রামাদানের হারিয়ে যাওয়া সুন্নত আমল – পর্ব ১

1
801

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২ | পর্ব- ৩

আমরা অনেকেই রামাদানে বেশি বেশি ইবাদাত করবার জন্যে সারাদিনের ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যে একটু সময় করে নিতে হিমশিম খাই। কাজ আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ততার কারণে নিজের আধ্যাত্মিকতার উন্নতির জন্য সময় বের করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে যায়। এই সময়ের অভাব অনেককেই হতাশ করে দেয়।

আমাদের কাছে মনে হতে পারে স্রেফ অতিরিক্ত কাজের চাপে এই পবিত্র মাসের ফায়দাগুলাে আমরা নিতে পারছি না। এক্ষেত্রে বেশ কিছু সহজ আমল আমাদের জন্য রয়েছে, যেগুলাে আমরা পুরাে দিনব্যাপীই করে যেতে পারি। এমনকি কাজে থাকলেও সেই আমলগুলাে করতে কোন সমস্যা হবার কথা নয়।

এই আমলগুলাের মাধ্যমে আমরা অর্জন করে নিতে পারি বিশাল বিশাল পুরস্কার, তা সে যত ব্যস্তই আমরা থাকি না কেনা সময়ের অভাব নিয়ে তাই আফসোস না করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর মূল্যবান সুন্নাহগুলাের অনুসরণ করলে তা আপনাকে এনে দেবে বারাকাহ, সুযােগ করে দেবে রামাদানের পবিত্র এই সময়ে সুবিশাল সব অর্জনের, একইসাথে আপনার রুহানিয়াত আর সামগ্রিক পারফরম্যান্স, দুটোকেই বাড়িয়ে তুলবে অনন্য উপায়ে। দেখে নিন ১২ টা সুপার সুন্নাহ যেগুলো আপনি ব্যস্ততার মধ্যেও আমল করতে পারবেন।

(১) প্রতিদিন নিয়তকে নবায়ন করে নেওয়া 

এখানে প্রথমেই দুটো বড় হাদিস আমাদের মনে রাখা উচিত। প্রথমটা হল, আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ) বলেছেন, “(আল্লাহ বলেছেন), বনী আদমের সব ভালাে কাজই তার নিজের জন্য একমাত্র সাওম ছাড়া; সাওম আমার এবং আমিই এর পুরষ্কার দেব।” [1] 

নিশ্চয়ই, “সায়েমের (রােযাদারের) মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকে আম্বরের চেয়েও উত্তম।[2] 

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরাে বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রামাদানের সাওম রাখবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।” [3]

প্রথম হাদিসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই যে লম্বা সময় ধরে আমরা সিয়ামরত অবস্থায় আছি, এই ইবাদাতটা আমরা করছি শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য। তাই, কৃতজ্ঞ হােন যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাকে এই মাসের সাক্ষী বানিয়েছেন এবং তাঁর জন্য এই বিশাল ইবাদাত পালনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। রামাদানের এই লম্বা সময় গুলো হচ্ছে আত্মত্যাগের সময়, কৃতজ্ঞতার সময় আর আধ্যাত্মিকতার সময়। এই সময়গুলোতে যদি আপনি কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেটা আসলে আপনাকে এনে দিচ্ছে আরাে বড় পুরস্কার, যদি আপনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার খাতিরে দৃঢ়চিত্ত আর অবিচল থাকেন। 

তাই, প্রতিদিন নিজের নিয়ত নবায়ন করুন। মনে রাখুন যে সিয়াম এমন একটি কাজ যেটার ফলে আপনার অতীতের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। গুনাহ মাফের সাথে সাথে এটা আপনার জন্য নিয়ে আসবে বিশাল আকারের বিশেষ পুরস্কার। আপনার সিয়ামকে কবুল হিসেবে ধরে নেবেন না আবার।

এছাড়াও, আমলের পেছনে নিয়তের ব্যাপারে মনােযােগের অবস্থা হচ্ছে তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ, যে তাকওয়ার উন্নয়নই রামাদানে আমাদের মূল লক্ষ্য। তাকওয়া হচ্ছে সবচেয়ে প্রয়ােজনীয় গুণাবলীর একটা, যেটার ব্যাপারে আল্লাহ চান যে আমরা তাকওয়াবান হই। আপনি যদি এই মাসে তাকওয়া বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেন, তাহলে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠার পথে সেটা হয়ে উঠবে আপনার জন্য অসাধারণ একটা পদক্ষেপ।

সুতরাং, এই রামাদানে আপনার সচেতনতা নিশ্চিত করুন এবং বারবার নবায়ন করে নিন আপনার নিয়ত। নিয়তেই মেলে পুরস্কার, যেমনটা নিয়ত করবেন পুরস্কারটাও সেই অনুপাতেই পাবেন আর তাই আপনার নিয়তটা হতে হবে খাঁটি।

রামাদানের জন্য তাই করে ফেলুন বিশুদ্ধ, সুন্দর একটা নিয়ত। যেমনটা বলেছিলেন আমাদের রাসূল (ﷺ) – “প্রতিটি আমলই নিয়তের উপর নির্ভরশীল আর মানুষ তার নিয়ত অনুসারেই প্রতিদান পাবে।[4]

(২) অন্যদের জন্য দুআ করা 

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যখন কোন মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দুআ করে তখন ফেরেশতারা বলেনঃ আমীন এবং তােমার জন্যও অনুরূপ। [5] 

খুব ব্যস্ত শিডিউলের কারণে আপনি হয়তাে বন্ধুবান্ধব আর প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানাের ফুরসত করে নিতে পারেন না। কাজের ব্যস্ততায় সে সুযােগ আপনার হয়ে ওঠে না। তাই যখনই মনে পড়ে যাবে কোন প্রিয়জনের কথা, অথবা এমন কারাে কথা যার সাথে আপনার ইখতিলাফ বা মতবিরােধ আছে, তার বা তাদের জন্য চটজলদি দুআ করে ফেলবেন। দুআর ক্ষেত্রে উদার হােন, তাহলে যে ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেও একই দুআ পেয়ে যাবেন আপনি!

প্রিয়জনদের জন্য দুআ করা খুব সহজ। অথচ এটা তাদের জন্য বিশাল এক উপহার, যেটা আপনি তদের জন্য পাঠিয়ে দিতে পারেন অনায়াসেই। যাদের সাথে আপনার টক্কর লেগে আছে, যাদের সাথে আপনার মতের মিল হয় না, সেই মানুষগুলাের জন্যও দুআ করবেন অবশ্যই। 

এটা আপনার হৃদয়ে জমে থাকা বরফকে তাে গলাবেই, তাদের সম্পর্কে মনে জমে থাকা অন্যান্য খারাপ ধারণার পাহাড়কেও গলিয়ে ফেলবে ইনশাআল্লাহ। মানসিক, আধ্যাত্মিক শান্তি, নির্মলতা আর একটা বিশুদ্ধ অন্তরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ এক অসাধারণ পদ্ধতি।

তাই আজ থেকে যখনই আপনি কাজে, ঘরে অথবা রাস্তাঘাটে যাতায়াতে থাকবেন, তখনই আপনার জীবনের সাথে নানাভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষদের কথা স্মরণ করুন আর করে ফেলুন তাদের জন্য সুন্দর একটা দুআ।

(৩) লুফে নিন সাহরির বারাকাহ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তােমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে রয়েছে বারাকাহ।[6]

অনেকেই সাহরি মিস করে ফেলেন, স্রেফ ভােরের আগে জেগে উঠে খাওয়া দাওয়া করাটা একটু কঠিন, এই কারণে। অথচ এই সময় আর এই সময়ের খাবার, দুটোর মধ্যেই রয়েছে অনেক, অনেক উপকার। যদি আপনি এই বারাকাহপূর্ণ সময়ে ঘুম থেকে উঠে পড়েন, তাহলে আপনি দুআ করতে পারবেন, কয়েক রাকআত সালাতও পড়ে ফেলতে পারেন, ইসতিগফারও করতে পারবেন ভরপুর। ইবাদাতের জন্য চমৎকার একটা সময় এটা। তাছাড়া এসময় কোন ব্যস্ততাও থাকে না আপনার। এই সময়টা আপনাকে ভরে দিতে পারে শক্তি সামর্থ্যে আর আধ্যাত্মিকভাবে আপনাকে করে তুলতে পারে পরিপুষ্ট, ভরপুর। আপনাকে দিতে পারে সামনের ব্যস্ত, অস্থির কর্মক্লান্ত দিনের জন্য শান্তির পরশ। 

এছাড়াও যখন আপনি সাহরি খেতে ওঠেন, তখন আপনি আসলে আল্লাহ আর তাঁর রাসূলের আনুগত্য করেন। কেননা এটা রাসূলুল্লাহ -এর একটা সুন্নাহ। শুধু তাই নয়, এটা আপনাকে পুরাে দিন জুড়ে আপনার প্রােডাক্টিভিটি আর ফোকাস সর্বোচ্চ পরিমাণে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তাই সাহরির জন্য বেছে নিন স্বাস্থ্যকর খাবারদাবার। বিশেষ করে খেজুরও বেছে নিতে পারেন, কারণ এটা সুন্নাহ এবং খেজুরের পুষ্টিগত উপকারিতা প্রচুর।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “খেজুর দিয়ে সাহরি কতােই না উত্তম![7] 

(৪) মানুষকে খাওয়ানো 

সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পাবার মত যে কয়টা কাজ রাসূলুল্লাহ আমাদের জানিয়ে গিয়েছেন, তার মধ্যে একটা হচ্ছে মানুষকে খাওয়ানাে। এই সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণে আয়াত আর হাদিস আছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন রােজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্যও সেই রােজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব দেওয়া হবে, রােজাদারের সওয়াবে এতে কোন কমতি হবে।[8]

আরেকটি হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেনঃ একজন লােক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করে, “কোন কাজটা ইসলামে সর্বোত্তম? [9] 

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন, “গরীব ও অভাবীদের খাওয়ানাে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।[10] 

 সহজে আমল করবার জন্য অসম্ভব সুন্দর একটা সুন্নাহ এটা। অন্যদের সেবা করা, মানুষকে সেবা পৌঁছিয়ে দেওয়া একটা ইবাদাত। এটা মানুষের নম্রতাকে বাড়িয়ে দেয়, স্বার্থপরতাকে কমিয়ে দেয়, অন্তরকে নরম করে তােলে। অনেক ভাবেই এই কাজটা করা যায়। আপনি নিজের হাতে খাবার বানাতে পারেন অথবা কিনে নিতে পারেন নয়তাে অভাবীদের খাওয়ানোর প্রজেক্টের সাথে জড়িত কারাে কাছে টাকা দান করতে পারেন।

যেটাই করুন না কেন, এর মাধ্যমে আপনি নিচের আয়াতেরই অনুসরণ করবেনঃ খাবারের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাবার দান করে এবং বলে, আমরা তােমাদেরকে খাবার দান করি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, আমরা তােমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই। , কৃতজ্ঞতাও নয়।[11]  

তাই মানুষকে খাওয়ানাের প্ল্যান করে ফেলুন; বিশেষ করে গরীব, অভাবী মানুষগুলােকে যখন চোখভরে দেখবেন আপনার রান্নাকরা বা কেনা খাবারগুলাে থেকে একজন গরীব মানুষ ক্ষুধায় শান্তি পাচ্ছে, তখন সেটা আপনার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাবােধকে অনেকগুণে বাড়িয়ে দেবে আর আপনার আত্মাকে করে তুলবে সতেজ, সমৃদ্ধ।

পর্ব- ১ | পর্ব- ২ | পর্ব- ৩

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ৮২ – ৮৬


[1] বুখারি, হাদিস-ঐ;৫৯২৭; মুসলিম, হদিস-ক্রম;১১৫১
[2] বুখারি, হাদিস-ক্রম:১১০৪; মুসলিম, হাদিস-ক্রম:১১৫১; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম; ১০৫৬৪
[3] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৮; মুসলিম, যদিস-ঐশ : ৭৮০ 
[4] বুখারি, হাদিস-ক্রম; ১; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৯০৭
[5] মুসলিম, হাদিস-ম:২৭৩২
[6] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৯২৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ১০৯৫
[7] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ২৩৪৫; ইবনু হিব্বান, হাদিস-ক্ৰম : ৩৪৭৫
[8] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৮০৭
[9] বুখারি, হাদিস-ক্ৰম; ১২
[10] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৩১
[11] সূরা ইনসান, আয়াত-ক্ৰম : ৮-৯ 

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য লিখুন