রামাদান : ভ্রাতৃত্ব প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য

0
57

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

সমস্ত মুসলিম এক দেহ এক প্রাণ। মুসলিমদের সম্পর্কের এই সরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন—মুসলিমরা এক দেহের মতাে। যদি তার চক্ষু ব্যথিত হয় তাহলে তার সমস্ত শরীর ব্যথিত হয়।

এই যে একতা ও ভ্রাতৃত্ব—এর ভিত্তিই হলাে ইসলাম। ইসলামের সুশীতল ছায়া-ই তাদের একতাবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা কোনাে ব্যক্তি বা দলের কারিশমা নয়। এটা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

এবং তিনি তাদের হৃদয়ে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে তবে তাদের হৃদয়ে এ সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না; কিন্তু তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমতারও মালিক, হিকমতেরও মালিক।[1]

মুসলিমদের নিকট রক্ত, ভাষা, দেশ বা জাতিগত ঐক্য বলতে কিছু নেই। তাদের একতা কোনাে সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তাদের একতা বহু বিস্তৃত। তাদের। একতার উৎস হলাে দ্বীন ও ইসলাম। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এই কালেমা-ই তাদের ঐক্যের মানদণ্ড। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় তাকওয়ার নিক্তিতে এবং ইলম ও আমলের ভিত্তিতে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

আমি তােমাদের সকলকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তােমাদের বিভিন্ন জাতি ও গােত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তােমরা একে অন্যকে চিনতে পারাে। প্রকৃতপক্ষে তােমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান সেই, যে তােমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব বিষয়ে অবগতি রাখেন।[2]

নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর মুহাম্মাদ : যখন লােকদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন তখন হাবশার বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ডাকে সাড়া দেন। পারস্যের সালমান ও রােমের সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তার প্রতি ঈমান আনেন। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর নিকট প্রিয়পাত্র হয়ে যান। অপরদিকে বংশীয় গর্ব থাকার পরেও ওয়ালীদ ইবনু মুগীরা, আবু জাহল, আবু লাহাব পেছনে পড়ে থাকে। নিজেদের জন্য অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনে।

কিন্তু বংশ-মর্যাদা তাে তখন কোনাে কাজ আসবে না। কারণ, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন—

যার আমল তাকে পিছিয়ে দেবে তার বংশ-মর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।[3]

বস্তুত ইসলাম একটি বৈশ্বিক সমাজ-ব্যবস্থা। প্রতিটি মুমিন-মুসলিম এর একেকজন সদস্য। ইসলাম কোনাে নির্দিষ্ট গােত্র বা দেশের মুক্তির জন্য আবির্ভূত হয়নি। ইসলাম তাে আরব, আজম, হিন্দুস্তান, তুর্কিস্তান, আফ্রিকা, ইউরােপ—তথা সমগ্র বিশ্বের মুক্তির জন্যই আবির্ভূত হয়েছে।

এই যে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-তিনি ছিলেন কুরাইশী; বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন হাবশী; সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রুমী; সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ফারসী; সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন কুর্দী; মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন তুর্কী; আল্লামা ইকবাল রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন হিন্দুস্তানী; একমাত্র ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’—এই কালেমাই তাদের সকলকে এক পতাকাতলে নিয়ে এসেছে।

রামাদানে এই বিশাল ঐক্যের বিষয়টি আরও সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। একই মাস। একই সিয়াম। একই কিবলা। একই পথ। একই গন্তব্য।

অধিকন্তু রামাদানে আমরা সবাই এক ইমামের পেছনে সালাত আদায় করি। আল্লাহ তাআলা বলেন—

আর তােমরা রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করাে।[4]

অন্যত্র বলেন—

তােমরা সকলে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হও।[5]

আল্লাহ তাআলা আমাদের সিয়াম রাখার আদেশ দিয়ে বলেন—

হে মুমিনগণ, তােমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেভাবে তােমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরয করা হয়েছে—যেন তােমরা মুত্তাকী হতে পারাে।[6]

আমাদের হজ এক হজের সময় এক। হজের স্থান এক। ঘােষিত হয়েছে—

অতঃপর তােমরা যখন আরাফাহ থেকে রওনা হবে তখন মাশআরুল হারামের নিকট [7] আল্লাহর যিকির করাে। আর তার যিকির তােমরা সেভাবেই করবে, যেভাবে তিনি তােমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।[8]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে তার রঞ্জু আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করে এক হয়ে চলার আদেশ করেছেন। কুরআনে কারীমে ঘােষিত হয়েছে—

আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে এবং পরস্পরে বিভেদ করাে না। আল্লাহ তােমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখাে। একটা সময় ছিল, যখন তােমরা একে অপরের শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তােমাদের অন্তরসমূহ জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তার অনুগ্রহে তােমরা ভাই ভাই হয়েছ।[9]

বিচ্ছিন্নতা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—

এবং তােমরা সেই সকল লােকের মতাে হয়াে না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল ও আপসে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। এরূপ লােকদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।[10]

রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

নিশ্চয় আল্লাহ আমার নিকট ওহী প্রেরণ করে বলেছেন, তােমরা বিনয় অবলম্বন করাে। একজনের ওপর অন্যজন সীমালঙ্ঘন করাে না এবং কেউ কারও ওপর গর্ব করাে না।[11]

আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত অপর একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন—

মুমিন মুমিনের জন্য ইমারত সদৃশ। একজন আরেকজনকে শক্তিশালী করে।[12]

অন্য হাদীসে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে—

মুসলিম মুসলিমের ভাই। কেউ কারও ওপর যুলুম করে না। কেউ কাউকে অপদস্থ করে না। কেউ কাউকে তুচ্ছ মনে করে না। মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অকল্যাণকর। প্রতিটি মুসলিমের জান, মাল এবং ইজ্জত অপর মুসলিমের জন্য হারাম।[13]

এই যে একতা ও ভ্রাতৃত্ব—এর কিছু স্বতন্ত্র দাবি আছে। একজন মুসলিম হিসাবে এই দাবিগুলাে আমি এড়িয়ে যেতে পারি না। যেমন—অপর মুসলিম ভাইয়ের খোঁজ-খবর নেওয়া। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার সাক্ষাতে যাওয়া। অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া। সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়া। হাসিমুখে কথা বলা। হাঁচির উত্তর দেওয়া। তার দাওয়াত কবুল করা। জানাযায় উপস্থিত হওয়া। তার অনুপস্থিতিতে তার জন্য দুআ করা। তার ইজ্জত-আবু সংরক্ষণ করা। প্রয়ােজন পুরা করা। তার পাশে দাঁড়ানাে। অত্যাচারিত হলে সাহায্য করা। তার কল্যাণ কামনা করা। তাকে সদুপদেশ দেওয়া। এছাড়াও আরও অনেক হক রয়েছে। প্রতিটি মুসলিমই আমার ভাই। প্রত্যেকের সাথেই আমার ঈমানী ও কুরআনী বন্ধন রয়েছে। এই বন্ধন আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আর মুহাম্মাদ শু সেই বন্ধনের দাবি ও হকের প্রায়ােগিক রূপরেখা দেখিয়ে গিয়েছেন।

ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাদের মাঝে মুহাব্বত সৃষ্টি করুন। আমাদের বিচ্ছিন্নতা দূর করুন এবং আমাদের সবাইকে একতাবদ্ধ করুন।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ১৫২ – ১৫৭


[1] সূরা আনফাল, আয়াত : ৬৩
[2] সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩
[3] সহীহ মুসলিম : ২৬৯৯
[4] সূরা বাকারা, আয়াত : ৪৩
[5] সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩
[6] সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩
[7] এ এলাকাটি মুযদালিফার নিকটে অবস্থিত
[8] সূরা বাকারা, আয়াত : ১৯৮
[9] সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩
[10] সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৫
[11] সহীহ মুসলিম : ২৮৬৫
[12] সহীহ বুখারী : ২৪৪৬
[13] সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন