয়ােজন হয় সে তার সাথীদের মাথা দিয়ে সেটার দিকে ইশারা করে আর তারা সেটা পূরণ করে দেয়।

ছেলেটি আমাকে ইশারায় বলল, শায়খ! আমি কুরআন হিফয করতে চাই তাই আপনি আমাকে পূর্ণ কুরআনের অডিও কেসেটের ব্যবস্থা করে দিন।

সে কথা বলতে পারে না; কিন্তু বুঝতে পারে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি এটা এটা চাচ্ছ? ছেলেটি মাথা দিয়ে ইশারায় তার ইচ্ছার বিষয়টা সম্মতি জানাচ্ছিল।

হে ভাই! তুমি একবার ছেলেটার সাহস ও উঁচু মনােবলের দিকে লক্ষ করাে। এরপর ছেলেটি আমাকে বলল, শায়খ আমি সৌদিআরবে ইলম শিক্ষা করার জন্যে সফর করতে চাই। সুবহানাল্লাহ! ছেলেটির হিম্মত কত? হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না, এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে না, কথা বলতে পারে না, সে ইলম শিক্ষার জন্যে ভিনদেশে সফর করতে চায়!!?

এরপর আমার বন্ধুরা আমাকে বলল, শায়খ! এই ছেলেটির মাধ্যমে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি বললাম এটা কীভাবে সম্ভব? যে ছেলে কথা বলতে পারে না, কারাে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, কারাে কথা খণ্ডন করে না, কারাে বিরুদ্ধে দলিল পেশ করতে পারে না তার মাধ্যমে কীভাবে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে? তার কাছে তাে কথা বলার মতাে, মনের ভাব প্রকাশ করার মত এই কয়েকটা লেখা ছাড়া অন্য কোনাে মাধ্যম নেই!! সে কি তার এই ফেস্টুনের দিকে ইশারা করে মানুষদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে? এটা কীভাবে সম্ভব??

তারা আমাকে বললাে, শায়খ! সকালে যখন তার কাছে দুইজন লােক আসে তখন সে তাদের একজনকে ইশার করে বলে, আমি এখন আমার অমুক বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করবাে, তখন তাদের একজন গিয়ে তার বন্ধুকে ডেকে নিয়ে আসে, তখন সে অপর লােকটিকে বলে তুমি আমার এই বন্ধুর কাছে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করে বল যে, ইসলাম কী? অতঃপর তা আমাকে ব্যাখ্য করে শুনাও। তখন দায়িত্বে থাকা লােকটি তার বন্ধুকে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করে আর সে তার সামনে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরে। এরপর ছেলেটি লােকটির মাধ্যমে বন্ধুকে প্রশ্ন করে এবার তুমি আমাকে ইসলাম ধর্ম ও খৃস্টান ধর্মের মধ্যে পার্থক্য করে দেখাও। তখন সে ইসলাম ও খৃস্টান ধর্মের পার্থক্যগুলাে তার সামনে ব্যাখ্যা করে কী ভাই বিশ্বাস হচ্ছে না?

আমি এই ঘটনা সচক্ষে দেখেছি। তাদের আলােচনা শেষ হলে ছেলেটি তার বাের্ডের দিকে ইশারা করে সেলফে থাকা ইসলাম সম্পর্কে একটি বই তাকে হাদিয়া দিতে বলে, এভাবেই এই প্রতিবন্ধী বালকটির কাছে আসা তার দেখাশােনার দায়িত্বে থাকা অনেক লােক ইসলাম গ্রহণ করেছে। সত্যিই দৃঢ় সঙ্কল্প ও আত্মবিশ্বাস আকাশের ঘন মেঘমালাকেও সরিয়ে দেয়।

যে ছেলেটি প্রতিবন্ধী হাত পা নাড়াতে পারে না, কথা বলতে পারে না সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছে, মানুষকে সত্য দীনের দিকে আহ্বান করছে। ছেলেটি কিন্তু এই বলে বসে থাকে নি যে, আমি প্রতিবন্ধী, হাত-পা নাড়াতে পারি না, কথা বলতে পারি না, সুতরাং আমার কোনাে দায়িত্ব নেই। আমি কীভাবে দাওয়াত দিবাে? আমি তাে লিখতেও পরি না, বলতেও পারি না। সে এভাবে বসে না থেকে তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছে এবং তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একবার চিন্তা করে দেখুন, কিয়ামতের দিন এই প্রতিবন্ধী বালকটির অবস্থান কোথায় থাকবে, সে আম্বিয়া আ.দের সাথে জান্নাতে যাবে, কারণ আম্বিয়া আ.ও মানুষদের দীনের দাওয়াত দিতেন, অমুসলিমরা তাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করতাে আর সেও মানুষদের দীনের দাওয়াত দিচ্ছে এবং তাঁর হাতেও মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে।

আমি আমার নিজেকে ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেন, ঘটনা’হল আল্লাহর তাআলার সৈনিকদের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ অনেক মানুষ কোনাে একটি ঘটনা শুনার কারণে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

রিয়াদে প্রতিবন্ধীদের জন্যে একটা হাসপাতাল রয়েছে। যে সকল লােক কঠিন পঙ্গুত্বের শিকার তাদেরকে সেখানে নেওয়া হয়। যেমন একজনের পিঠ ভেঙ্গে গেছে, মাজা ভেঙ্গে গেছে, সে মাথা ব্যতীত অন্য কিছুই নাড়াতে পারে না। এমন কঠিন রুগীদের সেখানে ভর্তি করা হয়। ঐ হাসপাতালে রুগীদের দেখতে, তাদের সামান্য শান্তনা দিতে আমরা মাঝে-মধ্যে সেখানে যাই। রুগীদের দেখতে যাওয়া, তাদেরকে দুইটা শান্তনাবাণী শুনাননা ইবাদতের কাজ; এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। তাহলে তুমি কেনাে তাদেরকে দেখতে যাবে না? যারা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় অবস্থায় আছে। তাদের কেউ কেউ এক বছর, দুই বছর আবার কেউ আরাে অনেক বেশি সময় ধরে সেখানে আছে। আমি এমন এক হাসপাতাল পরিদর্শনের জন্যে গেলাম। হাসপাতালটি অনেক পুরনাে। সেখানে গেলে তােমার মানে হবে যে, তুমি কোনাে একটা নির্জন বনে প্রবেশ করেছাে, কারণ সেখানে যাতায়াতকারী মানুষের সংখ্যা অনেক কম। সাথে সাথে হাসপাতালটি খুবই অযত্নে ও অবহেলায় পড়ে আছে। যেনাে দেখাশুনার জন্যে কেউ নেই। কেউ তার সংস্কার-কাজ করে না।

আমি আমার এক সাথীর সাথে সেই হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। আমরা সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা অবস্থান করেছি। সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সতের বছরের এক যুবকের কামরায় প্রবেশ করি। তার অবস্থা এতটাই নাযুক ছিলাে যে, সে তার মাথা ব্যতীত অন্য কিছুই নাড়াতে পারতাে না। আমি তার কামরায় প্রবেশ করে তার সামনে একটি আশ্চর্যজনক জিনিস ঝুলানাে দেখলাম। যা ছেলেটির এমন উঁচু মনোেবল আর দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ বহণ করে, যা অনেক সুস্থ মানুষের মধ্যেও নেই। ছেলেটি তার সামনে কী ঝুলিয়ে রেখেছিল? 

ছেলেটি তার সামনে টেলিভিসনের কোনাে মনিটর ঝুলিয়ে রাখেনি যে, শুয়েশুয়ে বিভিন্ন চিত্র দেখবে। অথবা সে তার সামনে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারও রাখেনি যে, যখন যা মন চাইবে মাউচে টিপ দেওয়ার মাধ্যমে তা চলে আসবে। বরং ছেলেটি তার পরিবারের কাছে দাবি করেছে যে, তারা যেনাে বড় কাগজে বড় বড় অক্ষরে কুরআন লিখে তার সামনে বিভিন্ন অংশ ঝুলিয়ে রাখে, যাতে সে দূর থেকে দেখে পড়তে পারে এবং তা মুখস্থ করতে পারে, কারণ ছেলেটির মাথা ব্যতীত সমস্ত শরীর অবশ। হাত পা কিছুই নাড়াতে পারে না। কুরআন হাতে নিয়ে পড়বে তাে দূরের কথা, সে তাে হাতই নাড়াতে পারে না। তাই সে তার পরিবারের কাছে দাবি করেছে যে, তারা যেনাে কুরআনুল কারিম বড় বড় অক্ষরে লিখে এক পৃষ্ঠা এক পৃষ্ঠা করে তার সামনের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে এবং সে তা দেখে দেখে মুখস্থ করতে পারে।

এক পৃষ্ঠা মুখস্থ হলে সে মাথা দিয়ে ইশারা করে আর তারা এর পরের পৃষ্ঠা ঝুলিয়ে দেয়। আমি যখন তার কামরায় প্রবেশ করলাম তখন ছেলেটি সুরা মুজাদালাহ মুখস্থ করছে। আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, সে এপর্যন্ত কত পৃষ্ঠা মুখস্থ করেছে? সে বললাে, দশ পাড়ার চেয়ে বেশি। আমি ছেলেটির পাশে একটি বাক্স দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এতে কী? আমাকে বলা হল, এর মধ্যে কুরআন লিখা পৃষ্ঠাগুলাে রয়েছে। আর এতে প্রায় দুইশত পৃষ্ঠার মত আছে।

সুবহানাল্লাহ! ছেলেটির শরীর অচল হওয়া সত্ত্বেও কুরআন মুখস্থ করার সংকল্প করেছে এবং পনের পাড়ার মত কুরআন মুখস্থ করে ফেলেছে। ছেলেটি কিন্তু একথা বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকে নি যে, আমি এতগুলাে রােগে আক্রান্ত। আমি হাত পা নাড়াতে পারি না, কথা বলতে পারি না। আমি পূর্বে একটি কথা বলতে ভুলে গেছি যে, ছেলেটি কথাও বলতে পারে না। আমার সাথে যে লােকটি ছিলাে সে আমাকে বলেছে, ছেলেটি তার সামনে ঝুলানাে কাগজ থেকে কুরআন মুখস্থ করে। এক পৃষ্ঠা মুখস্থ হয়ে গেলে সে তার পরিবারকে মাথা দ্বারা ইশারা করে, আর তারা তার পরবর্তী পৃষ্ঠা ঝুলিয়ে দেয়। আমি এরও অনেক দিন পরে ছেলেটিকে দেখতে আবারও সেই হাসপাতালে গেলাম। তখন সে একটু একটু তার হাত নাড়াতে পারে। অর্থাৎ একশত ভাগের পনের ভাগ। আমি ছেলেটির হাতে একটি কলম ধরিয়ে দিলাম আর ছেলেটি কলম ধরল এবং তার সেই অবশ হাত দিয়েই লিখতে চেষ্টা করল। সে তার ইচ্ছেমত সামান্য কিছু লিখল,কারণ সে লিখতে পারে না। সুবহানাল্লাহ!! কী দৃঢ় মনােবল!!

আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আফসােস করে বলে, হায় আমি যদি কুরআন হিফজ করতে পারতাম! অথবা তারা যখন কোনাে কুরআনের মজলিস, হিফজুল কুরআনের মজলিস দেখে অথবা কোনাে দশ বছরের ছােট্ট হাফেজে কুরআনকে দেখে তখন বলে, এতটুকু বাচ্চা কুরআন মুখস্থ করেছে!!? হায় আমি যদি তার মত হতে পারতাম! হায়! আমি যদি কুরআন মুখস্থ করতে পারতাম! কিন্তু আমার হয় না, আমি পারি। আরে ভাই! তুমি পারাে এবং পারবে। বরং তােমার মনােবল দুর্বল, তােমার দুর্বল হিম্মত তােমাকে বসিয়ে রেখেছে।তুমিও তার মত কাজ করতে পারবে। তুমিও মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে পারবে এবং মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারবে। তুমিও পারবে কুরআন মুখস্থ করতে; কিন্তু সমস্যা হল মানুষের হিম্মত মানুষকে বসিয়ে রাখে। তােমার হিম্মত তােমাকে বসিয়ে রেখেছে। তুমি যদি হিম্মত করে সামনে বাড়তে তাহলে অবশ্যই তা অর্জন করতে পারতে।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা, অন্ধ ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি তার টার্গেট ও লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ও ওমর রা.-এর সাথে বাইরে বের হলেন। আবু বকর ও ওমর রা. ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী এবং তার উজির। তখন ছিলাে অন্ধকার রাত, সকল মানুষ নিজ নিজ ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই সাথীকে নিয়ে মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় মসজিদের ভেতর থেকে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়ায শুনতে পেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অন্ধকার রাতে মসজিদ থেকে কুরআনের আওয়ায শুনে দাড়িয়ে গেলেন এবং তার পড়া শুনলেন। ভিতর থেকে অন্ধসাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা, কুরআন পাঠ করছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, কুরআন যেভাবে নাযিল হয়েছে কেউ যদি সেভাবে তিলাওয়াত করতে চায়, তাহলে সে যেনাে আবদুল্লাহর মতাে তিলাওয়াত করে। এরপর আবদুল্লাহ রা, কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে দোয়া শুরু করলেন। তিনি জানেন না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তেলাওয়াত শুনেছেন এবং এখন তার দোয়াও শুনছেন। তিনি দোয়া করতে লাগলেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি চাও তােমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তােমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তােমাকে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তুমি আরাে বেশি করে চাও, আল্লাহ তাআলা তােমাকে দিবেন। তােমার দোয়া কবুল করবেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা. বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর এক যুদ্ধের সময় আবদুল্লাহ রা. বললেন, আমি তােমাদের সাথে যুদ্ধে যেতে চাই। লােকেরা বললাে, তুমি উজরগ্রস্ত; আল্লাহ তাআলা তােমার সমস্যা গ্রহণ করবেন। ইরশাদ হয়েছে: ‘অন্ধের জন্যে, খঞ্জের জন্যে এবং অসুস্থ ব্যক্তির জন্যে কোনাে অপরাধ নাই।’ [সুরা নূর, আয়াত : ৬১]

কিন্তু তিনি বললেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। সুতরাং তােমরা আমাকে যুদ্ধের একটি পতাকা দাও। আমি পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবাে, আমি অন্ধ মানুষ; পালাতে চাইলেও পালাতে পারবাে না। ময়দানে মুসলমানদের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। মানুষ যুদ্ধ করবে এবং পতাকা দেখে একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করবে। আমাকে যুদ্ধের পতাকা দিলে অন্য একজন দৃষ্টিসম্পন্ন মুজাহিদ স্বাচ্ছন্দ্যে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে। অতঃপর তিনি তাঁদের সাথে জিহাদে বের হলেন এবং জিহাদের পতাকা নিয়ে সুদঢ় পর্বতের ন্যায় ময়দানে অটল রইলেন। মুজাহিদগণ যখন যুদ্ধ করতে করতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতাে, তখন তাকে দেখে আবার একত্র হতাে। তিনি পতাকা হতে একটা তীর বা তরবারির আঘাতের অপেক্ষা করছিলেন। এভাবে একসময় তিনি শহাদাত বরণ করলেন। অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও জিহাদের পতাকা বহন করে তিনি শহিদ হলেন। সুবহানাল্লাহ!!

দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন, শ্রবণশক্তিসম্পন্ন, হাঁটা-চলা ও নড়া-চড়া করার শক্তিসম্পন্ন লােকদের কোনাে উজর নেই।অবহেলাকরীদের জন্যে কোনাে উজর নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের যাকে যে শক্তি দিয়েছেন, প্রত্যেককে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। বাকশক্তিসম্পন্ন লােককে প্রশ্ন করবেন, কেননা তুমি মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে ডাকো নি? কেননা তুমি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করাে নি? হাঁটা ও চলা-ফেরা করার শক্তিসম্পন্ন লােককে প্রশ্ন করবেন, কেনাে তুমি মসজিদে যাওনি এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে তােমার পা-কে ব্যবহার করাে নি? অর্থাৎ প্রতিটি সক্ষম লােককেই তার সক্ষমতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তােমাকে যে শক্তি দান করেছিলাম তুমি তাকে কোন কাজে ব্যয় করেছ? এই সকল প্রতিবন্ধী লােক, যারা জীবনের অনেক চাহিদাই পূরণ করতে পারে না।

তা সত্ত্বেও তাদের জীবনে একটা প্রভাব বা ফল রয়ে যাচ্ছে। তাহলে যাদের শক্তি আছে, সামর্থ্য আছে তাদের জীবনের কী পরিমাণ প্রভাব ও ফল থাকা দরকার? বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক-ছাত্র, ইমাম-মুয়াজ্জিন, শ্রমিকচাকুরিজীবী সকলেরই তাদের জীবনের একটা প্রভাব রেখে যাওয়ার কামনা করা উচিত। যার যে শক্তি ও সক্ষমতা আছে তা-ই দীনের সাহায্যে, নিজের ও উম্মাহর উপকারে ব্যয় করা উচিত।

আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনাে আমাকে এবং আপনাদের সকলকে তার আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করেন। প্রতিটি কল্যাণকর কাজ করার তাওফিক দান করেন। আমরা যেখানেই থাকি না কেনাে তিনি যেনাে আমাদেরকে তার রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখেন এবং আমাদের জীবনের একটা ছাপ বা ফল বাকি রাখেন। বান্দার জীবনের ছাপ ও ফল তাদের রবের নিকট বাকি থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছে।‘ [সুরা ইয়া-সীন – ৩৬:১১]

মানুষের মধ্যে এমন মানুষ রয়েছে যারা মৃত্যুবরণ করে আর তাঁদের নেক আমল বাকি থাকে এবং বদ আমলগুলাে তাদের সাথে মৃত্যুবরণ করে। আবার এমন মানুষও রয়েছে, তারা যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তাদের সাথে সাথে তাদের নেক আমল গুলােও মৃত্যুবরণ করে। আবার করাে কারাে বদ আমলগুলাে বাকি থাকে অর্থাৎ যারা খারাপ কিছু রেখে যায়। যার কারণে অন্য মানুষ আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে। এটা এমন একটি মাসআলা যার ব্যাপারে আমাদের সকলেরই সতর্ক থাকা উচিত। মানুষের নেক আমল বাকি থাকার কারণে তারা যেমনিভাবে প্রতিদান পাবে, অনুরূপভাবে বদ আমল বাকি থাকার কারণেও তারা তার প্রতিদান পাবে। সুতরাং আমাদেরকে খারাপ কাজের চাবিকাঠি হওয়ার পরিবর্তে নেক-কাজের মাধ্যম হতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১০৮ – ১১৭

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন