রামাদান : বদান্যতার উর্বর ক্ষেত্র

1
329

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন— “তােমরা নিজেদের জন্য যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে।[1]

তিনি আরও বলেন— “যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা এমন একটি শস্য-দানার মতাে, যা উৎপন্ন করেছে সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে আরও বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ। [2]

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— ‘নবীজি (সাঃ) ছিলেন সর্বাপেক্ষা দানশীল। আর রামাদানে যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি আরও বেশি দানশীল হতেন। এক কথায়, তিনি ছিলেন রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল।’ [3]

সিয়াম মানুষকে ইয়াতীম-অসহায়, নিঃস-হতদরিদ্র ও অন্নহীনদের অন্ন-বস্ত্রসহ সার্বিক সহায়তা প্রদানে উৎসাহ প্রদান করে। কাজেই রামাদান হচ্ছে দাতা, সচ্ছল ও ধনিক-শ্রেণির দান-সাদাকা করার মৌসুম। দানের মাধ্যমে নেকীর পাহাড় গড়ার মহা সুযােগ। দানের প্রভূত কল্যাণ ও নেকীর কথা বর্ণনা করে আল্লাহর নবী : আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহুর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসে বলেন—

প্রতিদিন সকাল বেলা দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। অতঃপর তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ, আপনি দানকারীকে অনুরূপ প্রতিদান দিন। অপরজন বলেন, হে আল্লাহ, আপনি কৃপণের মাল ধ্বংস করুন।[4]

বান্দা যখনই দান করে, আল্লাহ তাকে শারীরিক উন্নতি ও মানসিক তৃপ্তি দান করেন। তার রিযিকে বরকত দেন। মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন— ‘সাদাকা যাবতীয় গুনাহ মিটিয়ে দেয়, ঠিক যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়া।[5]

বস্তুত গুনাহের এক প্রকার উত্তাপ রয়েছে, যা অন্তরে উন্নতা সৃষ্টি করে। জীবনকে বিষিয়ে তােলে। আর এই বিষবাষ্প দূর করে একমাত্র সাদাকা।

সাদাকা হলাে শীতল হাওয়া—যা মানুষের প্রাণ জুড়ায়। অন্তর থেকে মুছে ফেলে গুনাহের সকল কালিমা। উকবা ইবনু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন— ‘কিয়ামতের ময়দানে মানুষের হিসেব-নিকেশ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকে তার সাদাকার ছায়ায় অবস্থান করবে।[6]

কত বিরাট ব্যাপার! সাদাকা কিয়ামতের সেই কঠিন মুহূর্তে মানুষের জন্য ছায়া হবে। সেদিন প্রত্যেকে তার নির্ধারিত সাদাকা পরিমাণ ছায়া লাভ করবে।

সাহাবীদের মধ্যে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত ধনী। তিনি তার সমস্ত সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন। তাবুকের যুদ্ধে যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন। মুসলিমদের জন্য ‘বৃমা’ নামক কূপ ক্রয় করেছেন এবং ব্যক্তিগত সমস্ত সহায়-সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে তিনি সত্বরই সন্তুষ্টি লাভ করবেন।

আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন প্রচুর সম্পত্তির মালিক। একবার তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশায় সাতশাে উট বােঝাই করা মাল মদীনাবাসীর মাঝে বিলিয়ে দেন; কিন্তু তারা কেন এভাবে দান করেছেন? কিংবা আমরাই বা কেন দান করবাে? কারণ—

  • এমন অনেক সিয়াম পালনকারী আছেন—যাদের কাছে ইফতারের জন্য এক টুকরাে রুটি, এক ঢােক পানি কিংবা একমুঠো খেজুরও নেই!
  • এমন অনেক সিয়াম পালনকারী আছেন যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, যাতায়াতের ভাড়া নেই; এমনকি বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানাের অথবা সান্ত্বনা দেওয়ারও কেউ নেই।
  • এমনও অনেক সিয়াম পালনকারী আছেন যাদের কাছে সাহরী করার মতাে নূ্যনতম খাবার নেই। এমনকি স্বল্প আয়ের সংসারে ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখের দিকে তাকালে ইফতারেরও কোনাে উপায় নেই!

এসব কারণেই নবী (সাঃ) রামাদানে দানের ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। বর্ণিত হয়েছে— ‘যে ব্যক্তি কোনাে সিয়াম পালনকারীকে ইফতার করাবে, সে তার অনুরূপ সাওয়াব লাভ করবে; কিন্তু এতে সিয়াম পালনকারী ব্যক্তির সাওয়াব বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না।[7]

সমাজের সৎ ও মহান ব্যক্তিবর্গ রামাদান মাসে অত্যন্ত উদারমনা হন। গরীব-দুঃখীদের অকাতরে দান করেন। অনেক দ্বীনদার ভাই সাওয়াবের আশায় সমাজের দরিদ্রশ্রেণির লােকদের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইফতারের আয়ােজন করেন। এটা অনেক ভালাে গুণ। বিরাট সাওয়াবের কাজ। সালাফগণও এমন করতেন। তারা রামাদানে প্রতিটি মসজিদে গরীব ও মুসাফিরদের জন্য ইফতার ও খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ফলে কোনাে এলাকায় ক্ষুধার্ত ও খাবারবঞ্চিত কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না।

দেখুন, খাবার-দাবার এবং পােশাক-আশাকের পেছনে যে-অর্থ ব্যয় করা হয়, তা কখনাে ফিরে আসে না; বরং এতে সম্পদ ক্রমশ হ্রাস পায়; তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে-সম্পদ খরচ করা হয়, তার সবটুকু রয়ে যায়; বরং বহুগণ বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহর ঘােষণা—

যদি তােমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করাে তবে তিনি তােমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন।উপরন্তু তােমাদের ক্ষমা করবেন।আল্লাহগুণগ্রাহী, সহনশীল।[8]

হে সিয়াম পালনকারী ভাই, আপনার দান-সাদাকা-ই আপনার একমাত্র সঞ্চয়। কিয়ামতের দিন যখন চরম সংকট ও দুঃসময়ে নিপতিত হবেন তখন সাদাকা-ই আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে। সূর্য যখন খুব নিচে এসে আপনাকে দগ্ধ করবে তখন এই সাদাকা-ই সুশীতল ছায়া হয়ে আপনাকে সঙ্গ দেবে।

সুতরাং ভাই আমার, একটু ভেবে দেখুন, গরীবকে দেওয়া আপনাgmaiর একঢােক পানি, একটুখানি দুধ, একমুঠো খেজুর, সামান্য অর্থ, খাবার কিংবা সাধারণ একটি বস্ত্র হতে পারে আপনার জান্নাতের ওসিলা। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখুন, সাদাকা সম্পদ হ্রাস করে না; বরং সংরক্ষণ করে। যাকাত সম্পদ নিঃশেষ করে না; বরং পরিশুদ্ধ করে। এতএব, যাকাত এবং সাদাকা ব্যতীত আপনি কিছুতেই সম্পদ সংরক্ষণ অথবা পরিশুদ্ধ করতে পারবেন না। কত কত সম্পদশালী এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে—যাদের অর্থবিত্ত, ধন-সম্পদ ও বিশাল বিশাল অট্টালিকা আজ নিস্তব্ধ পড়ে আছে। পার্থিবজীবনে এগুলাে তাদের দুশ্চিন্তা ও বিড়ম্বনার কারণ হয়েছে। উপযুক্ত স্থানে ব্যয় না করার কারণে হাশরের দিনও এগুলাে তাদের লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হবে!

কাল বিচারদিবসে আপনার সামনে সব লাভ-লােকসান স্পষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং প্রস্তুত হােন! একমাত্র আল্লাহ-ই হবেন আপনার আশ্রয়স্থল!

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ৩৯ – ৪৩


[1] সূরা বাকারা, আয়াত :১১০
[2] সূরা বাকারা, আয়াত : ২৬১
[3] সহীহ বুখারী : ৬
[4] সহীহ বুখারি : ১৪৪২
[5] জামি তিরমিযী : ২৬১৬
[6] মুসনাদে আহমাদ :১৭৩৩৩
[7] জামি তিরমিযী : ৮০৭
[8] সূরা তাগাবুন, আয়াত : ১৭

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য লিখুন