কুরআনের সাথে এ বন্ধন অটুট থাকুক রামাদানের পরেও – পর্ব ১

0
238

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

যখন রামাদান আমাদের ছেড়ে চলে যায়, তখন আমাদেরকে একটা শূন্যতায় পেয়ে বসে। অনেকেই হয়তাে রামাদানে দুর্দান্ত একটা সময় কাটান আর রামাদানের পর এই হতাশায় ভুগেন যে কীভাবে কীভাবে তারা রামাদানের বারাকাহপূর্ণ দিনগুলি পার করে ফেললেন। রামাদানের এই ঝড়ের বেগে চলে যাওয়া বিশ্বজুড়ে যে কোন মুসলিমের হৃদয়কেই ব্যাথাতুর করে তােলে। কিন্তু কোন জিনিসটা আসলে আমাদেরকে ব্যথিত করে তােলে? এটা কি ইফতারে ভুড়িভােজনের সময় শেষ হয়ে যাওয়া? নাকি এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর ভয়ের কিছু?

ভয়টা আসলে হচ্ছে কুরআনের সাথে সম্পর্কটা রক্ষা না করার। এটি আসলেই ভয়ের ও আশংকার ব্যাপার যে ঈদের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আমরা রামাদানের আমল পরিত্যাগ করে ফেলি, কুরআনের সাথে সম্পর্ক কমিয়ে ফেলি।

ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যেতে পারে যে, সৈনিকরা কোন যুদ্ধে জিততে চাইলে তাদেরকে অবশ্যই যুদ্ধের আগে প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের যুদ্ধটা হচ্ছে কুরআনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার যুদ্ধ। আমাদের লড়াই হচ্ছে রামাদানের অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে এই সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াই। তাই আমাদের জন্য রামাদানে করা ভুল থেকে শেখা আর আগামী মাসগুলােতে কুরআনের সাথে শক্তপােক্ত একটা সম্পর্কের সূচনা করাটা খুব জরুরি।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “যে বাড়িতে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় না সেটা যেন একটা পরিত্যক্ত বাড়ির মত, যার দেখাশােনা করবার কেউ নেই।”

কখনাে আপনার বাড়িকে পরিত্যক্ত বাড়ির মত বানিয়ে ফেলবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কুরআন আর তার শিক্ষাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে সক্ষম। কতদিন আছে আমাদের হাতে সে হিসেব বাদ দিয়ে নিজেদের আত্মার যত্ন নেওয়াটা জরুরি। আমরা নিজেদের সুগন্ধময় করে তুলতে, দেখতে ফিটফাট করতে আর ভালাে খাবার খেতে যথেষ্ট সময় খরচ করি, কিন্তু আমাদের আত্মার পরিচর্যা করতে ভুলে যাই। অথচ, আত্মার দিকেও নজর দেয়া উচিত, আত্মাকেও সুগন্ধময়, পরিপাটি রাখতে হবে এবং উত্তম খাদ্য খাওয়াতে হবে। আর আত্মা তাে পরিপুষ্ট হয় একমাত্র কুরআনের মাধ্যমে। মানবদেহ নশ্বর, ভঙ্গুর ও দুর্বল। আপনি যদি আপনার আত্মাকে কুরআনের দ্বারা নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিশালী করে তুলতে পারেন তাহলে যখন আপনার শরীরটা দুর্বল হয়ে যাবে, তখন আপনার আত্মার বলেই আপনি আমলে অগ্রগামী থাকতে পারেন। অতএব, আত্মাকে খাবার দিন যাতে আপনার হৃদয় মরে না যায়।

এখানে এমন ১০টি পরামর্শ আমরা দিতে যাচ্ছি, যা মেনে চললে আপনি রামাদানের পরেও কুরআনের সাথে একটা মজবুত সম্পর্ক শুরু করতে, সেটার বিকাশ ঘটাতে এবং সেটা বজায় রাখতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ, তা সে যতােই ব্যস্ততা আপনার থাকুক না কেন।

(১) প্রতিটি মাসকে রামাদানের মতোই বিবেচনা করা

আর আমরা আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট। ব্যাখ্যাস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ।[1]

রামাদানের বারাকাহ ভরা দিনগুলাে চলে যাবার সাথে সাথেই ইবাদাতের প্রতি আমাদের মানসিকতা বদলে ফেলা উচিত নয়। উপরােক্ত আয়াতটি প্রতিটি দিনের জন্যই সমানভাবে প্রযােজ্য। কুরআনের সাথে কাটানাের জন্য রামাদান বিশেষ একটা সময়। কিন্তু এর মানে এই না যে, রামাদানের বাইরে অন্যান্য মাসে আমরা কুরআনকে অবহেলা করতে শুরু করে দিব।

রামাদানের ব্যাপারে আপনার বছরে একবার চূড়ান্ত আমলের প্রদর্শনী করে ফেলার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এই মাসকে দেখুন সমগ্র বছরের জন্য প্রশিক্ষণ হিসেবে, সারা বছর প্রতিদিন আপনি কী করতে পারেন তার একটি আভাস হিসেবে। সিয়ামরত থাকা অবস্থায় আপনি কী কী অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন আর এখন রামাদানের বাইরে এসে আপনি কী কী করতে পারবেন, সেগুলাে নিয়ে চিন্তা করে দেখুন।

কখনাে কখনাে দৈনন্দিন জীবনের ঝামেলার মধ্যে কুরআনকে সময় দেওয়াটা একটা অতিরিক্ত বােঝার মত মনে হতে পারে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: “আপনি কষ্ট-ক্লেশে পতিত হন- এ জন্য আমরা আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করিনি।[2]

কুরআনকে আপনার প্রয়ােজন হিসেবে দেখতে নিজের মানসিকতাকে সেভাবে ঠিক করে নিন। এই পরিবর্তন সন্দেহাতীতভাবে আপনাকে শান্তি আর তৃপ্তি এনে দেবে। সত্যটা হল, যেকোন দিনই আমাদের জন্য শেষ দিন হতে পারে আর এই দিনটিই শুধুমাত্র আমরা আখিরাতের জন্য বিনিয়ােগ করতে পারি। এই জীবনে পাওয়া বাকি সবকিছুর তুলনায় এই বিনিয়ােগটুকুই বহুগুণে দামী।

(২) লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

নিজের জন্য একটা টার্গেট ঠিক করে নিন। আগামী এক বছরে কুরআনকেন্দ্রিক আপনার লক্ষ্য কী? আপনি কি পুরাে কুরআন খতম করতে চান নাকি নির্দিষ্ট কোন সূরার উপর মনােযােগ দিতে চান? আপনি সফলভাবে মুখস্থ করতে চান এমন কোনও অংশ আছে? যেটাই হােক না কেন, বাস্তবধর্মী আর নির্দিষ্ট পরিমাণে লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেটা অর্জন করতেও মনােযােগী থাকতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

এটা এমন কোন কাজ না যেটায় অন্যের অনুসরণ করা লাগবে। আপনার ডায়রি, ফোন অথবা দেয়ালে কাগজ সেঁটে লিখে ফেলুন আপনার টার্গেট, যাতে সারাক্ষণ তা আপনার চোখের সামনেই থাকে। এতে করে আপনার মাথায় সবসময়ের জন্য গেঁথে যাবে আপনার লক্ষ্যটা কী ছিল। ধরাছোঁয়ার সীমানার মধ্যেই আপনার টার্গেটকে ঠিক করুন যাতে বাস্তব একটা অগ্রগতি দেখতে পান আপনি।

বিরাট কোন লক্ষ্য নিয়ে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে না। আপনার লক্ষ্যটা ছােট হােক, কিন্তু তােক সেটা ধারাবাহিক, নিরন্তর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তােমাদের মধ্যে কি কেউ রাতের বেলা কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে? সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: কিভাবে এক রাতের মধ্যে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করা সম্ভব? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন:ওয়াল্লাহু আহাদ’ হল কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।[3]

কুরআন এতােটাই বারাকাহয় ভরপুর যে শুধুমাত্র সূরা আল ইখলাস পাঠ করলেই কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য সওয়াব মিলে যায়। তাহলে কিসে আমাদেরকে বাধা দিচ্ছে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তাআলার কিতাবের সাথে সামান্য কয়েকটা মিনিট কাটাতে?

(৩) কুরআনের জন্য একটা সময় ঠিক করে নিন

আমরা আমাদের ইচ্ছেমত অনেক লক্ষ্যই ঠিক করতে পারি। কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া অথবা গন্তব্যে পৌঁছানাের পরিকল্পনা ছাড়া এই লক্ষ্যগুলাে পূরণ করা খুব কঠিন। আপনার কুরআন পড়া এবং এর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়, যেগুলাের উপর আপনি ফোকাস করছেন -সাপ্তাহিক ভিত্তিতে এগুলাের উপর কাজ করুন।

একটা সময় কি নির্দিষ্ট করতে পারবেন আপনি? হতে পারে সেটা আপনার যাতায়াতের সময় অথবা সকালে আপনার জেগে উঠার পর? অথবা ঘুমুতে যাবার আগে? সময় বের করতে পারলে তাে খুবই ভালাে। কিন্তু যদি সেটা না পারেন, তাহলেও অস্থির হবেন না। হাতে যতটুকু সময়ই থাকুক, সেটুকুই যথাসম্ভব ব্যবহার করুন।

কিছু দিন হয়তাে অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি ব্যস্ততায় কাটতে পারে। ফলে মনে মনে কুরআনের যে অংশটুকু পড়বেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন, সেটুকু আপনার পড়া হয়ে উঠলাে না। নিজের কাছেই এটার জন্য দায়বদ্ধ হয়ে থাকুন এবং পরের দিনের জন্য যা যা পরিকল্পনা করে রেখেছেন, সেগুলাের আগেই এই মিস হয়ে যাওয়া কাজটা করে ফেলছেন, সেটা নিশ্চিত করুন।

রামাদানে যে লক্ষ্যগুলাে আপনি হাসিল করতে চাইছেন সেগুলাের পথে স্থির থাকার জন্যে আপনার নিয়মিত একটা অভ্যাসের খুব দরকার। এটা নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি একটা কাজ। আরাে ভালাে হয়, বন্ধুরা মিলে একটা রামাদান পরবর্তী কুরআন গ্রুপ বানিয়ে ফেলুন। এটা আপনাকে অনুপ্রাণিত থাকতে সাহায্য করবে এবং এমনকি যখন আপনার মনে হবে আপনার উৎসাহের জোয়ারে ভাটা পড়ছে ঠিক সেই সময়টাতেও এই উদ্যোগের ফলে আপনি নিজেকে কুরআনের সাথে যুক্ত রাখতে পারবেন।

মনে রাখবেন, কুরআনের সাথে যেটুকু সময়ই আপনি কাটান না কেন, সেটা আপনার জন্য সাহায্য হিসেবে এমনভাবে ফিরে আসবে যে আপনি সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না।

সাওম আর কুরআন কিয়ামতের দিন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। সাওম বলবে: হে আল্লাহ, দিনের বেলা আমি তাকে খাবার আর তার আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রেখেছি; তার জন্য আমাকে সুপারিশ করতে দিন। আর কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতের বেলা জাগিয়ে রেখেছি; আমাকেও তার জন্য সুপারিশ করতে দিন। তাদের দুইজনকেই সুপারিশের অনুমতি দেওয়া হবে।[4]

(৪) শয়তানকে আপনার উপর বিজয়ী হতে দেবেন না

কেন আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করতে পারি না এবং কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারি না সেজন্য আমরা অজুহাত দিয়ে দিয়ে দেরি করে ফেলি।

  • আপনার “সময়ের অভাব থাকতে পারে – কিন্তু তার মানে এই না যে ব্যস্ততার ভিড়ে যেটুকু সময় পাবেন তা অকাজে ব্যয় করবেন, নেট সার্ফিং করবেন। অলস কাজকারবার ঝেড়ে ফেলুন নয়তাে ঘুম থেকে ১৫ মিনিট আগে উঠুন।
  • আপনার হয়তাে এটা ভেবে খারাপ লাগছে যে যাইই পড়েন না কেন, তার কিছুই “আপনি বুঝতে পারেন না”, আপনি কুরআনের একজন শিক্ষককে খুঁজে বের করুন, তার কাছে কুরআনের অর্থ আর তাফসীর পড়তে শুরু করুন অথবা পারলে আরবি শিখুন।
  • আপনি হয়তাে ভাবছেন “সপ্তাহে ছুটির দিনে পড়তে বসবেন”—নিজেকে জীবনের বাস্তবতাটা বােঝার চেষ্টা করুন। আগামীকাল তাে নাও পেতে পারেন। অতএব যা করার সেটা আজই!
  • দুঃখজনকভাবে এটা হতে পারে “আমি জানি না কেন আমার এই অভ্যাসটা হয় না” – এরকম কোন একটা সমস্যা। যদি অভ্যাস করতে চান তাে সেজন্য কষ্ট করতে হবে। পাহাড়ে চড়া খুব একটা সহজ কাজ নয়, কিন্তু উঠতে যেয়ে যদি মাঝপথেই থেমে যান তাহলে আর কোনদিন পাহাড়ের চূড়ায় আপনার পৌঁছানাে হবে না। থেমে যাওয়ার চেয়ে আস্তে আস্তে এগােনােটাই উত্তম।

মনে রাখবেন, যখনই আপনি আল্লাহর দিকে একধাপ এগিয়ে যাবেন তখনই শয়তান আপনাকে বাধা দিতে আসবে।এখন রামাদানের পরে তাে সে মুক্ত। সে এখন চাইবে আপনার সাথে হাজারাে ধরনের মানসিক খেলা খেলতে, যাতে করে আপনাকে আরাে বেশি ভালাে একজন মুসলিম হতে বাধা দেওয়া যায়। কুরআনের সাথে সময় কাটাতে দেরি করিয়ে দেবার জন্য লাখখানেক অজুহাত নিয়ে সে আপনার কাছে আসবে। কিন্তু আপনি ধরা দেবেন না। বরং যখনই সে কোন অজুহাত নিয়ে আসবে তখনই উল্টো তাকেই ধরে ফেলুন।

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ১৭৬ – ১৮১


[1] সূরা নাহল, আয়াত-ম; ৮১
[2] সূরা ত্বোহা, আয়াত-ম; ০২
[3] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৮১১
[4] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম; ৬৬২৬

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন