সময়ের হিফাযত করুন

0
186

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

সময় হলাে বহতা নদীর মতাে। কুলকুল রবে নিজ গতিতে বয়ে যায়। কারও জন্য বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করে না। একসময় সন্ধ্যা নেমে আসে। শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেহটা নিথর পড়ে থাকে। প্রিয় মানুষ কয়েকদিন কান্নাকাটি করে। এরপর সবাই ভুলে যায়। সকলে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; কিন্তু সময় তার নিজ গতিতেই চলতে থাকে। যারা দুনিয়ায় খেল-তামাশা ও আমােদ-ফুর্তিতে সময় নষ্ট করেছে কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে আল্লাহর প্রশ্নোত্তরের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন—

আল্লাহ বলবেন, তােমরা পৃথিবীতে কত বছর ছিলে? তারা বলবে, আমরা এক দিন বা এক দিনেরও কম সময় ছিলাম। (আমাদের ভালাে করে মনে নেই) কাজেই যারা গুনেছে তাদের জিজ্ঞাসা করুন। আল্লাহ বলবেন, তােমরা অল্পকালই ছিলে। কতই-না ভালাে হতাে, যদি এ বিষয়টা তােমরা আগেই বুঝতে। তবে কি তােমরা মনে করেছিলে যে, আমি তােমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছি এবং আমার কাছে তােমাদের ফিরিয়ে আনা হবে না? মহামহিম আল্লাহ, যিনি প্রকৃত বাদশাহ। তিনি ছাড়া কোনাে মাবুদ নেই। তিনি সম্মানিত আরশের মালিক।[1]

এক বুযুর্গ বলেন-“জীবন তাে এমনিতেই ছােট। গাফলতের মাধ্যমে একে আর ছােট কোরাে না।

কত বাস্তবসম্মত কথা! গাফলত ও উদাসীনতা কত মানুষের সময়কে যে অর্থহীন করে রেখেছে।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—

দুটি নিয়ামত এমন আছে, যার ব্যাপারে বহু লােক ধোঁকায় নিপতিত। একটি হলাে সুস্থতা, অপরটি হলাে অবসর।[2]

বাস্তবেও দেখা যায়, কত মানুষ সুস্থ-স্বাভাবিক। ব্যস্ততামুক্ত; কিন্তু তাদের সময়গুলাে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জীবনপ্রদীপ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। সময় থেকে সে কোনাে উপকার লাভ করছে না। সময়কে সে কোনাে ফলদায়ক কাজে ব্যবহার করছে না। রাসুল (সাঃ) বলেছেন—

চারটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ব্যতীত কিয়ামতের দিন বান্দার কদম চুল পরিমাণও নড়বে না। এর মধ্যে একটি হলাে, জীবনকে সে কোন কাজে নিঃশেষ করেছে?[3]

জীবন হলাে কিছু সময়ের সমষ্টি। জীবন হলাে এক গুরুত্বপূর্ণ ধনভাণ্ডার। যে তা আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করবে সে কিয়ামতের দিন তার ধনভাণ্ডার ফিরে পাবে— যে-দিন সন্তানসন্তুতি কিংবা ধন-সম্পদ কোনাে কাজে আসবে না—তবে যে-ব্যক্তি আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে বিশুদ্ধচিত্ত নিয়ে সে-ই কেবল মুক্তি পাবে।

আর যে সময়কে আল্লাহর নাফরমানী ও খেল-তামাশায় ব্যয় করবে সে চূড়ান্ত পর্যায়ের লজ্জিত হবে এবং বলবে, হায় আফসোেস, দুনিয়াতে আমরা কী ভুল করে এলাম।

দিনরাত মূলত একটি বাহনের ন্যায়। কাউকে তা চিরস্থায়ী সৌভাগ্যের দিকে নিয়ে যায়। আবার কাউকে নিয়ে যায় চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যের দিকে।

আমাদের সালাফগণ সময় হিফাযতের জন্য নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রতিযােগিতা করতেন। এ প্রসঙ্গে তাদের অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি মৃত্যুশয্যায়ও কষ্ট করে কুরআন তিলাওয়াত করে যাচ্ছিলেন। তখন তার সন্তানরা তাকে বলেন, আপনি তাে নিজেকে পরিশ্রান্ত করে ফেলছেন। তিনি উত্তর দেন, আমি না করলে কে করবে? এ কাজে আমার চেয়ে বেশি হকদার কে?

তাবেয়ী আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ রাতের অধিকাংশ সময় সালাত আদায় করতেন। একবার তার এক ছাত্র তাকে বলেন, আপনি যদি একটু বিশ্রাম নিতেন! তিনি উত্তর দেন, “আরে, বিশ্রাম নেওয়ার জন্যই তাে সালাত পড়ছি। অর্থাৎ দুনিয়াতে যত বেশি সালাত পড়তে পারব আখেরাতে তত বেশি বিশ্রাম নিতে পারব।

একবার সুফিয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ হারামে বসে কয়েকজন লােকের সঙ্গে কথা বলছিলেন; কিন্তু হঠাৎ শঙ্কিত ও ব্যস্তসমস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, আমরা এখানে বসে আছি। অথচ সূর্য কিন্তু তার কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে!

সালাফদের কেউ কেউ দিবারাত্রিকে কয়েক ভাগে ভাগ করতেন—এক ভাগ নফল সালাতের জন্য। এক ভাগ কুরআন তিলাওয়াতের জন্য। এক ভাগ যিকির-আযকারের জন্য। এক ভাগ ইলম অর্জনের জন্য। এক ভাগ হালাল উপার্জনের জন্য এবং এক ভাগ ঘুমের জন্য। মােটকথা, খেল-তামাশার জন্য তাদের কোনাে সময় ছিল না।

কিন্তু পরবর্তীদের অধিকাংশই সময় নষ্ট করার ফিতনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। ঘুম, অলসতা, অনর্থক কথা-বার্তা—ইত্যাদিতে বেশুমার সময় নষ্ট করে দেয়। সরাসরি গুনাহের আসরে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারলেও এমন অনেক আসরে অংশগ্রহণ করে যেগুলাে গুনাহের দিকে ধাবিত করে।

মানুষ ইচ্ছা করলে সালাতকে কেন্দ্র করে জীবনের সময়গুলাে সুবিন্যস্তভাবে ব্যবহার করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন— নিশ্চয় সালাত মুমিনদের ওপর এমন অবশ্য পালনীয় কাজ—যা সময়ের সাথে আবদ্ধ।

তাই কেউ ইচ্ছা করলে সালাতের রুটিন অনুযায়ী তার সময় বিন্যস্ত করে নিতে পারে। ফজরের পরের সময় তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, তাদাব্বর [4] ও কুরআন মুখস্থ করার কাজে ব্যয় করবে। সূর্য ওপরে ওঠার পর থেকে যােহর পর্যন্ত কাজ-কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, হালাল উপার্জন এবং ইলম অন্বেষণের কাজে ব্যবহার করবে। যােহরের পর থেকে চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা তাদের কাজ করবে। আর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং ইতিহাস অধ্যয়নে সময় কাটাবে। আসরের পর থেকে মাগরীব পর্যন্ত পাঠাগারে সময় দেবে। মাগরিবের পরের সময় পরিচিতদের সাথে সাক্ষাতে ব্যয় করবে। আর ইশার পরের সময়টা পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখবে। এরপর ঘুম এবং কিয়ামুল লাইল। বৃহস্পতিবার বিশ্রাম এবং বৈধ বিনোেদন। শুক্রবার ইবাদাত, তিলাওয়াত, যিকির-আযকার এবং জুমআর প্রস্তুতি।

তদ্রুপ কেউ ইচ্ছা করলে রামাদানের সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।

কারণ, সিয়াম পালনকারী দিনের বেলায় রান্না-বান্না, খাবার-দাবার ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত থাকে। ফলে সারা দিন অনেক সময় বেঁচে যায়। রােজাদার দিনের এই দীর্ঘ সময়কে ইবাদাত-বন্দেগীর কাজে ব্যবহার করতে পারে।

আফসােস! আজ কত মানুষ সিয়ামের অর্থই বােঝে না। হেলায়-ফেলায় এবং গাফলতি-উদাসীনতায় রামাদানের বরকতময় সময়গুলাে নষ্ট করে ফেলে। দিনের সময়গুলাে নিদ্রায় কাটিয়ে দেয়। রাতের সময়গুলাে অনর্থক কাজে অতিবাহিত করে।

ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাদের সময় হিফাযতের তাওফীক দান করুন। আমাদের অবিচল ও দৃঢ়পদ রাখুন এবং আপনার আনুগত্যে আমাদের ব্যবহার করুন।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ১৪৮ – ১৫১


[1] সূরা মুমিনূন, আয়াত : ১১২-১১৬
[2] সহীহ বুখারী : ৬০৪৯
[3] জামি তিরমিযী : ২৪১৬
[4] কুরআন নিয়ে গবেষণা।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন