মুসলিম মনীষীদের কাছে বই পড়ার গুরুত্ব

0
37

লেখক: মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ | অনুবাদক: আবদুল্লাহ আল মাসউদ

উলামায়ে কেরামের হৃদয়ে ইলমী বই-পুস্তকের প্রতি অনুরাগ ছিল। বই ছিল তাদের এমন বন্ধু, যে কখনও বিরক্ত করে না। সফরে তাদের সাথে থাকে । নিঃসঙ্গতার সময়ে সঙ্গ দেয়।

আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. কে বলা হল, ‘হে আবু আব্দুর রহমান! কেন তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে বের হয়ে তাদের সঙ্গে বসো না?’
তিনি বললেন, ‘আমি যখন ঘরে থাকি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীদের সঙ্গেই থাকি।’ অর্থাৎ তাদের বই-পুস্তক পড়ি।

শফীক ইবনে ইবরাহীম বলখী রাহ. বলেন, ‘আমরা ইবনুল মোবারককে বললাম, তুমি তো আমাদের সাথেই সালাত আদায় করো। তাহলে আমাদের সাথে বসো না কেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি ফিরে গিয়ে সাহাবা ও তাবেয়ীদের সাথে বসি।’ আমি বললাম, ‘সাহাবা-তাবেয়ীদের আবার তুমি কই পেলে?” তিনি বললেন, ‘আমি ফিরে গিয়ে ইলমের প্রতি মনোনিবেশ করি। তখন তাদের কথা ও কর্মের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তোমাদের সাথে বসে কি করবো? তোমরা তো বসেই মানুষের দোষচর্চা করা শুরু করো!‘ [তায়ীদুল ইলম : ১২৬]

ইবনে শিহাব যুহরী রাহ. প্রচুর গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন। সারাদিন তিনি সেগুলো নিয়েই পড়ে থাকতেন। ফলে তাঁর স্ত্রী একদিন তাকে বলেই ফেললেন, ‘আল্লাহর কসম! তিন সতিন থাকার চেয়েও এসব বই আমার জন্য বেশি যন্ত্রণাদায়ক।‘ [সাজারাতুয যাহাব : ১/১৬৩]

পূর্ববর্তী মনীষীদের কাউকে প্রশ্ন করা হল, ‘কে আপনাকে নির্জনে সঙ্গ দেয়?’ তিনি তার গ্রন্থাবলীর দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বললেন, ‘এগুলো’। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আর মানুষের মধ্যে?’ তিনি বললেন, ‘যারা এর ভেতর আছে তারা।‘ [তাকয়ীদুল ইলম- ১২৫]

পূর্ববর্তী মনীষীরা সর্বাবস্থায় পড়তেন। ইবনুল কাইয়িম রাহ. বলেন, ‘আমি এক ব্যক্তিকে চিনি, যার প্রচণ্ড জ্বর ও মাথাব্যথার অসুখ হয়েছিল । তার সিথানের পাশে একটা বই থাকতো। যখন সে কিছুটা হুশ ফিরে পেতো তখনই পড়া শুরু করে দিতো। আবার অসুখ বেড়ে গেলে তা রেখে দিতো। একদিন ডাক্তার এসে তার এই অবস্থা দেখে বললেন, ‘এমন করাটা আপনার জন্য ঠিক হচ্ছে না।‘ [রওজাতুল মুহিব্বীন-৭০]

হাসান ইবনে লু’লু রাহ. বলেন, ‘আমার চল্লিশটা বছর এমন কেটেছে যে, বুকের উপর একটা বই রেখে আমি ঘুমিয়েছি ও ঘুম থেকে উঠেছি।‘ [জামিউ বায়ানিল ইলম- ২/২০৩]

তাদের কারো কারো অবস্থা এমন ছিল যে, তারা বিছানার পাশে বেশ কিছু বই রাখতেন। যাতে ঘুমের আগে ও ঘুম থেকে উঠার পরে সেগুলোর প্রতি নজর বুলাতে পারেন।[তাকয়ীদুল ইলম- ১২৪]

খতীব বাগদাদী রাহ. যখনই রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন তার হাতে ছোট একটা পুস্তিকা রাখতেন এবং হাঁটতে হাঁটতেই সেটা পড়তে থাকতেন । অনেক আলেমদেরকে কেউ দাওয়াত করলে তিনি শর্তারোপ করতেন, তার জন্য একটা আলাদা জায়গা রাখতে হবে। সেখানে কিছু বইয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে তিনি সেখানে যাবার পর বই পড়তে পারেন।‘ [আল-হাসসু আলা তলাবিল ইলম- ৪০]

অনেক সময় পড়ার জন্য রাখা চেরাগ থেকে তাদের কারো কারো পাগড়ির প্রান্তভাগে আগুন লেগে যেত । কিন্তু তারা ততোক্ষণ পর্যন্ত টের পেতেন না যতোক্ষণ না তাদের কিছু চুল পুড়ে যেতো। আবুল আব্বাস মুবাররাদ রাহ. বলেন, ‘আমি তিন জনের চেয়ে বেশি বইয়ের প্রতি আগ্রহী আর কাউকে দেখি নি। একজন হল জাহেয। সে বেদআতি মুতাযিলা দলভুক্ত ছিল

দ্বিতীয়জন ফাতাহ ইবনে খাকান। তৃতীয়জন কাজী ইবরাহীম ইবনে ইসহাক। জাহেযের হাতে কোন বই আসলেই তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঝটপট পড়ে ফেলতেন। চাই সেটা যেমন বই-ই হোক না কেন। আর ফাতাহ ইবনে খাকান তার মোজার ভেতর বই বয়ে বেড়াতেন । যখনই মুতাত্তাক্কিলের সামনে থেকে পস্রাব করার জন্য কিংবা সালাত আদায় করার জন্য উঠে যেতেন তখন বই বের করে গন্তব্যস্থল আসা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে বইটি দেখতে থাকতেন। ফেরার পথেও তিনি একই কাজ করতেন । আর ইসমাইল ইবনে ইসহাকের কাছে আমি যখনই গিয়েছি, দেখেছি তিনি হাতে থাকা কোনো বই পড়ছেন কিংবা পড়ার জন্য বই তালাশ করছেন।‘ [তাকয়ীদুল ইলম-১৪০]

বই সংগ্রহ করা ও সেগুলো পড়ার প্রতি পূর্ববর্তী মুসলিম উলামায়ে কেরামের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। ইবনুল জাওযী রাহ. বলেন, ‘আমি নিজের ঘটনা বলি । কখনোই আমি বই পড়ে পরিতৃপ্ত হই নি। যদি এমন কোন বই পেতাম যা আগে কখনও দেখি নি তাহলে মনে হতো যেন আমি গুপ্তধন পেয়েছি। আমার বিশ হাজারেরও বেশি বই পড়া হয়েছে তবুও আমি নতুন বইয়ের তালাশে থাকি।‘ [সয়দুল খাতির-১৪৯]

পূর্ববর্তী মনীষীরা বইপুস্তক সংগ্রহের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করতেন। অনেকে তো সব টাকাপয়সা এর জন্যই বিলিয়ে দিতেন। একবার কারো স্ত্রী তাকে বেশি বেশি বই কেনার কারণে তিরষ্কার করে বলেছিলেন মায়াবতী স্ত্রী ডাক দিয়ে বলে, বই কিনে সব টাকা ফেলে দিলে জলে!

বললাম, আরে ছাড়ো, কিনেছি তো বই; এর মাঝে লাভ ছাড়া ক্ষতি আছে কই!

ফাইরুযাবাদী রাহ. পঞ্চাশ হাজার মিসকাল স্বর্ণের সমপরিমাণ বই কিনেছিলেন। কোথাও সফরে বের হলে সেসব কিতাবের বিরাট বড় বোঝা তার সাথে থাকতো । কোথাও বিরতি দিলে তিনি সেগুলো পড়তেন।[আলদওউল লামে- ১০/৮১]

কোন কোন আলেম জামা তৈরি করার সময় বইয়ের কথা মাথায় রাখতেন। ইমাম আবু দাউদ রাহ. এর জামার মধ্যে একটা বড় আরেকটা ছোট আস্তিন থাকতো। তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘বড়টা বইয়ের জন্য । আর ছোটটার তেমন দরকার পড়ে না।‘ [তাযকিরাতুল হুফফাজ- ২/৫৯২]

অনেকের কাছে বইয়ের বিশাল বড় ভাণ্ডার থাকতো। সেখানে প্রত্যেক বইয়ের তিনটা করে কপি থাকতো। বইয়ের প্রতি তাদের এতো বেশি গুরুত্ব ছিল যে, তারা এমন অনেক স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে একজন ছাত্র বইয়ের সঙ্গে কিভাবে শিষ্টাচার বজায় রাখবে, কিভাবে বই কপি করবে, কলম-কালি ও তার রঙ নির্বাচন করবে, কিভাবে বইয়ের যত্ন নিবে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

উৎস: কী পড়বেন কীভাবে পড়বেনপৃষ্ঠা: ১৫ – ১৯

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন