জিহ্বার সিয়াম

0
309

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

বস্তুত, মানুষের জিহ্বা ও মুখেরও একপ্রকার সিয়াম রয়েছে—যা কেলমাত্র অনর্থক কথাবার্তায় নির্লিপ্ত ব্যক্তিরা বােঝে। এই সিয়াম যেমন রামাদানে পালন করতে হয়, তেমনই রামাদানের বাইরেও পালন করতে হয়। বিশিষ্ট সাহাবী মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবীজি (সাঃ) তার জিহ্বার দিকে ইশারা করে বলেন—

তুমি একে সংযত রাখাে’। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বলি, হে আল্লাহর নবী, আমরা যা-কিছু বলি সেজন্য কি পাকড়াও হবাে? তিনি বলেন, মুআয, তােমার মা তােমার জন্য কাঁদুক। মানুষ তাে তার অসংযত কথাবার্তার কারণেই অধােমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।[1]

জিহ্বার আক্রমণ অতি ভয়াবহ। আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় জিহ্বা টেনে ধরে কাঁদতেন আর বলতেন, এই জিহ্ব-ই আমাকে সমস্ত বিপদাপদের সম্মুখীন করেছে!

মানুষের জিহ্বা হিংস্র জন্তুর চেয়েও ভয়ানক। আগুনের লেলিহান শিখার চেয়েও মারাত্মক। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের জিহ্বাকে লক্ষ্য করে বলতেন—

হে জিহ্বা, বললে ভালাে কথা বলাে। এতে উপকৃত হবে। অন্যথায় খারাপ কথা বলা থেকে চুপ থাকো, এতে নাজাত পাবে; লজ্জিত হতে হবে না।[2]

যে-সকল মুসলিম নিজের জিহ্বাকে অন্যের সমালােচনা, গীবত ও অনর্থক কথাবার্তা থেকে হিফাযত করে, আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের ওপর রহম করুন। এমনকি যারা সর্বদা বুঝে শুনে, মেপে ঝুপে কথা বলে এবং কথার আদব বজায় রাখে, আল্লাহ তাদের প্রতিও রহম করুন!

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

মানুষ যে-কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য তার নিকটে একজন সদা তৎপর প্রহরী রয়েছে।[3]

অতএব, এটা স্পষ্ট যে, মানুষের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের হিসেব গ্রহণ করা হবে। এই হিসেব গ্রহণ অযৌক্তি বা অন্যায় নয়। কারণ, মহান আল্লাহ বান্দার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করতে পারেন না; অধিকন্তু তিনি বলেন—

আপনার পালনকর্তা তাঁর বান্দাদের প্রতি মােটেই যুলুম করেন না।[4]

সাহল ইবনু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন—

যে-ব্যক্তি তার দু-চোয়ালের মাঝের বস্তু অর্থাৎ জিহ্বা এবং দু-রানের মাঝের বস্তু অর্থাৎ লজ্জাস্থান—এর ব্যাপারে আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তার জান্নাতের যিম্মাদার হয়ে যাবাে।[5]

সালাফগণ কুরআন-সুন্নাহর আলােকে নিজেদের সুরযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। খুব বেশি প্রয়ােজন ছাড়া তারা কথা বলতেন না। এজন্য তারা যখন কথা বলতেন তখন সেটা হতাে যিকির, উপদেশ কিংবা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মতাে মহিমান্বিত ইবাদাত। আর যখন চুপ থাকতেন তখন তাদের নীরবতা হতে আখিরাতের চিন্তা ও আল্লাহর ধ্যান-জ্ঞান।

যখন একজন নেককার মানুষের মনে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ভীতি জাগে, তখন সে সর্বদা যিকির, ফিকির ও তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে নিমগ্ন থাকে এবং যাবতীয় পাপাচার ও অনর্থক কথাবার্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—

আল্লাহর শপথ! পৃথিবীতে সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণযােগ্য হচ্ছে এই জিহ্বা। [6]

সৎকর্মশীল ব্যক্তিরা যখন কথা বলতে উদ্যত হন, তখন প্রথমে তারা এর ফলাফল ও পরিণাম নিয়ে চিন্তা করেন। অতঃপর অনেক ক্ষেত্রে চুপ হয়ে যান এবং শ্রোতাদের শত আগ্রহ সত্ত্বেও কথা বলা থেকে নিবৃত থাকেন।

যে-ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায়ও মিথ্যা বলে, মানুষকে ধোঁকা দেয়, অন্যের গীবত করে, গালিগালাজ ও অশােভনীয় আশ্রণ করে, তার কীসের সিয়াম?! মুসলিম ভাইকে কষ্ট দিলে সিয়াম পালন করে কি লাভ? এমন সিয়াম কী আদৌ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে?

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন—

প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার হাত ও মুখ হতে অপর মুসলিম নিরাপদ।[7]

মহান আল্লাহ বলেন—

আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথাই বলে, যা অতি সুন্দর। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু[8]

উপযুক্ত আয়াতে ‘উত্তম কথা বলতে নম্র-ভদ্র ও শিষ্টাচারপূর্ণ এমন বাক্য বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে, যা কারও মনে আঘাত করে না এবং যাতে মানুষের সম্মান ও মর্যাদাও বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয় না।

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন—

তােমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তােমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গােশত খেতে পছন্দ করবে? তােমরা তাে এটাকে ঘৃণাই করে থাকো। আল্লাহকে ভয় করাে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু [9]

কত মানুষ জিহ্বা ও মুখের অপব্যবহার করে সারা দিনের কষ্টের সিয়াম অবশেষে বরবাদ করে দিচ্ছে! সিয়ামের উদ্দেশ্য ক্ষুধা বা পিপাসা নয়; বরং প্রতিটি মানুষকে ভদ্র, সভ্য ও শিষ্ট করে গড়ে তােলা-ই হচ্ছে এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

জিহ্বার দ্বারা সাধারণত দশটি গােনাহ সংঘটিত হয়ে থাকে। যথা—মিথ্যা, গীবত, পরনিন্দা, গালিগালাজ, অশ্লীলতা, কদর্যতা, প্রতারণা, অভিসম্পাত, যাদুটোনা এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপ। রামাদান বা রামাদানের বাইরে এর সব কয়টি-ই গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হয়।

মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া আপনার একটি কথা-ই হতে পারে আপনার জাহান্নামের কারণ! অতএব, সাবধান!

আল্লাহপ্রদত্ত এই বাকযন্ত্র যেমন সফলতার চাবিকাঠি, তেমনই ব্যর্থতারও প্রধান কারণ! অতএব, যে-ব্যক্তি তার জিহ্বাকে সর্বদা যিকির, ইসতিগফার, শােকর ও তাওবায় বিরত রাখবে, এই জিহ্বা তার জন্য সফলতা বয়ে আনবে। তার চক্ষু শীতল করবে। অপরদিকে যে এর অপব্যবহার করবে, মানুষকে খোঁচা মেরে কথা বলবে, নিরীহদের অন্তরে আঘাত করবে, এই জিহ্বই একদিন তার ব্যর্থতার কারণ হবে। তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে!

প্রিয় সিয়াম পালনকারী ভাই, সর্বাবস্থায় যিকির ও তিলাওয়াতরত থাকুন। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন এবং গুনাহমুক্ত জীবন গড়ুন।

আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ৬১ – ৬৫


[1] জামি তিরমিযী : ২৬১৬
[2] শুআবুল ঈমান, সুনানু বায়হাকী : ৪৫৭৮
[3] সূরা কাফ, আয়াত : ১৮
[4] সূরা হা-মীম, আয়াত : ৪৬
[5] সহীহ বুখারী : ৬৪৭৪
[6] তাবরানী : ৪৭৪৬
[7] সহীহ বুখারী : ১০
[8] সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৫৩
[9] সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

NO COMMENTS

আপনার মন্তব্য লিখুন