নারীর সঙ্গে আপনার আচরণ যেমন হওয়া উচিত পর্ব ২

0
81

লেখক: শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল-আরিফী | অনুবাদক: কাজী মুহাম্মদ হানিফ

পর্ব: ১ | পর্ব: ২

অবরুদ্ধ থাকার পর তারা আত্মসমর্পণ করলাে এবং তাদের ব্যাপারে রাসূলের যেকোনাে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সম্মত হলাে। রাসূল যখন তাদেরকে শাস্তি দিতে চাইলেন তখন মুসলিম নামধারী শয়তানের এক চেলা বাধা হয়ে দাঁড়াল। তার কাছে একজন মুসলিম নারীর ইজ্জতের কোনাে মূল্য নেই। নারীর মান রক্ষার কোনাে খেয়াল তার নেই। উদর ও যৌনাঙ্গের কামনা – বাসনা চরিতার্থ করাই তার জীবনের মূল লক্ষ্য। সে ছিল মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই । সে দাবি তুলল, “আমার মিত্র ইহুদিদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। জাহেলী যুগে এ ইহুদিরা তার সহযােগী ছিল। রাসূল তার এ দাবি মানতে অস্বীকার করলেন। যারা সবসময় মুসলমানদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়ানাের দুরভিসন্ধি আঁটতে থাকে, তাদের ক্ষমা করার সুপারিশ সে কিভাবে করলাে? আর রাসূল এ এ দাবি কিভাবে মানবেন? কিন্তু মুনাফিক নাছােড়বান্দা।

রাসূলকে আবারও সে বললাে, “হে মুহাম্মদ! এদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন। রাসূল এবারও মুসলমানদের মান সম্মান নারীদের আত্মমর্যাদাবােধের কথা চিন্তা করে আবদুল্লাহ বিন উবাইর আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন। মুনাফিক সরদার তখন রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে রাসূলের লৌহবর্মের ভেতর হাত ঢুকিয়ে টানাটানি করতে লাগল আর বলতে লাগল, আমার মিত্রদের প্রতি সদাচরণ করুন। আমার মিত্রদের প্রতি সদাচরণ করুন। রাসূল রাগান্বিত হলেন। এরপর সজোরে বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু নির্লজ্জ মুনাফিক সরদার তা সত্ত্বেও ইহুদিদেরকে বাঁচাতে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। অবশেষে চোখলজ্জায় দয়ার নবী বললেন, ঠিক আছে, তাদের ব্যাপারে তােমার কথাই থকল। রাসূল প্রাণদণ্ড থেকে তাদের মুক্তি দিলেন। তবে পবিত্র ভূমি মদিনা থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করলেন। তাদেরকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিলেন।

একজন নারীর মান রক্ষার জন্য প্রয়ােজনে এর চেয়েও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দ্বিধা করা যাবে না । খাওলা বিনতে সা’লাবাহ ছিলেন পূণ্যবতী এক মহিলা সাহাবী। তার স্বামী আওস বিন সামেত ছিলেন খুব বৃদ্ধ। একটু এদিক সেদিক হলেই তিনি রেগে যেতেন। একদিন তিনি গােত্রীয় বৈঠক থেকে ফিরে খাওলার কাছে এসে তাকে একটা কাজ করতে বললেন। কিন্তু খাওলা কাজটি করতে অস্বীকার করলাে । এতে উভয়ের মাঝে ঝগড়া বেঁধে গেল। ঝগড়ার একপর্যায়ে আওস প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতাে!’ এ কথা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। জাহেলী যুগে কেউ একথা বললে তার স্ত্রী তালাক হয়ে যেতাে। কিন্তু এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী-খাওলা তা জানতাে না। আওস ঘরে ফিরে লক্ষ্য করলেন, খাওলা তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। একপর্যায়ে খাওলা তাকে বললেন, ‘কসম সে সত্তার, যার হাতে খাওলার প্রাণ! তুমি যা বলার তা তাে বলেই ফেলেছ।

এ ব্যাপারে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বিধান কী তা না জেনে তুমি আমার কাছে আসতে পারবে না।’ এরপর খাওলা রাসূলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। রাসূলের কাছে গিয়ে স্বামীর বক্তব্য তুলে ধরলেন। এরপর স্বামীর পক্ষ থেকে যেসব দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণের শিকার হতেন তা জানালেন। রাসূল সবকিছু শুনে তাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বললেন, “হে খাওলা! সে তােমার চাচাতাে ভাই এবং একজন বৃদ্ধ মানুষ। তার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। রাসূলের কথা শুনে খাওলা অশ্রুসজল চোখে বললাে, “হে আল্লাহর রাসূল! যৌবনকালে সে আমাকে বিয়ে করেছে। আমার যৌবন তার হাতে নিঃশেষ হয়েছে। তার সন্তান ধারণের জন্য আমার উদর নিবেদিত হয়েছে। এখন আমার জীবন যৌবন যখন শেষ, সন্তান ধারণের ক্ষমতা আর নেই তখন সে আমাকে তালাক (যিহার) দিল?!’

“হে আল্লাহ! আমি তােমার কাছেই অভিযােগ করছি।’ রাসূল এ সম্পর্কিত বিধান জানতে ওহীর অপেক্ষা করছিলেন। খাওলা তখনাে রাসূলের কাছে উপস্থিত। ইতােমধ্যে জিবরাঈল (আ.) উপস্থিত হলেন। আলােচ্য সমস্যার সমাধান নিয়ে তিনি এসেছেন। রাসূল খাওলাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘খাওলা! তােমার স্বামী ও তােমার ঘটনার সমাধান নিয়ে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: “(হে নবী!) আল্লাহ সে নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সঙ্গে বাদানুবাদ এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছে । আল্লাহ আপনাদের কথােপকথন শুনছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা মুজাদালাহ: ১]

এভাবে সুরা মুজাদালার শুরু হতে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে খাওলাকে বললেন, ‘তােমার স্বামীকে বলে দাও সে যেন একটি গােলাম আজাদ করে দেয়। খাওলা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তার তাে কোনাে গােলাম নেই। রাসূল : ‘তাহলে তাকে লাগাতার দুই মাস রােযা রাখতে বল । খাওলা : “সে তাে অতিশয় বৃদ্ধ । এভাবে রােযা রাখার সামর্থ্যও তার নেই।’ রাসূল সা: তাহলে তাকে বল, সে যেন সত্তরজন মিসকিনকে এক ওয়াসক করে খেজুর দিয়ে দেয়। খাওলা : তার কাছে খেজুরও নেই। রাসূল সা: ‘তাহলে আমি এক ঝুড়ি খেজুর দিয়ে তাকে সাহায্য করব।’ খাওলা : ‘তাহলে আমিও তাকে এক ঝুড়ি খেজুর দেব।’ রাসূল বললেন, ‘বেশ ভালাে। যাও, তার পক্ষ থেকে এগুলাে দান করে দাও। আর তার সঙ্গে সদাচরণ কর।‘ (আহমদ ও আবু দাউদ)

সুবহানাল্লাহ, আল্লাহ তার রাসূলকে সকলের সঙ্গে কোমলতা ও সহনশীলতা প্রদর্শনের মতাে চারিত্রিক গুণ দান করেছিলেন। এমনকি মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানেও তিনি ছিলেন আন্তরিক ও উদার। আমি নিজেও আমার স্ত্রী-কন্যাদের সঙ্গে কোমল ও আবেগী আচরণ করে দেখেছি। এর আগেও করেছি মা ও বােনের সঙ্গে। আমি এর কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব উপলব্ধি করেছি। এসব আচরণ কৌশলের অনুশীলন ছাড়া কেউ এর প্রভাব উপলব্ধি করতে পারবে না। এ আলােচনার শেষ পর্যায়ে একটি বাস্তব সত্য বলছি, সম্রান্ত ব্যক্তিরাই নারীকে সম্মান করে। আর ইতর ও নিম্ন শ্রেণির লােকেরাই নারীকে অবমাননা করে।

একটু থামুন… স্বামীর দরিদ্রতা, চেহারার শ্রীহীনতা ও কিন্তু স্বামীর অসদাচরণ ও রূঢ় ব্যবহার , সে কখনাে মানতে পারে না।

পর্ব: ১ | পর্ব: ২

উৎসঃ Enjoy Your Life (Bangla Version) , অধ্যায়ঃ ১০, পৃষ্ঠা: ৪৭ – ৫৪

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন