বই পুস্তকের প্রতি অনীহা

0
15

লেখক: মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ | অনুবাদক: আবদুল্লাহ আল মাসউদ

পড়ার ক্ষেত্রে অনেক মানুষের সবচে বড় সমস্যা হল, বইয়ের প্রতি অনীহা ও বিতৃষ্ণাভাব। যা অনেক সময় বৈরিতার রূপ ধারণ করে। অনেক মানুষই বই খোলার পর দ্রুত বিরক্তি ও ক্লান্তিতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করে থাকেন। বিশেষ করে কঠিন বিষয়ের বইগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা বেশি হয়ে থাকে। সেজন্যই বর্তমানে আমরা খুবই হতাশাজনক চিত্র দেখতে পাচ্ছি। তা হল, অনেকেই ধর্মীয় বই-পুস্তককে উপেক্ষা করে অনর্থক ও ফালতু গল্পের বই, রঙ-বেরঙের সচিত্র ম্যাগাজিন, নাচ-গান ও খেলাধুলা বিষয়ক পত্রিকার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে অনেক সময় আমাদের শত্রুরা দম্ভের স্বরে বলে থাকে, ‘মুসলিমরা বইটই পড়ে না। পড়লেও বুঝে না । আর বুঝলেও সেটা গভীর থেকে অনুধাবন করে না।’

এমনিভাবে দুঃখজনক আরেকটা বাস্তবতা হল, অনেক গ্র্যাজুয়েট ছাত্র সার্টিফিকেট অর্জন করার পরে পড়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর তাদের জ্ঞানের ক্রমাগত হ্রাস পাওয়াকে সাদরে মেনে নেন। আবার অনেকে মাস্টার্সে উন্নীত হলে পড়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে ফেলেন। অথচ তাদের জানাশোনার পরিমাণ বেড়েছে এবং জ্ঞানের পরিধি প্রশস্থ হয়েছে।

আরেকটি মনোকষ্টের বিষয় হল, বই সংগ্রহ করা থেকে বিমুখ হয়ে পড়া। এমনকি সাধারণ কিংবা জনকল্যাণমূলক পাঠাগার থেকে বই ধার করে আনার বিষয়েও অনাগ্রহী হওয়া । অনেক সময় দেখা যায়, পাঠাগার ওয়াকফ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিরর্থক হয়ে পড়ে। কারণ এই অনীহা আর অনাগ্রহের কারণে তা থেকে যথাযোগ্য উপকার লাভ করা হয় না। অনেক মানুষকে দেখবেন, তারা বই ক্রয় করে। কিন্তু পরে সেটা সংগ্রহশালার তাকে বন্দি করে রেখে দেয়। বইয়ের উপর ধুলোবালির আস্তর জমে উঠে। সেগুলো খুলে পড়ার মাধ্যমে যত্ন নেয় না। দেখা যায়, বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা একটা অপরটার সাথে সেঁটে আছে। যা বইটি বহুদিন না খোলার নিরব সাক্ষ্য প্রদান করে থাকে।

যে ব্যক্তি শুধু বই সংগ্রহ করে কিন্তু সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখে না, পড়ে না তার বিষয়ে জনৈক কবি বলেছেন- বই কিনে না পড়ে রেখে দিবে যবে; সেই বই উপকারী হবে না তো তবে।

অজ্ঞতা সাথী হবে যেখানেই যাও; জ্ঞানসব বই-তাকে পড়ে শুধু রবে।
প্রশ্ন হতে পারে, কেন মানুষ বইয়ের প্রতি আগ্রহী নয়; বিশেষ করে যেসব বই উপকারী তার প্রতি? কেন তারা বই পাঠে অনীহা পোষণ করে? কেন অনেক মানুষ আর বইয়ের মাঝে এক ধরনের বৈরিতা লক্ষ্য করা যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আরো কয়েকটি বিষয়ে জানতে হবে আমাদেরকে।

মানুষ ও বইয়ের মাঝে বৈরিভাব তৈরি হওয়ার কারণসমূহ

১. দ্রুত বিরক্ত হওয়া। ধৈর্যের কমতি থাকা। কোথাও দীর্ঘ অবস্থানের মতো দৃঢ়তা ও অবিচলতা না থাকা। পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্থিরতার অভাব থাকা। এটা স্পষ্টভাবে ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে বুঝে আসে, যে খুবই অস্থিরচিত্তের অধিকারী । এদিক-সেদিক গমনাগমন করতেই বেশি ভালোবাসে। লম্বা সময় এক জায়গায়

বসে থাকতে পারে না ।

২. বইপাঠ ও এর গুণাগুণ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা। আর মানুষ যে বিষয়ে অজ্ঞ হয় তা সে পছন্দ করে না ।

৩. বই বা বিষয়বস্তুর দীর্ঘতা।

8. প্রারম্ভেই ভুল পন্থা অবলম্বন করা। তা হল, কোন শাস্ত্রের প্রাথমিক ও সহজ বইগুলো পাঠ না করেই বড় বই দিয়ে পাঠ শুরু করা। এটি পড়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

৫. বিষয়বস্তু নির্বাচন কিংবা ভাষাগত ক্ষেত্রে লেখকের উচ্চাঙ্গের পদ্ধতি অবলম্বন করা। যেমন, আমাদের পূর্ববর্তী অনেক মহা মনীষী আলেমগণ এমনটি করতেন। অনেক সময় বই-পুস্তক এমন ভাষায় লেখা হয় যা লেখকের সমকালীন পাঠকদের উপযোগী । সেই সাথে তাতে ব্যবহার করা হয় এমন সাহিত্যপূর্ণ রচনাশৈলী, যা শরঈ ইলমী লেখনীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তো যখন পরবর্তী যুগে সমাজের মানুষের মধ্যে অবক্ষয়প্রাপ্ত ও নিম্নমানের কথ্য ভাষার প্রসার ঘটে এবং কুরআনের ভাষার মতো সাহিত্যপূর্ণ ভাষার ব্যবহার কমে আসে তখন সেই সমাজের একজন পাঠকের ওসব বই সহজে বুঝতে না পারাটাই স্বাভাবিক।

ফলে তার ভেতর পড়ার প্রতি এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয় এবং বইয়ের প্রতি নানা রকম অভিযোগ তৈরি হয়। অথচ প্রকৃত ইলম পূর্বকালে লেখা সেসব বই-পুস্তকের ভেতরই বিদ্যমান। বাস্তবিকপক্ষেই পূর্ববর্তীদের রচনাসমগ্র অল্প হলেও তাতে বরকত বেশি। কিন্তু পরবর্তীদের রচনাবলী বেশি হলেও তাতে বরকত কম ৷

৬. বইয়ের ব্যবহৃত পরিভাষার সাথে পরিচয় না থাকা। ফলে এটি বইপড়া ও তা বুঝার পথে অন্তরায় হয়ে থাকে।

৭. পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করার মতো বন্ধু-বান্ধব ও সাথী-সঙ্গী না থাকা।

৮. ভালোকে মন্দের সাথে মিশিয়ে ফেলা এবং ক্ষতিকর অধ্যয়নে জড়িয়ে পড়া। যেমন, ফালতু পত্র-পত্রিকা, বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন ও অনুপযোগী বই-পত্র পড়া।

৯. সামাজিকভাবে ব্যপকহারে পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান না করা এবং ছাত্রদের পাঠ্যবই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। বরং অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় যে, সেখানে জ্ঞানমূলক সেমিনার ও আলোচনা সভা আয়োজন করার পরিবর্তে কেবল নোটভিত্তিক পড়াশোনার মধ্যেই ক্ষ্যন্ত থাকা হয়। এরচেও আরো বেশি আফসোসের কথা হল, যখন অভিভাবক সন্তানের হাতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোন বই দেখেন তখন তাকে তা পড়া থেকে কঠিন ভাষায় বারণ করেন। এবং শুধুমাত্র পাঠ্যবই পড়ার মধ্যে সীমাদ্ধ থাকতে আদেশ করেন।

১০. বই নির্বাচন করার ক্ষেত্রে পরামর্শ না করা। অথবা এমন ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা যিনি এর অযোগ্য।

১১. ব্যাকরণে কাচা হওয়া এবং শব্দার্থ বুঝার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকা। ভাষাশৈলী ও ও অলংকারপূর্ণ সাহিত্যের কারণে লেখা বুঝতে না পারা।

১২. ভবঘুরে টাইপের হওয়া। অবিচলতা না থাকা। অনেক পাঠকই এই অভিযোগ করে থাকেন। তারা বলেন, আমরা এক পৃষ্ঠা পড়ার পর দেখা যায় কিছুই বুঝি নি, পুরোপুরি না বুঝেই বই শেষ করতে হয়। এই সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে সামনে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা হবে।

১৩. দৃঢ় সংকল্প না থাকা এবং অল্প পড়াতেই তুষ্ট ও পরতৃিপ্ত হওয়া।

যেমন কারো কারো পানাহার ও ঘুম ছাড়া আর কোন কাজ থাকে না। কেমন যেন এর জন্যই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে সে কেবল বইয়ের খোলসটাই কিনে আনে আর অধ্যয়নের নামই শুনে থাকে। এর থেকে যথাযথভাবে উপকৃত হতে পারে না ।

এই ধরনের মানুষ নিজেকে পড়ার ভেতর ব্যস্ত রাখতে পারে না। বইয়ের সামনে নিজেকে আটকে রাখতে সক্ষম হয় না। বরং এরা অলসতা আর ঘুমের ক্ষেত্রেই পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে পারে। অথচ বাস্তবতা হল তা-ই, যা ইমাম ইয়াহুয়া ইবনে আবি কাসীর রাহ. বলেছেন- শারীরিক আরামের মাধ্যমে কখনো ইলম অর্জন হয় না। [জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/১৮৩]

১৪. অনর্থক কাজে ব্যস্ত থাকা। যেমন, মুভি, সিরিয়াল এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর পরিবেশিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখা। খেলা-ধুলা ও বিভিন্ন টুর্নামেন্ট নিয়ে পড়ে থাকা। তাস খেলা। অনেকে তাদের দিনের বড় একটা সময় এসব অনর্থক কাজের পেছনে ব্যায় করেন। আর পড়ার জন্য খুবই কম সময় বরাদ্দ রাখেন। এরা আবার কথায় কথায় বলে থাকে, ‘আমার সময় নেই’।

১৫. পড়াশোনার বাইরে অন্যান্য কাজকর্মে লিপ্ত হওয়া। এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক বস্তুকে তার যথাযথ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং সব কাজের মাঝে সমতা রক্ষা করা হচ্ছে না। এমনিভাবে অনেকে অতিরিক্ত আয়-উপার্জনের উদ্দেশ্যে নিজেকে সদা-সর্বদা ব্যস্ততায় জড়িয়ে রাখেন ।

১৬. অডিও শোনায় অভ্যস্ত হওয়া। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, অডিওর প্রসার বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। অডিও শোনাকে পুরোপুরি পরিহার করার কথা এখানে বলা হচ্ছে না, বরং অডিও আর বই উভয়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ অডিওর তুলনায় বইয়ের অনেক বেশি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটা করা যেতে পারে যে, যখন পড়তে ভালো লাগে না তখন কেবল অডিও শোনা । যেমন ঘুমের মুহূর্তে। বিশ্রাম গ্রহণের বা জিনিসপত্র গোছগাছ করার সময়ে । গাড়ি চালানো বা ঘরের কাজ করার সময়ে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহ. এর দাদা আবুল বারাকাত রাহ. যখন গোসল করতেন তখন একজনকে আদেশ করতেন যাতে উঁচু আওয়াজে একটা বই থেকে পড়তে থাকে । তিনি এই সময়টাতেও বই থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করতেন । সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করার বিষয়ে তারা এমনই সচেতন ছিলেন ।

১৭. নির্ঘণ্টের প্রসার ঘটা। মুখস্থশক্তির দুর্বলতার এই যুগে এটি খুবই উপকারী। কিন্তু এইসব নির্ঘণ্টের অনেক ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও এগুলো অনেক সময় তথ্য-উপাত্ত খোঁজাখুঁজি ও ঘাঁটাঘাঁটি করার চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করে। এবং অনেক ছাত্রকে এমনসব উপকার থেকে বঞ্চিত করে যা নির্ঘণ্ট না থাকলে সে অর্জন করতে পারতো। এখানে নির্ঘণ্ট পরিত্যাগ করার প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি না। বরং বই পড়ার প্রতি গুরুত্বারোপ এবং নির্ঘণ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মাত্র।

১৮. বই-পুস্তকের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া।

১৯. বইয়ের ছাপা ভালো না হওয়া। যেমন, অক্ষরগুলো ছোট কিংবা অস্পষ্ট হওয়া। প্রিন্টমিসটেক বা মুদ্রণ-বিভ্রাট থাকা, কাগজ নিম্নমানের হওয়া কিংবা প্রকাশনীর মান ভালো না হওয়া।

২০. সাধারণ পাঠাগার না থাকা। অথবা থাকলেও সেখানে যাওয়াটা কষ্টকর হওয়া এবং সেখান থেকে উপকৃত হওয়ার পথে নানারকম প্রতিবন্ধকতা থাকা ।

২১. সার্টিফিকেট অর্জন কিংবা ভালোমানের কোন চাকরি-বাকরি পাওয়া ছাত্রদের পড়াশোনার উদ্দেশ্য হওয়া।

বই-পুস্তকের প্রতি পাঠকের অনীহা তৈরি হওয়ার কারণগুলোর উপর আলোকপাত করার পর এবার আমরা এসবের প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করবো।

উৎস: কী পড়বেন কীভাবে পড়বেন, পৃষ্ঠা: ৩০ – ৩৭

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন