রামাদান : সুন্নাহ বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযােগ

0
54

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

উম্মাহর সর্বোচ্চ ইমাম এবং আমাদের একমাত্র আদর্শ হলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) । তার অনুসরণ-অনুকরণের মধ্যেই পরিপূর্ণ কল্যাণ ও সফলতা নিহিত। এ ছাড়া অন্য কোনাে পথে বা মতে সফলতা নেই। আল্লাহ তাআলা ঘােষণা করেন—

যারা বার্তাবাহক উম্মী নবীর অনুসরণ করে—যার কথা তারা তাদের কাছে সংরক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়—তিনি তাদের সৎ কাজের আদেশ করেন ও মন্দ কাজে নিষেধ করেন এবং তাদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করেন ও নিকৃষ্ট বস্তু হারাম করেন। [1]

আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর আগমনের পর তার সুন্নাহ অনুসরণ ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তার সুন্নাহগুলাে হলাে নূহ আলাইহিস সালাম-এর কিশতির ন্যায়। যে এই কিশতিতে আরােহণ করবে সে মুক্তি পাবে। আর যে তা থেকে দূরে থাকবে সে ধ্বংসে নিপতিত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

বস্তুত আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তােমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।[2]

রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

তােমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে নব-আবিস্কৃত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক নব-আবিস্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই গােমরাহী)।[3]

অপর এক হাদীসে তিনি বলেছেন—

যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হবে সে (আমার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।[4]

তিনি আরও বলেন—

কেউ আমার সুন্নাহ বহির্ভূত কোনাে আমল করলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।[5]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

আল্লাহ ও তার রাসূল যখন কোনাে বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা দেন, তখন কোনাে | মুমিন নর-নারীর নিজেদের বিষয়ে কোনাে ইচ্ছাধিকার বাকি থাকে না। [6]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে রাসূলের সামনে অগ্রসর হতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—

হে মুমিনগণ, (কোনাে বিষয়ে) তােমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আগে বেড়ে যেয়াে। । আল্লাহকে ভয় করে চলাে। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শােনেন, সব কিছু জানেন।[7]

রামাদান মাস হলাে বরকতময় মাস। ঘরে-বাইরে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে রাসূলের পবিত্র সুন্নাহগুলাে বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযােগ। ইতঃপূর্বে রামাদানের বিশেষ সুন্নাহগুলাে ‘নবীজির সিয়াম পালন’ শিরােনামে অতিবাহিত হয়েছে।

এছাড়া সর্বাবস্থায় যে-সুন্নাহগুলাে বিশেষভাবে পালনীয় সেগুলােও রামাদানে পরিপূর্ণভাবে আদায় করা সিয়াম পালনকারী প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন—

দশটি জিনিস ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত—মােচ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মেসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, আঙুলের গিরা বােয়া, বগলের লােম পরিষ্কার করা, গুপ্তাঙ্গের পশম পরিস্কার করা, পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করা। রাবী বলেন, আমি দশমটি ভুলে গিয়েছি। তবে কুলি করা হতে পারে।[8]

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলাে, টাখনুর নিচে লুঙ্গি বা অন্য কোনাে পােশাক পরিধান না করা; অধিকন্তু হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ও কঠিন হুঁশিয়ারি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন—

আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন না যে দম্ভভরে কাপড় মাটিতে হিচড়ে হাঁটে।[9]

অপর এক হাদীসে তিনি বলেন—

টাখনুর নিচের যে-অংশে কাপড় থাকবে সে-অংশ জাহান্নামে যাবে।[10]

এ ধরনের আরও কিছু বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নিষেধাজ্ঞা আরােপ করেছেন। যেমন—

  • তিনি দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। [11]
  • কোনাে ব্যক্তিকে উঠিয়ে তার আসনে বসতে নিষেধ করেছেন। [12]
  • ডান হাত দিয়ে পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করতে, একপায়ে জুতা পরে হাঁটতে এবং এমন কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন, যে-কাপড় পরলে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে পড়ে কিংবা তার আকৃতি ও অবয়ব ফুটে ওঠে। [13]
  • পান করার সময় পানপাত্রে ফু দিয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। [14]
  • সূর্ণ কিংবা রূপার পাত্রে পানাহার করতে নিষেধ করেছেন। [15]
  • (পুরুষদের) সর্ণের আংটি পরতে নিষেধ করেছেন। [16]
  • পুরুষদের স্বর্ণ এবং রেশমী কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। [17]
  • ফজরের পর সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সালাতপড়তে নিষেধ করেছেন। [18]
  • কবরের দিকে ফিরে সালাত পড়তে নিষেধ করেছেন। [19]
  • ইশার সালাতের পূর্বে ঘুমাতে নিষেধ করেছেন এবং ইশার সালাতের পর কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন। [20]
  • বিলাপ করতে নিষেধ করেছেন। [21]
  • সাদা চুল উপড়াতে নিষেধ করেছেন। [22]
  • শুধু জুমাবার সিয়াম রাখতে নিষেধ করেছেন। [23]
  • উদ্বৃত্ত পানি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। [24]
  • শরীরে উল্কি আঁকতে নিষেধ করেছেন। [25]
  • লাগাতার সিয়াম রাখতে নিষেধ করেছেন। [26]

এ ছাড়াও আরও বিভিন্ননিষেধাজ্ঞার কথা পবিত্র সুন্নাহয় বিবৃত আছে।

এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ হলাে মেসওয়াক করা। রাসূল (সাঃ) বলেন—

যদি আমি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেকবার ওযুর সময় মেসওয়াক করার আদেশ করতাম। আরেক বর্ণনায় আছে—প্রত্যেক সালাতের সময় মিসওয়াক করার আদেশ করতাম।[27]

অন্য আরেকটি সহীহ হাদীসে আছে—

মেসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবের সন্তুষ্টি বয়ে আনে।[28]

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলাে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ। তাহিয়্যাতুল মাসজিদ হলাে মসজিদে প্রবেশের পর বসার পূর্বেই দু’রাকাত নফল সালাত আদায় করা। বুখারী ও মুসলিমের হাদীস দ্বারা তাহিয়্যাতুল মাসজিদ প্রমাণিত। মসজিদে প্রবেশের অন্যান্য সুন্নাহ হলাে—

  • ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা
  • বাম পা দিয়ে বের হওয়া
  • ডান পায়ের জুতা আগে পরা
  • বাম পায়ের জুতা আগে খােলা

কারও ঘরে বা কামরায় প্রবেশ করার সময় সর্বোচ্চ তিন বার অনুমতি চাওয়া। তিন বারের মধ্যে যদি অনুমতি দেয় তাহলে প্রবেশ করা। অন্যথায় ফিরে যাওয়া। এটাও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

এ প্রবন্ধে আমি শুধু বহুল প্রচলিত কিছু কর্মগত সুন্নাহর দিকে ইঙ্গিত করেছি। এছাড়াও আরও বহু সুন্নাহ রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সুন্নাহর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করার এবং সুন্নাহর অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ১৩০ – ১৩৬


[1] সূরা আরাফ, আয়াত : ১৫৭
[2] সূরা আহযাব, আয়াত : ২১
[3] সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২
[4] সিলসিলাহ সহীহাহ : ৩৯৪
[5] সহীহুল জামিউস সগীর : ৫৯৭০
[6] সূরা আহযাব, আয়াত : ৩৬
[7] সূরা হুজুরাত, আয়াত : ০১
[8] জামি তিরমিযী : ২৭৫৭
[9] সহীহুল জামিউস সগীর : ২৮০৩
[10] সহীহ বুখারী : ৫৪৭৪
[11] সহীহ মুসলিম :২০২৫
[12] সহীহ বুখারী :৫৯১৫
[13] সহীহ মুসলিম : ২০৯৯
[14] সহীহ বুখারী : ১৪৯; সহীহ মুসলিম : ৩৭৮০
[15] সহীহ বুখারী : ৫৬৩৩; সহীহ মুসলিম : ২০৬৭
[16] সহীহ মুসলিম : ২০৯০
[17] সুনানু আবি দাউদ : ৩৫৩৫, সুনানুন নাসায়ী : ৫০৫৪
[18] সহীহ বুখারী : ৫৪৭; সহীহ মুসলিম : ১৩৬৭
[19] সহীহ মুসলিম : ১৭২
[20] সহীহ বুখারী : ৫৬৮; সহীহ মুসলিম : ৬৪৭
[21] সিলসিলাহ সহীহাহ :৭৩৬
[22] সিলসিলাহ সহীহাহ : ৩/২৪৭
[23] সহীহ বুখারী : ১৯৮৫; সহীহ মুসলিম:১১৪৪
[24] সহীহ মুসলিম: ১৫৬৫
[25] সহীহ বুখারী : ৪৬০৪; সহীহ মুসলিম : ২১২৫
[26] সহীহ বুখারী : ৭২৯৯; সহীহ মুসলিম:১১০৩
[27] মিশকাতুল মাসাবীহ : ৩৭৬; মুসনাদে আহমাদ : ৭৫১৩
[28] সুনানুন নাসায়ী : ০৫

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন