কানের সিয়াম

0
227

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

আল্লাহ তাআলা বলেন—

নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং অন্তর, এ সব কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। [1]

সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে, কান যা কিছু শ্রবণ করে সে-সম্পর্কে আল্লাহর সামনে জিজ্ঞাসিত হবে। সৎলােক তারাই, যারা ভালাে কথা শ্রবণ করে এবং সর্বোত্তম ও সবচেয়ে উপযােগী কথাটির অনুসরণ করে চলে। আর আফসােস তার জন্য, যে তার কানকে হেদায়াতের বাণী শ্রবণ করা থেকে দূরে রাখে এবং সত্যের বাণী শােনার পরিবর্তে কানে তালা দিয়ে রাখে।

সুতরাং, কানের সিয়াম হলাে অশ্লীল কথা-বার্তা, গান-বাজনা ও নোংরা আলােচনা শােনা থেকে বিরত থাকা। আর পুণ্যবানদের সবচেয়ে বড় সিয়াম হলাে, আল্লাহ ক্রুদ্ধ হতে পারেন এমন যে-কোনাে কিছু শােনা থেকে রামাদান ও রামাদান পরবর্তী সময়ে বিরত থাকা।

আল্লাহ মানুষকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে-অনুগ্রহ করেছেন, তার ব্যাপারে অনেক মানুষ অবহেলা করে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—

অনেক জিন ও ইনসানকে আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য। তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না। তাদের কান আছে, কিন্তু তা দ্বারা শােনে না। তারা হলাে চতুষ্পদ জন্তুর মতাে; বরং তারা এর চেয়েও নির্বোধ। উপরন্তু তারাই হলাে গাফিল।[2]

হ্যাঁ, তাদের কান আছে, তারা পারস্পরিক কথাবার্তা শোনে; কিন্তু উপদেশ গ্রহণের জন্য, হৃদয়ের গভীরে উপলব্ধি জাগ্রত করার জন্য কিংবা মহাসত্য নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার জন্য শােনে না। তাদের শােনা পুরােপুরি জন্তু-জানােয়ারের শােনার মতাে। এতে না আছে কোনাে উপদেশ বা শিক্ষা গ্রহণ, না আছে কোন উপকার বা লাভ। এদের সম্পর্কেই মহান আল্লাহ বলেন—

হে রাসূল, আপনার কি মনে হয়, তাদের অধিকাংশ লােক শােনে কিংবা উপলব্ধি করে? না, তারা তাে চতুষ্পদ জানােয়ারের মতাে; বরং তার চেয়েও পথভ্রষ্টা। [3]

একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা হারাম গান-বাদ্য, অশ্লীল কথা-বার্তা ও অহেতুক আলাপ-আলােচনা শুনতে শুনতে তাদের কানের প্রাকৃতিক শ্রবণশক্তি নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে কুরআন তিলাওয়াত ও সদুপােদেশ এখন তাদের কানে যায় না। অথচ এই কুরআন তিলাওয়াত শােনা শরয়ী কাজ। নববী আদর্শ ও শ্রবণযন্ত্রের ন্যায্য অধিকার।

অধিকন্তু কুরআন শ্রবণ করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়, দুশ্চিন্তা ও বিকৃত ধ্যান-ধারণা দূরীভূত হয়, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, হৃদয়ে প্রশান্তির মৃদু সমীরণ বয়ে যায়, অন্তর হিদায়াতের আলােয় উদ্ভাসিত হয়, জ্ঞানসত্তা প্রশান্ত ও পরিতৃপ্ত হয়—সর্বোপরি ইহকাল ও পরকালের সাফল্য নিশ্চিত হয়।

অতএব, কানের সবচেয়ে উপযােগী ও উপকারী খােরাক হলাে—কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকির, উপকারী জ্ঞান, সুন্দর উপদেশ এবং প্রয়ােজনীয় শিষ্টাচার ও শিক্ষামূলক ঘটনা শ্রবণ করা।

আবু হাতেম থেকে জায়্যিদ সনদে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) মদীনায় একজন বৃদ্ধার। বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার দরজার বাইরে থেকে তিলাওয়াত শুনতে পান। বৃদ্ধ সূরা গাশিয়ার নিম্নোক্ত আয়াতটি বারবার তিলাওয়াত করছিলেন—

তােমার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের সংবাদ পৌঁছেছে কি?[4]

বৃদ্ধ এই আয়াতটি বারবার তিলাওয়াত করছিলেন আর কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। রাসূল (সাঃ) তার পড়া শুনতে লাগলেন এবং তার পড়ার সাথে সাথে বারবার বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, হ্যাঁ, আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে।[5]

আল্লাহ তাআলা মনােযােগ দিয়ে কুরআন শােনার কারণে একদল লােকের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন—

রাসূলের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন তারা শােনে, তখন তারা যে-সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছে, এ কারণে তাদের চক্ষুগুলাে অশু-বিগলিত দেখবো।[6]

উল্লেখ্য যে, এভাবে যারা মনোযােগে কুরআন তিলাওয়াত শোনে তারাই কুরআনের প্রকৃত কল্যাণ ও বরকত লাভ করে।

যারা প্রকৃত অর্থেই সিয়াম পালন করে, কুরআন তিলাওয়াত শুনলে তাদের কানে যেন মধু বর্ষণ হয়; হৃদয়ে প্রশান্তির হিমেল হাওয়া বয়ে যায়। পক্ষান্তরে সিয়ামের নামে যারা শুধু উপবাস যাপন করে, তাদের কাছে কুরআন তিলাওয়াত দুঃসহ মনে হয়; কুরআন তিলাওয়াত শুনলে তাদের নষ্ট অন্তরগুলাে বিষাদে ছেয়ে যায়।

উপরন্তু কোনাে মুসলিমের শ্রবণযন্ত্র যখন পাপকথাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয় তখন তা ভেতরে গিয়ে হৃদয়-ভূমিকে বিরাণ করে। সংকল্পের সুদৃঢ় প্রাচীর গুড়িয়ে দেয় এবং জ্ঞানসত্তা ও সুকুমারবৃত্তিগুলাে বিনষ্ট করে ফেলে। নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণিত দুই শ্রেণির অবস্থা নিয়ে একটু চিন্তা করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন—

যখন কোনাে সূরা নাযিল হয়, তখন তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলে, এই সূরা তােমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? যারা ঈমান এনেছে, তা তাদেরই ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা এতে আনন্দিত হয়। আর যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তাদের কলুষতার সাথে আরও কলুষতা যুক্ত করে দেয় এবং তারা কাফির অবস্থায় মারা যায়।[7]

পূর্বোক্ত আলােচনা ও উধৃত আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, সত্য কথা শ্রবণ করলে সত্যের ওপর অটল থাকার ইচ্ছা-শক্তি বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে বাতিল ও ভ্রান্ত কথা শ্রবণ করলে অন্তরে বাতিলের প্রভাব সৃষ্টি হয়। কাজেই মুসলমানদের অপরিহার্য কর্তব্য হলাে, আল্লাহপ্রদত্ত শ্রবণশক্তিকে বিশেষ নিয়ামত হিসেবে গণ্য করা। এর জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং রবের সন্তুষ্টির কাজে এই নিয়ামত ব্যবহার করা। সেই সঙ্গে বেশি বেশি যিকির, তিলাওয়াত ও জ্ঞানমূলক আলােচনা শােনা এবং হারাম গান-বাদ্য, অশ্লীল কথা-বার্তা ও অহেতুক গল্প-গুজব শােনা থেকে বিরত থাকা। যারা এগুলাে করতে পারে তাদের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ বলেন—

যখন তারা অসার কথা-বার্তার পাশ দিয়ে অতিক্রান্ত হয়, তখন তারা নিজেদের সম্মান বজায় রেখে ভদ্রভাবে চলে যায়।[8]

তিনি আরও বলেন—

যখন তারা অসার কথা শুনতে পায়, তখন তা উপেক্ষা করে চলে যায় এবং বলে আমাদের কর্মের প্রতিফল আমাদের জন্য আর তােমাদের কর্মের প্রতিফল তােমাদের জন্য। তােমাদের ওপর সালাম। আমরা মূর্খদের সঙ্গ চাই না।[9]

আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই সকল লােকের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা কথা শ্রবণ করে এবং তার মধ্য থেকে উত্তম কথাটি মেনে চলে।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ৭০ – ৭৪


[1] সূরা ইসরা, আয়াত : ৩৬
[2] সূরা আরাফ, আয়াত : ১৭৯
[3] সূরা ফুরকান, আয়াত : ৪৪
[4] সূরা গাশিয়া, আয়াত : ০১
[5] তাফসীর, ইবনু আবি হাতিম: ১৯২১০
[6] সূরা মায়িদা, আয়াত : ৮৩
[7] সূরা তাওবা, আয়াত : ১২৪-১২৫
[8] সূরা ফুরকান, আয়াত : ৭২
[9] সূরা কাসাস, আয়াত : ৫৫

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন