রামাদানের হারিয়ে যাওয়া সুন্নত আমল – পর্ব ২

2
275

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২ | পর্ব- ৩

(৫) যিকর আর তাসবীহ পাঠ মশগুল থাকা 

আল্লাহর স্মরণ বা যিকর হচ্ছে এমন একটি আমল যার জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণ পুরস্কারের ওয়াদা আছে। যদিও এই আমলটা করে ফেলা যায় অনায়াসেই, কিন্তু এটা আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে আপনার আন্তরিকতা, মনোেযােগ আর আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে। 

এই আমলের প্রতিদান অনেক বড়, অনেক বেশি। আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন  রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “আমি কি তােমাদের ঐ আমলের কথা বলবাে না যা আমলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম আর তােমাদের রবের নিকট পবিত্রতম, মর্যাদায় সর্বোচ্চ আর সােনা ও রূপা খরচ করার চেয়েও উত্তম এবং শত্রুর মুখােমুখি হয়ে তাদের গর্দানে আঘাত করা এবং তারা তােমাদের গর্দানে আঘাত করার চেয়েও উত্তম?” 

তারা বললেন: “অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” 

তিনি বললেন, “সেটা হল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যিকির।” তারপর মুআয ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আল্লাহর আযাব থেকে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া আর কিছুতেই মুক্তি আসে না।[1] 

তাই কাজের সময় হােক বা যাতায়াতের সময় হােক, আপনি আরামসে যিকর করতে পারবেন। মনে রাখবেন, এমনিতে স্বাভাবিক দিনগুলােতেও যিকরের পুরস্কার বিশাল, সেখানে রামাদানে তাে এটা বিশালতর হয়ে দাঁড়ায়। 

আয যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “রামাদানে একবার তাসবীহ অন্য সময়ের হাজার তাসবীহের চেয়ে উত্তম।[2] 

(৬) কুরআন হিফযের জন্য বাস্তবসম্মত টার্গেট নেওয়া 

রামাদান কুরআনের মাস। এই মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এই মাসে। কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্কের উন্নতি না হলে মাস শেষে এটা আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলবে। 

তাই বাস্তবতার সাথে মিল রেখে প্ল্যান করে ফেলুন। কিন্তু আল্লাহর দানশীলতা আর সাহায্যকে ভুলে যাবেন না। খুব বেশি আবেগীও হবেন না, আবার একেবারে আশাও ছেড়ে দেবেন না। তিলাওয়াত আর হিফ্য, দুটোর জন্যই বাস্তবসম্মত একটা টার্গেট সেট করে ফেলুন, ইনশাআল্লাহ। 

হতে পারে মাত্র কয়েকটা আয়াত আপনি মুখস্ত করলেন, অনুধাবন করলেন, তারপর সেটা নিজের জীবনে প্রয়ােগ করলেন। আবার হতে পারে একটা পৃষ্ঠা বা একটা পুরাে সূরাই মুখস্ত করে ফেললেন। 

আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, এটা কখনাে বন্ধ করা যাবে না। আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকুন আর এই মাসটায় আল্লাহর কিতাব থেকে কিছু অংশ নিজের অন্তরে গেঁথে ফেলুন। মাস শেষে নিজেকে তখন অনেক বেশি পরিপূর্ণ মনে হবে ইনশাআল্লাহ।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীরা এই মাসে যতােটা সময় কুরআনের সাথে জুড়ে থাকতেন, আর কখনাে ততােটা থাকতেন। তাই, আপনিও গড়ে তুলুন এই মাসে কুরআনের সাথে এক বিশেষ সম্পর্ক।

(৭) মাতাপিতার সাথে করুন সুন্দরতম ব্যবহার 

যেখানেই থাকুন না কেন, এই মাসের পিতার সাথে সম্পর্কটা আরাে গাঢ় করে তোলার চেষ্টা করুন। যদি তাদের সাথে কোন কারণে মনােমালিন্য হয়ে থাকে, তবে চেষ্টা করুন এই মাসে সেটা মিটিয়ে আবার তাদের সাথে এক হায়ে যেতে। যদি কোন সমস্যা না থাকে তাহলে চেষ্টা করুন পারস্পরিক সম্পর্কটাকে আরাে সুন্দর করে তােলার আর তাদের প্রতি আপনার ব্যবহারকে যথাযথ করে তােলার।

আমল আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, এক লােক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলােঃ “কে আমার কাছে সুন্দর ব্যবহার বেশি পাওয়ার হকদার?

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন: “তােমার মা। সে জিজ্ঞেস করলাে, তারপর? তিনি বললেন: তােমার মা। সে জিজ্ঞেস করলাে; তারপর? তিনি জবাব দিলেন: আবারাে তােমার মা। লােকটি আবার জিজ্ঞেস করলাে, তারপর কে? এবার রাসূলে কারীম জবাব দিলেন; এরপর তােমার বাবা।[3]

বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা এমন একটি শ্রেষ্ঠ আমল যেটার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ আর তাঁর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই আমলের পুরস্কার সুবিশাল!

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “বাবা-মা হচ্ছে জান্নাতের সর্বোত্তম দরজাগুলাের মধ্যে অন্যতম; অতএব তুমি ঠিক করাে, এটা থেকে ফায়দা নিবে নাকি এটাকে হারিয়ে ফেলবে।[4]

তাই আবারাে বলি, যেখানেই থাকি না কেন, আমরা এই মাসে আরাে একটু বেশি করবার চেষ্টা করতে পারি। হতে পারে এটা বাবা মাকে দেখতে যাবার মাধ্যমে, তাদেরকে উপহার দেবার মাধ্যমে, তাদেরকে কল দেবার মাধ্যমে, তাদের কাজেকর্মে সাহায্য করার মাধ্যমে এবং আরাে অনেক, অনেক ভাবে। উপায়ের অভাব নেই। আল্লাহর সাহায্য চান যাতে তিনি আপনাকে নির্দেশনা আর প্রেরণা দান করেন।

(৮) কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাত আদায় করা

আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে নিজের আরাম আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে রাতের বেলা সালাতে দাঁড়ানাে এমন একটা আমল, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইখলাসপূর্ণ একটা কাজ এবং একইসাথে অনেক বেশি আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ একটা কাজ। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি রামাদানের রাতে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশা নিয়ে সালাত আদায় করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।[5]

যদি রাতের বেলা জামাআতের সাথে সালাত আদায় করা আপনার জন্য সম্ভব হয়, তবে তাই করুন। যদি কোন কারণে সেটা করতে না পারেন, তবুও যেন এই সুযােগ হাতছাড়া না হয়। যেখানেই থাকুন, ঘরে বা বাইরে, সালাত আদায় করে নিন। ইশার নামাজের পর যেকোন সময়েই কিয়ামুল লাইল করে নিতে পারেন। ঠিক ঠিক ইশার পরেই আদায় করে ফেলতে পারেন, অথবা ইশার সালাত পড়ে ঘুমিয়ে তারপর জেগে উঠে আদায় করে নিতে পারেন। সবচেয়ে উত্তম হয় যদি আপনি ফজরের ওয়াক্তের আগে জেগে উঠে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে এই কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে পারেন।

ইশার পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত যেকোন সময়েই সালাত আদায় করে নিতে পারেন, এই সবগুলােই কিয়ামুল লাইল হিসেবে গণ্য হবে। অতএব, সুয়ােগ কিন্তু সীমিত নয় – অবারিত!

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “কেউ যদি রাতের সালাতে দাঁড়িয়ে দশ আয়াত তিলাওয়াত করে তাহলে তাকে গাফিলদের মধ্যে ধরা হবে না; যদি কেউ রাতের সালাতে দাঁড়িয়ে একশ’ আয়াত তিলাওয়াত করে তবে তাকে আল্লাহর বাধ্যগত বান্দাদের মধ্যে একজন ধরে নেওয়া হবে; আর যদি কেউ রাতের সালাতে দাঁড়িয়ে এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করে তাহলে তাকে বিশাল পুরস্কৃতদের অন্তর্ভূক্ত করা হবে।[6]

তাহলে আপনি যদি একজন ব্যস্ত মা হন, তাহলে ভাববেন না যে মসজিদে সালাতে শরীক না হতে পেরে আপনার পুরস্কার বুঝি মিস হয়ে গেল। উল্টো ঘরে থেকে আপনার আদায় করা সালাত তাে মসজিদে সালাত আদায় করার চেয়েও আরাে বেশি পুরস্কৃত হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করেন নি, কিন্তু তিনি এটা তাদের উপর বাধ্যতামূলক কিংবা চাপিয়েও দেন নি।বরং বলেছেন যে, ঘরে থেকে একজন নারীর সালাতকে বিশালাকারে পুরস্কৃত করা হবে।

ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তােমরা নারীদের মসজিদে যেতে বাঁধা দিবেনা, কিন্তু ঘরই তাদের জন্য উত্তম (সালাতের জন্য)।[7]

তাই এই রামাদানে, সর্বাবস্থায় নিশ্চিত করুন যে রাতের সালাত আপনি আদায় করছেন। আপনার পারিপার্শ্বিকতার আলােকে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই করুন। আর আমরা যাইই করি না কেন, তার মধ্যে খাইর (ধার্মিকতা আর পুরস্কার ও কল্যাণ) আছে, যতক্ষণ সেটা আমরা ইখলাস আর যথাযােগ্য প্রচেষ্টার সাথে করছি।

পর্ব- ১ | পর্ব- ২ | পর্ব- ৩

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ৮৭ – ৯০


[1] আহমাদ, হাদিস-ক্ৰম; ২৭৫২৫; তিরমিযি, হাদিস-ক্রম; ৩৩৭৭
[2] ফাদাইলু রানাদান, ইবনু আবিদ দুনয়া, ৫১
[3] মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ২৫৪৮
[4] ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৩৬৬৩, তিরমিযি, হাদিস-ক্রম : ১৯০০, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম : ২৭৫৫১
[5] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৭, মুসলিম, হাদিস-ক্রম; ৭৫৯
[6] আবু দাউদ, হাদিস-ম; ১৩৯৮; ইবনু হিব্বান, হাদিস-ক্রম; ২৫৭২
[7] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ৫৬৭

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন