Home বিষয় সিয়াম (রোজা) ও রামাদান কুরআনে কারীম ও রামাদানের সম্পর্ক

কুরআনে কারীম ও রামাদানের সম্পর্ক

0
352

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

রামাদান হচ্ছে বরকতময় মাস। পবিত্র কুরআনের সাথে এই মাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :- রামাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং সত্যের সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্যকারীরূপে। [1]

এই মাসেই পবিত্র কুরআন লওহে মাহফুয থেকে সপ্তম আসমানে অবতীর্ণ হয়। এজন্যও রামাদান অত্যন্ত দামি। শুধু রামাদান কেন? কুরআনের সাথে যার সম্পর্ক যত বেশি হবে, সে তত বেশি দামি হবে। এজন্যই রামাদানের প্রতি রাতে নবীজি (সাঃ) ও জিবরীল আলাইহিস সালাম পরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শােনাতেন। কুরআনের প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও বাণী নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করতেন এবং প্রয়ােজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এক কথায়, কুরআনের মধুময় বাণীর শ্যামল ভূমিতে তারা হারিয়ে যেতেন।

সিয়াম ও তিলাওয়াত উভয়টি একসঙ্গে চালিয়ে গেলে সিয়াম পালনকারী ব্যক্তির হৃদয়ে রামাদানের পাশাপাশি কুরআনের প্রতিও ভালােবাসা তৈরি হয়। বরকতময় এই গ্রন্থের সান্নিধ্যে কাটে তার রামাদান। মহান আল্লাহ বলেন

এটি একটি বরকতময় কিতাব—যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এক বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। [2]

তিনি আরও বলেন :- তারা কি কুরআনের মর্ম-বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? [3]

পবিত্র কুরআনে আরও বলা হয়েছে – তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? পক্ষান্তরে যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারও পক্ষ থেকে হতাে, তবে অকশ্যই তারা এতে অনেকবৈপরিত্য দেখতে পেত। [4]

সিয়াম অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করলে হৃদয়ের গভীরে অপার্থিব স্বাদ অনুভূত হয়। ইবাদাতে অনিঃশেষ প্রেরণা জাগে। চিন্তা ও মনােজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। হৃদয় মহান রবের প্রতি ভালবাসায় সিক্ত হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে সুরভি ছড়িয়ে পড়ে এবং তিলাওয়াতের মৃদুমন্দ গুঞ্জনে দেহ-মনে শিহরন জাগে।

এছাড়াও রামাদানে কুরআন তিলাওয়াত করলে কুরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট, সংকলনের ইতিহাস, তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যা এবং কুরআনের প্রতি সালাফদের গুরুত্বদানের ব্যাপারগুলাে চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে। অধিকন্তু কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে –

এক. আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন :- তােমরা কুরআন পাঠ করাে। কেননা, এই কুরআন কিয়ামতের ময়দানে তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশকারী হবে। [5]

দুই. উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন :- তােমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে কুরআনে কারীম নিজে শেখে এবং অন্যকে শেখায়। [6]

তিন. আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন :-  তােমরা দু’টি পুষ্প পাঠ করাে, যথা সূরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান। কারণ, এ দু’টি সূরা কিয়ামতের দিন মেঘমালার মতাে অথবা দুই দল পাখির ঝাঁকের মতাে সারিবদ্ধভাবে উড়বে। এরা উভয়ে পাঠকের পক্ষ হয়ে আল্লাহর সম্মুখে কথা বলবে। [7]

চার. আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন :- আল কুরআনে দক্ষ ও পণ্ডিত ব্যক্তি সম্মানিত ও পুণ্যবান ফিরিশতাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি আটকে আটকে তিলাওয়াত করে এবং তার জন্য এটা কষ্টকর হয়, তবে তার জন্য দুটি প্রতিদান রয়েছে। প্রথমটি তিলাওয়াতের প্রতিদান, দ্বিতীয়টি কষ্টের প্রতিদান। [8]

রামাদান এলে সালাফগণ সব সময় কুরআন সাথে রাখতেন। ঘরে, বাইরে, সফরে ও যাত্রাবিরতিতে—সর্বাবস্থায় একমনে তিলাওয়াত করতেন।

ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে জানা যায় যে, রামাদান এলে তিনি দারস, ফতােয়া, মজলিস—সব কিছু বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কুরআন নিয়ে বসে পড়তেন। তিনি বলতেন, “এই মাস হচ্ছে কুরআনের মাস।

রামাদানে সালাফদের ঘর থেকে সব সময় তিলাওয়াতের গুনগুন শব্দ ভেসে আসত। রআনের সুমধুর কলরবে মুখরিত হতাে চারিদিক। প্রতিটি ঘর যেন কুরআনের মালােয় ছেয়ে যেত। সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠত প্রতিটি আঙিনা।

তারা খুব ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করতেন। কোথাও বিস্ময়কর আলােচনা এলে সেখানে থামতেন। উপদেশমূলক ও শাস্তির আয়াতে কাঁদতেন এবং সসংবাদের আয়াত তিলাওয়াতকালে আনন্দিত হতেন। কুরআনের আদেশ-নিষেধ ও যাবতীয় বিধান-মাফিক নিজেদের জীবন গড়ে তুলতেন।

ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার নবীজি : তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শােনাতে বললে তিনি সূরা নিসা’র প্রথমাংশ তিলাওয়াত করেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছেন – অতএব, কেমন হবে তখন, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে উপস্থিত করব তাদের ওপর সাক্ষীরূপে? [9]

তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বলেন, ব্যস, যথেষ্ট।

ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এসময় আমি নবীজির দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চক্ষুদ্বয় থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছে! প্রিয়তমের বাণী শ্রবণে কান্না আটকে রাখা যে বড় দায়!

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সাহাবীগণ একত্র হলে তিনি আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলতেন, আমাদের রবের কথা স্মরণ করিয়ে দাও। আবু মূসা তখন তার সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত আরম্ভ করতেন, আর সাহাবীগণ সকলে অঝােরে কাঁদতে শুরু করতেন।

কিন্তু পরবর্তীজনেরা যখন তিলাওয়াত শ্রবণের মানসিকতা হারিয়ে ফেলে, তখনই তাদের নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়। চারিত্রিক অবনতি ঘটে এবং মেধা ও বােধশক্তি লােপ পায়।

কুরআনের স্থলে মানুষ অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার ফলে যাবতীয় ফিতনা-ফাসাদের সৃষ্টি হয়। নানা রকম বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত দেখা দেয়। মানহাজগত বিচ্যুতি ঘটে; অনেক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ও গােলযােগপূর্ণ হয়ে পড়ে। মুসলিমদের শক্তি-সাহস ও সংকল্প পর্যবসিত হয় হতাশা ও ব্যর্থতায়। অতএব, আমাদের কুরআনের কাছে ফিরতেই হবে। কুরআন পড়তেই হবে। কারণ—

  • কুরআনের মিশন হচ্ছে মানুষকে হিদায়াত ও সিরাতুল মুসতাকীমের পথ প্রদর্শন করা।
  • কুরআন হচ্ছে আলােকবর্তিকা। যাবতীয় রােগের শিফা। [10] জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ও দর্শনের কেন্দ্রস্থল।
  • কুরআন আমাদের প্রাণশক্তি। জীবনের অবলম্বন এবং সুখ ও সৌভাগ্যের সােপান।
  • কুরআন হচ্ছে ঐশীবাণী, স্রষ্টার সংবিধান এবং কুরআনই হচ্ছে শাশ্বত ও চিরন্তন বিজ্ঞান-দর্শন।

সুতরাং, আমরা কি কুরআন দিয়ে নিজেদের জীবন গড়তে পারি না? পারি না রামাদান ও বাকি এগারাে মাস কুরআন নিয়ে কাটাতে? যদি পারি, তবে এই মহাগ্রন্থের বরকতে আমাদের জীবনযাত্রা আরও মসৃণ হবে। জীবনমান আরও উন্নত হবে। সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি হতাশার ঘাের কেটে নেমে আসবে শুভ্র প্রভাত। আমরা কি পারব এমনটা করতে?

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ২৭ – ৩২


[1] সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫
[2] সূরা সাদ, আয়াত : ২৯
[3] সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২৪
[4] সূরা নিসা, আয়াত : ৮২
[5] সহীহ মুসলিম:১৩৯০
[6] সহীহ বুখারী : ৪৭৩৯
[7] সহীহ মুসলিম:১৩৯০
[8] সহীহ বুখারী : ৪৬৫৩; সহীহ মুসলিম :৭৯৮
[9] সূরা নিসা, আয়াত : ৪১
[10] সুস্থতা লাভের উপাদান

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

NO COMMENTS

আপনার মন্তব্য লিখুন