রামাদানের খাদ্যাভ্যাস – পর্ব ২

1
163

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

ইবাদাতকে অগ্রাধিকার দিন, রান্নাকে নয় 

বহু লােক রামাদানকে সর্বোত্তম খাবার তৈরীর মাস হিসেবেই দেখে। তারা ভাবে যেহেতু সারাদিন না খেয়ে থাকা হচ্ছে, তাই সন্ধ্যায় ব্যতিক্রমী কোন খাবার খেয়ে পুরস্কৃত হওয়া উচিত। অথচ, রামাদান তাে একটি বার্ষিক সুযােগ- আমাদের গুনাহসমূহকে মুছে ফেলার জন্য, আমাদের জীবনধারাকে পরিবর্তন করার জন্য এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আরাে কাছে আসার জন্য; যাতে করে রামাদান চলে যাবার পরেও আমরা সঠিক পথে থাকতে পারি, এবং রামাদানে যেসব ভালাে কাজ ও অভ্যাস গড়ে তুলেছিলাম তা চালিয়ে যেতে পারি।

রামাদান বা অন্য যেকোন মাসই হােক না কেন, খাবারের ব্যাপারে আমাদের মনোেযােগ অভিন্ন থাকা উচিত। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য সিয়াম পালন করি। তাই অতিরিক্ত সময় রান্নাঘরে ব্যয় করে নিজের নফসকে পুরস্কৃত করার কোন মানে হয় না, যখন আমাদের প্রকৃত পুরস্কার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইতােমধ্যেই লিখে ফেলেছেন।

এজন্য আমাদের প্রাথমিকভাবে আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রয়ােজন। আমাদের খাবারদাবার বছরের আর সব দিনের মত যেন রামাদানেও একই রকম সাধারণ থাকে।

রামাদানে হাইড্রেডেট খাবার খাওয়ার গুরুত্ব 

রামাদানে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা রােধে এমন খাদ্য খাওয়া উচিত যা পানি ধরে রাখতে পারে। আপনি যদি খুব বেশি পানি পান করতে নিরুৎসাহিত বােধ করেন তবে আপনার জন্য হরেক রকমের মজাদার খাদ্য খেয়ে ডিহাইড্রেশন রােধ করার সুযােগ রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দই পছন্দ করি। এটি দীর্ঘ সময় তৃষ্ণ দূরীভূত করে। এক কাপ দইতে শতকরা পঁচাশি ভাগ পানি থাকে। এছাড়া থাকে পাকস্থলীর জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও অনেক ক্যালসিয়াম। এছাড়া ফলের জুস, লেটুস, শসা, টমেটো, নারিকেলের পানি ও তরমুজও খুব ভালাে খাবার যা শরীরের পানি ধরে রাখতে সহায়তা করে।

সঠিক খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা

যদিও আমি ইফতারে খাবার খাওয়া নিয়ে অনেক মনােযােগ দিচ্ছি না, কিন্ত আমি জানি সঠিক খাবার খাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজ কিংবা স্কুলের জন্য রামাদানে আমাদের বেশিরভাগেরই ভিন্ন ভিন্ন কর্মপরিকল্পনা থাকে। আমাদের মধ্যে যারা সারারাত জাগতে পারেন না, তাদের যথাযথ ঘুমের সাথে যথেষ্ট খাবারও খাওয়া প্রয়ােজন, যাতে করে আমরা সিয়াম পালন করতে পারি এবং পরবর্তী দিনটি টিকে থাকতে পারি।

খাবারের রুটিন এবং অভ্যাসের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা এই ব্যাপারটা ভুলেই যাই যে আমাদের ওজন বাড়তে পারে। আমাদের না আছে পরিশ্রম করার সময় আর না আমরা অর্গানিক খাদ্যের (যথাসম্ভব প্রাকৃতিক খাবার, কোনরকম রাসায়নিক বা অন্যান্য পরিবর্তন যাতে থাকে না) দিকে মনােযােগ দিই। সবচেয়ে বিস্ময়কয় ব্যাপার হচ্ছে, অনেকে ভাবেন যে ইফতার ও সাহরিতে তৈলাক্ত খাবার দিয়ে নিজের চাহিদা মেটাতে পারলেই পুরাে দিনের শক্তি পাওয়া যাবে। তৈলাক্ত খাবার আমাদের বেশি শক্তি যােগায়’- এই পুরাে ধারণাটাই ভ্রান্ত। সত্যি বলতে, এই ভারী তৈলাক্ত খাবার আপনাকে দ্রুত ক্লান্ত করে দেয়, যখন আপনি দীর্ঘ সালাতের জন্য দাঁড়ান। অর্গানিক খাদ্যের তুলনায় তৈলাক্ত, চর্বিজাতীয় খাবারের ভাঙনের হার অনেক বেশি। সুতরাং, সঠিক প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার প্রতি জোর দিন।

সঠিক খাবার কোনগুলো?

রামাদানে পরিমিত ও নিয়মমাফিক খাদ্য গ্রহণের ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা যে রামাদানে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের দরুন আমাদের অনেকের স্বাস্থ্যের উল্টো অবনতি ঘটে। প্রতিবছর রামাদান মাসে অতিভােজনের কারণে সৃষ্ট পাকস্থলীর সমস্যাজনিত রােগী ও ডিহাইড্রেশনের ফলে সৃষ্ট কিডনীর সমস্যাজনিত রােগীর সংখ্যা বেড়ে যায়।

রামাদানে আপনার খাদ্যতালিকা সরল ও নিয়ন্ত্রিত রাখুন। আঁশযুক্ত খাদ্য, খনিজ খাদ্য, কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য ও চর্বিহীন প্রােটিন জাতীয় খাদ্য বেশি বেশি খাওয়ার চেষ্টা করুন। সঠিক খাবারগুলাে সবসময়ই মাটি থেকে উৎপন্ন সবুজ খাবার, যা হলাে প্রাকৃতিক প্রতিষেধক এবং অধিকাংশ অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা। রামাদানের সময় চর্বিযুক্ত, ভাজাপোেড়া এবং ‘জাংক ফুডের’ (নিম্ন পুষ্টিমান সংবলিত পূর্বপ্রস্তুতকৃত অথবা প্যাকেটজাত খাবার পরিবর্তে আপনাদের ফ্রিজ ও ভাঁড়ারঘরওলাে ফল-ফলাদি দিয়ে পূর্ণ রাখা উচিত। যেসব খাদ্য অনেক লম্বা সময় ধরে প্রস্তুত বা রান্না করতে হয়, যেসব খাবারে অনেক চর্বি থাকে বা যেসব খাবার অনেক বেশি ভেজে খেতে হয়, সেসব খাবার এড়িয়ে চলাই ভাল। কারণ এসব খাবারের কারণে বুকজ্বলা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পানিশূন্যতা ও নিদ্রাহীনতার সমস্যা হয়ে থাকে।

সাহরিতে কী খাবেন?

হাদিসে এসেছে, “নিশ্চয় আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাগণ যারা সাহরির খাবার খায় তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন।” [আল জামিউস গির, হাদিস-ক্রম: ৪৭৮৫]

সাহরির ব্যাপারে মুসলিম সমাজের মধ্যে দুইটি প্রান্তিক অবস্থা বিরাজ করছে। একদল তাে মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে ভারী ভারী সব খাদ্য ও অনেক পদের তরকারি সাজাতে শুরু করে এবং সাহরিতে রীতিমত গলা পর্যন্ত খাবার খায়। আরেকদল আছে যারা আলসেমি করে সাহরিতে তেমন কিছুই খায় না। উভয় অবস্থাই প্রান্তিক। কারণ, এ উভয় অভ্যাসের কারণেই শরীরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যারা অতিভােজন করেন তাদের হজমে সমস্যা হয়। আর যারা একেবারেই কিছু খান না তারা দিনভর মাথাব্যথা, বিরক্তিবােধ, দুর্বলতা, অনিদ্রা ও মনােযােগহীনতায় ভুগেন।

আমাদেরকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। রামাদানে সাহরি খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদাত। সাহরির খাবার হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ও মাঝারি পরিমাণের।

সাহরিতে আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া পাকস্থলীর জন্য উপকারী। আঁশজাতীয় খাবার আস্তে ধীরে হজম হয়, যার জন্য কোলেস্টেরল লেভেল এবং রক্তের সুগার লেভেল অনেকাংশে কমে আসে। এতে করে রােজা রেখেও আপনি দিনভর শক্তি পাবেন। আঁশজাতীয় খাবারের মধ্যে আপনি ওটস, শাকসবজি, ফল বা সিরিয়াল খেতে পারেন।

সাহরিতে কিছু প্রােটিনযুক্ত খাবার খাওয়াও উপকারী। ডিম, চবিহীন মাংস, দই, বাদাম জাতীয় খাদ্য আপনাকে দিনভর শক্তি যােগাবে।

এছাড়াও ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন জাতীয় খাবার যেমন দুধ, দই, মধু ইত্যাদি খাবেন৷ দই দিয়ে আপনি বিভিন্ন রকম পানীয় যেমন লাচ্ছি বানাতে পারেন

অথবা দুধ-কলা বা স্ট্রবেরি দিয়ে মিল্কশেকও বানাতে পারেন। খেতে যেমন মজাদার হবে, আপনার শরীরও হাইড্রেট থাকবে সারাদিন। সাহরিতে খেজুর খাওয়া সুন্নত। নবীজি (ﷺ) খেজুর ও শসা একসাথে খেতেন৷ আবদুল্লাহ ইবনু জাফর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, “নবীজি ৪৪ শসা খেজুরের সাথে একত্রে খেতেন।” [বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫৪৪৫; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২০৪৩]

সাহরিতে ময়দাযুক্ত খাবার যেমন কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি খাবার এড়িয়ে চলুন। লবণযুক্ত খাবার যেমন আচার, সল্টেড বাদাম, সয়া সস ইতাদিও যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি হলে আপনি দিনভর তৃষ্ণার্ত অনুভব করবেন। সাহরিতে চা, কফি এসব ক্যাফেইনযুক্ত খাবার মােটেই খাবেন না। কারণ, এসব খাবার সাহরিতে খেলে সারাদিন অস্থির লাগে ও পানিশূন্যতার অনুভূতি কাজ করে।

ইফতার কী খাবেন? 

হাদিসে এসেছে, “তােমাদের মধ্যে কেউ যখন রােজা রাখবে সে যেন (ইফতারে) খেজুর দ্বারা রােজা ভাঙ্গে। তা যদি না পায় তাহলে পানি দ্বারা (ইফতার শুরু করবে)। কারণ, পানি বিশুদ্ধতা দানকারী।” [ আবু দাউদ, হদিস-ক্রম : ২৩৫৫]

আমাদের প্রিয়নবী -এর সুন্নত ছিল অল্প খাবার দিয়ে ইফতার করা। আজকাল ডাক্তাররাও হালকা খাবারের দ্বারা ইফতার করার পরামর্শ দিন। ইফতার করার পর অন্তত দশ মিনিট বিরতি দিয়ে ভারী খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। দীর্ঘসময় পর একসাথে বেশি খাদ্য গ্রহণ করলে পাকস্থলীর উপর চাপ পড়তে পারে, এসিডিটি বাড়তে পারে, বমি বমি অনুভূত হতে পারে। এভাবে গােগ্রাসে গিলে ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ পড়াও কষ্টকর হয়ে যায়। ইফতারে খেজুর, কিছু হালকা নাশতা স্বাস্থ্যকর কোন পানীয় গ্রহণ করা উত্তম হবে। এগুলাে আপনার শরীরে সুগার, খনিজ এবং পানির মাত্রা পুনরুদ্ধার করবে।

হালকা ইফতার সেরে মাগরিবের নামাজ পড়ে নিবেন। ততক্ষণে আপনার শরীর ইফতারের খাবারগুলাে হজম করে নিবে। মাগরিবের নামাজের পর আপনি চাইলে ভারী খাবার গ্রহণ করতে পারেন। আমি অবশ্য তারাবিহর পর রাতের খাবার খাওয়া পছন্দ করি। তারাবিহর আগে রাতের খাবার খেলে তারাবিহর

নামাজে আমার ঘুম ঘুম ও অবসন্ন অনুভূত হয়। রাতের খাবার কী খাবেন? রাতের খাবার হওয়া উচিত মাঝারী মানের নিয়ন্ত্রিত খাবার। ভাল হয় যদি এক পদের তরকারি দিয়েই রাতের খাবার সেরে নিন। এটি পাকস্থলীর জন্যেও উপকারী। তাছাড়া রাতের খাবারে অতিমাত্রায় না খাওয়ার কারণে সাহরির সময়ও খাওয়ার জন্য ক্ষুধা থাকবে। কুরআনে বর্ণিত স্বাস্থ্যসম্মত খাবারগুলাে এসময় খেতে পারেন। যেমন ডালিম, ডুমুর, শসা, জলপাই, খেজুর, আঙ্গুর, ইত্যাদি। এছাড়া মধু, দুধ, মাংস ইতাদিও খেতে পারেন। রামাদানের খাবারের ব্যাপারে আরাে কিছু পরামর্শঃ

  • যারা পরােটা খেতে পছন্দ করেন, তারা তেল ছাড়া রুটি খাবেন
  • বেশি না ভেজে হালকা ভাজা খাবার খাবেন
  • গ্রীষ্মকালে মাছ-মাংস কমিয়ে খাবেন কারণ এগুলাে খেলে ঘন ঘন তৃষ্ণা জাগে
  • মিষ্টান্ন হিসেবে দুধ ও দই খাবেন
  • তরকারিতে লবণ ও তেলের পরিমাণ কমিয়ে মশলা, আদা, রসুন কিংবা লেবু দিয়ে স্বাদ বৃদ্ধি করবেন

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ১৩৭ – ১৪১

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন