নবীজির সিয়াম পালন

1
359

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রামাদানে নবীজি (সাঃ) খুব বেশি পরিমাণে ইবাদাত করতেন। সালাত, সাদাকা, যিকির, তিলাওয়াত, ইতিকাফ ও অন্যান্য ইবাদাতে সর্বোচ্চ সময় দিতেন। প্রতি রাতেই জিবরীল আলাইহিস সালাম-কে কুরআন শােনাতেন। নিজেও তার তিলাওয়াত শুনতেন। সব সময়ই অকাতরে দান করতেন। তবে জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর সাক্ষাতের সময় হলে বদান্যতায় রহমতের বায়ুকেও ছাড়িয়ে যেতেন তিনি। তার এই অনন্য দান ও বদান্যতা সম্পর্কে একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— তিনি সব সময়ই ছিলেন সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল। তবে রামাদানে বদান্যতায় তিনি নিজেকেও ছাড়িয়ে যেতেন। [1]

এছাড়াও নবীজি (সাঃ) ও অন্যান্য মাসের তুলনায় রামাদানকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এ মাসটিকে শুধুই ইবাদাতের জন্য বরাদ্দ রাখতেন। অনেক সময় ইফতার-সাহরী না খেয়ে একটানা সিয়াম পালন করতেন। রাত-দিন একাকার করে মহান আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন থাকতেন। তবে সাহাবীদের এভাবে সিয়াম পালন করতে বারণ করতেন।

সাহাবীগণ নিবেদন করতেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যে একনাগাড়ে সিয়াম পালন করেন? তিনি বলতেন, “আমি তাে তােমাদের মতাে নই। আমি যখন আমার রবের উদ্দেশ্যে রাত্রিযাপন করি তখন তিনিই আমার পানাহারের [2] ব্যবস্থা করেন। [3]

উল্লেখ্য যে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন লাগাতার সিয়াম পালন করতেন তখন তার সামনে সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য উদঘাটিত হতাে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নতুন নতুন দুআর উন্মােচিত হতাে, রিসালাতের আলােক-ঝরনায় তার জ্ঞানসত্তা আলােকিত হতাে। এবং নবুওয়াতের অমিয় সুধায় তার ব্যক্তিসত্তা পরিতৃপ্ত হতাে। উপযুক্ত হাদীসে এই পরিতৃপ্তিকেই পানাহার বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। অবশ্য এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে। কেননা, অব্যাহত সিয়ামের মধ্য দিয়ে নবী (সাঃ) মহান রবের নিকট-সান্নিধ্য অনুভব করতেন। প্রেমাস্পদের স্মরণে হৃদয় জুড়াতেন। তখন সঙ্গত কারণেই পার্থিব জগৎ ও পানাহারের কথা বেমালুম ভুলে যেতেন।

নবীজি (সাঃ) ছিলেন সবচেয়ে বড় আবিদ—তিনি সর্বদা মহান আল্লাহর ইবাদাত করতেন। তাঁর স্মরণে চিত্ত ও জিহ্বা সিক্ত রাখতেন। রামাদানকে সালাত, সিয়াম, যিকির, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের ভর মৌসুম মনে করতেন। রাতভর সালাতে দাঁড়িয়ে মহান রবের সাথে অন্তরাত্মার সম্পর্ক স্থাপনে মনােযােগি হতেন। নিবেদিত প্রাণ হয়ে তাঁর কাছে দয়া, অনুগ্রহ, সাহায্য, সফলতা ও বিজয়ের মিনতি জানাতেন। লম্বা লম্বা সূরা পড়তেন। রুকু-সিজদায় দীর্ঘসময় কাটিয়ে দিতেন। এরপরও তাঁর হৃদয়ে ইবাদাতের প্রতি এক প্রকার ক্ষুধা ও অতৃপ্তি কাজ করত।

নৈশকালীন ইবাদাত ছিল তাঁর চোখের শীতলতা, বুকের বল এবং জীবনের একমাত্র অবলম্বন। মহান আল্লাহ তাকে সম্বােধন করে বলেন— হে বস্ত্রাবৃত, আপনি রাতজেগে সালাত আদায় করুন—তবে কিছুঅংশ ব্যতীত [4]

আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটা আপনার অতিরিক্ত দায়িত্ব।শীঘ্রই আপনার পালনকর্তা আপনাকে উন্নীত করবেন প্রশংসিত স্থানে। [5]

আর দিনের বেলায় নবীজি (সাঃ) দাওয়াত, জিহাদ, আত্মশুদ্ধি, নসীহত, ফতােয়াপ্রদান ও মানুষের সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থাকতেন।

রামাদানে নবীজির কতিপয় সুন্নাহ

> নবীজি (সাঃ) সরাসরি চাঁদ না দেখে অথবা নির্ভরযােগ্য কারও সাক্ষ্য না পেলে রামাদানের সিয়াম পালন শুরু করতেন না।

> নবীজি (সাঃ) সাহরী খেতে পছন্দ করতেন। অন্যদেরও সাহরী খেতে উৎসাহিত করতেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসে তিনি বলেন— তােমরা সাহরী খাও; কারণ, তাতে বিরাট বরকত রয়েছে। [6]

সাহরীর সময় অত্যন্ত বরকতময়। কেননা, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দুআ ও ইস্তিগফারের সময়; অধিকন্তু এসময়ে মহান আল্লাহ নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন। বান্দাদের ডেকে ডেকে তাদের প্রয়ােজন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রয়ােজনপূরণের আশ্বাস দেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। [7]

মহান আল্লাহ আরও বলেন— তারা ধৈর্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। [8]

এছাড়াও সাহরী সিয়ামপালনে অত্যন্ত সহায়ক। এর দ্বারা শারীরিক ও আত্মিক শক্তি লাভ করা যায়; অধিকন্তু এতে আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত তাঁরই ইবাদাতের কাজে ব্যয়িত হয়।

> নবীজি (সাঃ) সূর্যাস্তের পর দ্রুত ইফতারে করতেন। সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার পর অন্যদেরও দ্রুত ইফতারে উৎসাহিত করতেন। তাজা বা শুকনাে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করতেন। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে। কারণ, খালি পেটে মিষ্টিদ্রব্য পাকস্থলীর জন্য অত্যন্ত উপকারী। সুতরাং, সিয়াম পালনের পর সারা দিনের ক্ষুধা নিবারণে উত্তম খাবার হচ্ছে খেজুর ও মিষ্টিদ্রব্য।

> ইফতারের পূর্বমুহূর্তে নবীজি (সাঃ) দুআয় মগ্ন হতেন। সহীহ সূত্রে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেন — তিন ব্যক্তির দুআ বৃথা যায় না—এক. ন্যায়পরায়ণ বাদশার দুআ। দুই. ইফতারের সময় সিয়াম পালনকারীর দুআ। তিন. মাযলুম তথা নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ। এই দুআ সরাসরি আসমানে পৌঁছে যায়। এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং মহান আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেন, আমার বড়ত্বের কসম, আমি অবশ্যই তােমাকে সাহায্য করব—যদিও একটু বিলম্ব হয়। [9]

হাদীসে আরও এসেছে — ইফতারের পূর্বমুহূর্তে সিয়াম পালনকারীর দুআ ব্যর্থ হয় না। [10]

উল্লেখ্য যে, ইফতারের সময় নবীজি (সাঃ) দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ ও সফলতার জন্য দুআ করতেন।

> নবীজি (সাঃ) মাগরীবের সালাত আদায়ের পূর্বেই ইফতার করতেন। তিনি বলেন — যখন পূর্বদিক হতে সূর্য উদিত হয়ে পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যায়, তখনই সিয়াম পালনকারীর ইফতারের সময়। [11]

> রামাদান মাসে সফর অবস্থায় নবীজি (সাঃ) কখনাে সিয়াম রাখতেন, আবার কখনাে বিরত থাকতেন। সফর অবস্থায় সাহাবীদেরও তিনি সিয়াম রাখা ও না রাখার ইচ্ছাধিকার দিয়েছেন। [12]

> সিয়াম পালন অবস্থায় শত্রুর মুখােমুখি হতে হলে নবীজি (সাঃ) সবাইকে সিয়াম ভেঙে ফেলার আদেশ করতেন। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে আত্মিক ও সামরিক শক্তির পাশাপাশি শারীরিক শক্তিও প্রয়ােজন। [13]

উল্লেখ্য যে, রামাদান মাসে নবীজি (সাঃ) ছােট-বড় বেশ কয়েকটি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেছেন। তবে সিয়াম ভঙ্গ করেছেন মাত্র দুটি যুদ্ধে। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে ইমাম তিরমিযী ও ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ এমনটিই বর্ণনা করেছেন। রামাদানে পরিচালিত যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য হচ্ছে বদর-যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আল্লাহ তাকে অভূতপূর্ব বিজয় দান করেন—যা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কতটুকু দূরত্বের সফরে বের হলে সিয়াম ভঙ্গ করা যাবে, তার সুস্পষ্ট বর্ণনা সরাসরি রাসূল (সাঃ) -এর পক্ষ থেকে পাওয়া যায় না। তবে প্রসিদ্ধ মতানুসারে যে-ব্যক্তি ৪৮ মাইল তথা ৭৭ কিলােমিটার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিজের বাসস্থান ত্যাগ করে, তার জন্য সিয়াম ভঙ্গ করার এবং না রাখার অনুমতি রয়েছে। তবে কষ্ট সহনীয় পর্যায়ের হলে সিয়াম পালন করাই উত্তম। [14]

> রামাদান মাসে গােসল ফরয অবস্থায় যদি সুবহে সাদিক হয়ে যেত, তবে রাসূল (সাঃ) গােসল করে সিয়াম পালন শুরু করতেন। সিয়াম অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করার বর্ণনাও পাওয়া যায়। তবে আমাদের জন্য এমনটি না করাই শ্রেয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের মতাে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি আমাদের নেই। সিয়াম অবস্থায় গড়গড়া করে কুলি করা যেমন অনুচিত এবং সিয়ামের জন্য ক্ষতিকর, তদ্রুপ স্ত্রীকে চুম্বন করাও অনুচিত এবং ক্ষতিকর। [15]

> কোনাে ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় ভুলক্রমে পানাহার করলে নবীজি (সাঃ) তার ওপর কাযার বিধান দেননি। কেউ এমনটা করলে তিনি বলতেন, তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পানাহার করানাে হয়েছে। [16]

সিয়াম ভঙ্গের কারণ হিসেবে হাদীসে সরাসরি যে-সমস্ত বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলাে হলাে-খাওয়া, পান করা এবং হিজামা [16] ও বমি করা। এছাড়া পবিত্র কুরআনে স্ত্রী সহবাসকেও সিয়াম ভঙ্গের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

> রামাদানের শেষ দশকে নবীজি (সাঃ) ইতিকাফ করতেন। [17] দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে সঁপে দিতেন। অন্তরচক্ষু দিয়ে উধ্বলােক পরিদর্শন করতেন। এজন্য রামাদানের শেষ দশকে তিনি মানুষের সাক্ষাৎ একেবারেই কমিয়ে দিতেন। রবের প্রতি একাগ্রতা ও আত্মনিবেদন বাড়িয়ে দিতেন। কায়মনােবাক্যে তাঁর দরবারে মিনতি জানাতেন। মানুষের হিদায়াতের জন্য দুআ করতেন। একমনে তাঁর নাম ও গুণাবলির ধ্যান করতেন। সৃষ্টিজগতের অনন্য নিদর্শন নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হতেন। বিধাতার অপরূপ সৃষ্টি-কুশলতায় হারিয়ে যেতেন।

এককথায়, নবীজি মহান আল্লাহর সম্যক পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হৃদয়ের গভীরে সর্বোচ্চ মাত্রায় ইলমের নূর ধারণ করেছিলেন এবং মরিচীকাময় এই দুনিয়ার তুচ্ছতা পরিপূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এজন্য তিনি আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করতেন। তাঁর ওপর সর্বাপেক্ষা বেশি ভরসা করতেন এবং তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতেন।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ১৫ – ২১


[1] সহীহ বুখারী : ৬
[2] এখানে পানাহার দ্বারা উদ্দেশ্য হলাে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মিক শক্তি যেশক্তি অর্জিত হলে ইবাদাতে ক্লান্তি অনুভূত হয় না এবং শারীরিক দুর্বলতাও দেখা দেয় না। মহান আল্লাহ কেবল তাঁর প্রিয় রাসূলকেই এই পর্যায়ের আত্মিক শক্তি দান করেছিলেন। অন্য কাউকে দান করেননি। তাই অন্যদের তিনি এধরনের সাধনায় ব্রতী হতে নিষেধ করেছেন। 
[3] সহীহ বুখারী : ১৯৬৭; সহীহ মুসলিম : ১১০৩
[4] সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত :১-২
[5] সূরা বানী-ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯
[6] সহীহ বুখারী : ১৯২৩
[7] সূরা যারিয়াত, আয়াত : ১৮
[8] সুরা ইমরান, আয়াত : ১৭
[9] জামি তিরমিযী : ২৫২৫
[10] সুনানু ইবনি মাজাহ : ১৭৫৩
[11] সহীহ বুখারী : ১৯৫৪
[12] সহীহ বুখারী : ১৯৪৩, ১৯৪৫; সহীহ মুসলিম:১১২১, ১১২২
[13] সহীহ মুসলিম : ১১২০
[14] সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৪; হিদায়া : ১/২২১; জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া : ১/২০ [13) ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব:১৬/২৩৭
[15] সহীহ বুখারী : ১৯৩৩; সহীহ মুসলিম : ১১১৫
[16] হানাফী মাযহাব অনুসারে হিজামা করলে সিয়ামের কোনাে ক্ষতি হয় না। তবে হিজামার কারণে যদি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশংকা থাকে এবং সেকারণে সিয়াম ভেঙে ফেলার মতাে দুর্বলতা দেখা দেওয়ার আশংকা থাকে তবে সিয়াম অবস্থায় হিজামা করার অনুমতি নেই।
[17] সহীহ বুখারী: ২০২৬; সহীহ মুসলিম : ১৯৭১

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য লিখুন