আপনার ব্যক্তিত্ব বিকশিত করুন

0
97

লেখক: শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল-আরিফী | অনুবাদক: কাজী মুহাম্মদ হানিফ

আপনার ব্যক্তিত্ব বিকশিত করুন সবার ব্যক্তিত্বের বিকাশ একরকম নয়। অনেকে তাে এমন যে, এ ক্ষেত্রে তার কোনাে উন্নতিই নেই। চলছে তাে চলছেই। এ রকম বিশ বছরের কোনাে যুবকের সাথে আপনি কিছুক্ষণ বসলে দেখবেন তার নির্দিষ্ট লাইফ স্টাইল, বাচনভঙ্গি ও চিন্তাধারা রয়েছে। দশ বছর পর আবার তাকে দেখুন। দেখবেন, তার সার্বিক অবস্থা আগের মতেই রয়ে গেছে। তার কোনাে উন্নতিই হয় নি। তবে এমন অনেক যুবকের দেখাও আপনি পাবেন, যাদের ব্যক্তিত্ব। প্রতিদিনই বিকশিত হচ্ছে।

আগের দিনের চেয়ে পরের দিন তার ব্যক্তিত্ব উল্লেখযােগ্য হারে উন্নত হচ্ছে; বরং বলা যায় প্রতি মুহূর্তেই সে আত্মােন্নয়নের ধাপ অতিক্রম করে চলছে। এমন কেন হয়? বিষয়টি নিয়ে একটু আলােচনা করা যাক। মনে করুন, দু’জন ব্যক্তি নিয়মিত টিভি চ্যানেল দেখে। এদের একজন এমনসব প্রােগ্রাম দেখে যেগুলাে তার চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে ও মেধার বিকাশে সহায়ক হয় এবং জ্ঞানগর্ভ সংলাপ ও টকশোয়ে থেকে অন্যদের অভিজ্ঞতাসমূহকে জেনে তা নিজের জীবনে কাজে লাগায়। এর মাধ্যমে সে চমৎকার বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ভাষা-গত দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বিতর্কের কলা-কৌশল আয়ত্ত করতে পারে। অপরপক্ষে দ্বিতীয়জন শুধু প্রেমকাহিনী-নির্ভর নাটক, সিরিজ, আবেগপূর্ণ চলচ্চিত্র ও এ্যাকশনধর্মী ছায়াছবি দেখে সময় কাটায়। পাঁচ-দশ বছর পর দু’জনের চিন্তাধারা ও ব্যক্তিত্ব কেমন হবে? দু’জনের মধ্যে কার আত্মশক্তি বেশি সমৃদ্ধ হবে?

জেনারেল নলেজের দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পরিধি, অপরকে প্রভাবিত করার যােগ্যতা ও প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানাের সফলতার ক্ষেত্রে উভয়ের সক্ষমতা কি। এক রকম হবে? কখনাে নয়; বরং এসব ক্ষেত্রে প্রথম-জনের দক্ষতা ও যােগ্যতা হবে দ্বিতীয়জনের তুলনায় অনেক বেশি ও ভিন্নধর্মী। দু’জনের কথাবার্তার ঢং ও উদ্ধৃতি দেয়ার পদ্ধতিও হবে ভিন্নরকম । প্রথম-জন কুরআন, হাদিস, সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে উদ্ধৃতি দেবে। আর জীবনকে উপভােগ করুন অপর দিকে দ্বিতীয় জন অভিনেতা ও নায়ক-নায়িকাদের সংলাপ ও গানের কলি দিয়ে উদ্ধৃতি দেবে। এ ধরনের একজন ব্যক্তি একদিন আমার সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ বললাে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “হে বান্দা! তুমি চেষ্টা কর। আমিও তােমার সঙ্গে চেষ্টা করব। আমি তাকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম, ভাইজান, আপনি এটা কি বলছেন! এটা তাে কুরআনের আয়াত তথা আল্লাহর কথা নয়। আমার কথা শুনে লােকটার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল।

সে একেবারে থ বনে গেল। পরবর্তীতে তার কথাটির উৎস নিয়ে আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। আমার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলাে যে, এটা ছিল মিশরীয় একটি প্রবাদ বাক্য। যা কোনাে ধারাবাহিক নাটক থেকে শুনে তার মনে গেঁথে গেছে। বস্তুত যে পাত্রে যা থাকে তা থেকে তাই ঝরে। আরেকটি বিষয় প্রণিধানযােগ্য, পত্র-পত্রিকা তাে অনেকেই পড়েন কিন্তু কয়জন পাঠক এমন আছেন যারা উপকারী সংবাদ, তথ্যবহুল ফিচার ও সম্পাদকীয় কলাম পড়েন, যা তাদের আত্মবিকাশ, দক্ষতাবৃদ্ধি ও প্রজ্ঞার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। এ ধরনের পাঠকের সংখ্যা খুবই কম। অথচ খেলার খবর ও বিনােদনের পাতা পড়ার মতাে লােকের অভাব নেই। এ কারণেই পত্র-পত্রিকাগুলােতে বর্তমানে খেলার খবর ও বিনােদনের পাতার কলেবর বাড়ানাের প্রতিযােগিতা চলছে। শুধু যে পত্র-পত্রিকা পাঠের ব্যাপারে এ মনােভাব বিরাজ করছে তা নয়; বরং আমাদের বিভিন্ন আলােচনার আসরগুলাের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযােজ্য। আমাদের সময় কাটানাের ক্ষেত্রগুলােতেও অনুরূপ অবস্থা বিরাজমান। সব জায়গায় আমরা অহেতুক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আপনি যদি ‘লেজ’ না হয়ে মাথা হতে চান, জীবনে বড় কিছু করতে চান তাহলে জীবনের প্রতি মুহূর্তে আপনাকে আত্মবিকাশে মনােযােগী হতে হবে । নিজের যােগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশে সহায়ক এমন কাজ করতে হবে। এজন্য আপনাকে প্রচুর অনুশীলন করতে হবে।

আবদুল্লাহ নামে এক উদ্যমী ব্যক্তি ছিল। কিন্তু তার মধ্যে অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি ছিল। একদিন সে জোহরের নামায পড়ার জন্য মসজিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাে । নামাযের প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। দ্বীনের প্রতি সীমাহীন অনুরাগ তাকে মসজিদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। পাছে জামাত মিস হয়ে যায় কি-না এ আশঙ্কায় সে দ্রুত হাঁটছিল। কিন্তু মসজিদে যাওয়ার পথে সে একজন লােককে দেখলাে, লােকটি খেজুর গাছের ওপর বসে খেজুরের কাঁদি ঠিক করছে। ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছিল যে, সে আযান শুনে নি কিংবা নামায পড়ার কোনাে গরজ অনুভব করছে না। এটা দেখে তাে আবদুল্লাহ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। সে ঝাঁঝালাে স্বরে বললাে, “এ বেটা! নামাযের জন্য তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে আয়। লেকটি শান্তভাবে উত্তর দিল, “ঠিক আছে ভাই, আসছি। আবদুল্লাহ বললাে, তাড়াতাড়ি কর । বেটা গাধা কোথাকার! গাধা শব্দটি শােনার সাথে সাথে লােকটির মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে রাগে খেজুরের গাছ থেকে একটি শাখা কেটে নিয়ে বললাে ‘কি বললে আমি গাধা? একটু দাঁড়াও তােমার বারােটা বাজিয়ে দেব। অবস্থা খারাপ দেখে লােকটি যেন তাকে চিনতে না পারে তাই সে রুমাল দিয়ে চেহারা ঢেকে মসজিদের দিকে দৌড় দিল। এদিকে লােকটি গাছ থেকে নেমে আবদুল্লাহকে না পেয়ে বাড়ি চলে গেল এবং নামায পড়ে কিছুটা শান্ত হলাে। হালকা বিশ্রাম নিয়ে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার জন্য আবার গাছে চড়লাে। আসরের সময় আবদুল্লাহ নামায পড়তে বের হলাে। লােকটিও আগের মতই গাছের ওপর বসে কাজ করছিল। আব্দুল্লাহ এবার দাওয়াতের রীতি পরিবর্তন করে ফেললাে। সে লােকটিকে সালাম দিয়ে বললাে, “ভাইজান! কেমন আছেন? লােকটি বললাে, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালাে আছি। এরপর আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলাে, “এবছর খেজুর কেমন হয়েছে? লােকটি বললাে, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালাে হয়েছে।

জীবনকে উপভােগ করুন

২৩ এর জবাবে আবদুল্লাহ লােকটির জন্য দোয়া করলাে- ‘আল্লাহ আপনাকে তৌফিক দান করুন। আপনার ফল ও ফসলে বরকত দান করুন। আপনার রিযিক বাড়িয়ে দিন। আপনার পরিশ্রমের উত্তম প্রতিদান দান করুন। আপনার সন্তানদেরকেও অনুরূপ দান করুন। আবদুল্লাহর দোয়া শুনে লােকটি খুশি হয়ে আমিন আমিন বলতে লাগলাে। এরপর তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাে। এরপর আব্দুল্লাহ বললাে, মনে হচ্ছে, কাজের ব্যস্ততার কারণে আসরের আযান শুনতে পান নি। আসরের আযান তাে হয়ে গেছে। একামতের সময়ও হয়ে গেছে। এখন একটু কাজে বিরতি দিয়ে নামাযটা পড়ে নিন। নামাযের পর অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে পারবেন। আল্লাহ আপনার শরীর সুস্থ রাখুন। লােকটি খুশি হয়ে বললাে, ইনশাআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ। এরপর সে আস্তে আস্তে গাছ থেকে নামলাে। নীচে নেমে সে আবদুল্লাহর সঙ্গে করমর্দন করলাে। এরপর বললাে, “এমন চমৎকার ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। তবে জোহরের সময় যে লােকটার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল তাকে ধরতে পারলে বুঝিয়ে দিতাম, গাধা কে?!

ফলাফল… আপনি অন্যদের সাথে যেমন আচরণ করবেন, অন্যরাও আপনার সাথে তেমন আচরণ করবে।

উৎসঃ Enjoy Your Life (Bangla Version) , অধ্যায়ঃ ৪, পৃষ্ঠা: ২০ – ২৩

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন