রামাদানের শেষ দশক: শেষ মুহূর্তে যেন থাকি গ্রোডাক্টিভিটির চূড়ায় – পর্ব ২

1
157

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

প্রােডাক্টিভ ইতিকাফ যেভাবে করা যেতে পারে: 

উত্তম পরিকল্পনার সাথে ইতিকাফের সময়টা কাজে লাগানাের মাধ্যমেই ইতিকাফকে প্রােডাক্টিভভাবে কাজে লাগানাে যেতে পারে। এখানে কিছু পরামর্শ দেয়া হল যা অনুসরণ করা যেতে পারে—

(১) ইতিকাফে কোন সময় কী আমল করবেন তার একটি খসড়া রুটিন করে ফেলুন। রুটিনে এক কাজ থেকে আরেক কাজের মাঝে ফাঁকা সময় রাখবেন। আপনার রুটিন যেন খুব বেশী কঠিন না হয়। যারা প্রথম প্রথম ইতিকাফ করতে আসেন, তাদের অনেকে খুব কঠিন রুটিন বানিয়ে নিয়ে আসেন। ফলত, শুরুতেই রুটিন অনুযায়ী আমল করতে ব্যর্থ হয়ে হতাশ হয়ে যান।

মনে রাখবেন, ইতিকাফরত অবস্থায়ও আপনি সারাক্ষণ ইবাদাত করতে পারবেন মাঝে মাঝে বিশ্রামের প্রয়ােজন হবে।

(২) অনেকে ইতিকাফে নিজের ইসলামী বইয়ের লাইব্রেরি নিয়ে চলে আসেন। তারপর একটা বইও পড়তে পারেন না। আসলে, ইতিকাফে আমাদের মূল লক্ষ্য রাখা উচিত, কুরআন তিলাওয়াত, কুরআন মুখস্থ করা, তাহাজ্জুদ আদায় করা ও অনেক অনেক দুআ করা। আমল করতে করতে ক্লান্তি চলে আসলে শুয়ে বসে পড়ার জন্য দুই-তিনটি ছােট সাইজের বই আনা যায় যা সহজে পড়া যাবে। খুব বেশী বই আনার দরকার নেই।

(৩) সবধরনের ডিজিটাল ডিভাইস, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইয়ারফোন সবকিছু বাসায় রেখে আসবেন। আপনার মনে হতে পারে যে, এই সব ডিভাইসে তাে আপনি কুরআন পড়বেন বা ইসলামী অ্যাপ চালাবেন অথবা লেকচার শুনবেন কিংবা ইসলামী বই পড়বেন। এসব চিন্তা বাদ দিন। নিজের মােবাইল ফোন বাসায়ই রেখে আসুন।

খুব বেশী প্রয়ােজন হলে ইন্টারনেট সুবিধাবিহীন বেসিক কোন মােবাইল ফোন নিয়ে আসতে পারেন। যারা খুব বেশি ব্যস্ত সময় কাটান কিংবা খুব বেশী যাদের ভাই-বন্ধু রয়েছে, তাদের তাে উচিত নিজের সিমটা বাসায় রেখে আসা। পরিবারের সাথে যােগাযােগের জন্য সবাই চিনে না এমন কোন সিম ব্যবহার করা যায়।

এভাবে করলে ইতিকাফের সময় আপনি অপ্রয়ােজনীয় বিপত্তি থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন এবং নিবিষ্টমনে ইবাদাত করতে পারবেন। আহসান আমল তথা সবচেয়ে উত্তম আমলে মনােযােগী থাকতে পারবেন।

মনে রাখবেন, যতই ইসলামী কন্টেন্ট থাকুক না কেন, স্মার্টফোন মানেই ডিসট্রাকশন। অন্তত, ইতিকাফের সময়টাতে স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকুন।

আমি স্মার্টফোন, ই-বুক রিডার ইত্যাদি স্মার্ট ডিভাইস সাথে নিয়ে যেমন ইতিকাফ করেছি; তেমনি শুধুমাত্র একটি বেসিক ফোনে নতুন সিম নিয়েও ইতিকাফ করেছি। আপন অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি, ইতিকাফে স্মার্ট ডিভাইস রাখলে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রােডাক্টিভ থাকতে পারবেন। আল্লাহর সাথে একান্তে সম্পর্ক স্থাপন করা সহজতর হবে।

(৪)  ইতিকাফে কী কী করতে চান তার টার্গেট সেট করুন।

কয়েকটি সূরা মুখস্থ করার টার্গেট নিতে পারেন। তারপর ইতিকাফের প্রত্যেক দিন অনুযায়ী সেই টার্গেট ভাগ করে নিতে পারেন। খুব বেশী বড় টার্গেট না নিয়ে মাঝারি ধরনের টার্গেট নিতে পারেন। যাতে আপনি সফল হতে পারেন।

যেমন, আপনি হয়ত টার্গেট নিলেন যে, ইতিকাফে আপনি সূরা মূলক আর সূরা নূহ মুখস্থ করবেন। দুই সূরা মিলিয়ে প্রায় ৬০ আয়াত। তাই আপনি প্রতিদিন মিনিমাম ৬ আয়াত মুখস্থ করার টার্গেট নিতে পারেন। দুআ মুখস্থ করার টার্গেট নিতে পারেন৷ হিসনুল মুসলিম বা অন্য কোন দুআর বই থেকে যেসব দুআ মুখস্থ করার নিয়ত করেছেন তা দাগিয়ে রাখতে পারেন আগেভাগেই।

আমলের কিছু টার্গেট রাখতে পারেন। যেমন, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা। ইশরাকের সালাত আদায় করা। প্রতি সালাতের আগে মিসওয়াক করা। সকাল সন্ধ্যার যিকির করা। আযানের জবাব দেয়া। প্রতিদিন ১৫ মিনিট দুআ করা। প্রতিদিন ১ ঘণ্টা তিলাওয়াত করা ইত্যাদি।

কম খাওয়ার কিংবা কম কথা বা হাসাহাসি করার টার্গেট রাখতে পারেন। মনে রাখবেন, এগুলােই আপনার ইতিকাফের প্রাপ্তি। ইতিকাফের পর এগুলােই আপনি সাথে নিয়ে যাবেন। তাই, এসব আমলের প্রােডাক্টিভ অভ্যাস করার প্রতি মনােযােগ দিন।

(৫) শুধু টার্গেট সেট করলেই হবে না। একটি ডায়েরি ও কলম সাথে রাখুন। তারপর প্রতিদিন আপনার টার্গেট অনুযায়ী কী কী করতে পেরেছেন তা ডায়েরিতে নােট করে রাখবেন।

(৬) অনেকেই ইতিকাফে এসে দীর্ঘ আড্ডা, হাসি-তামাশায় মত্ত হয়ে যায়। এগুলাে থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আবার অনেক ইতিকাফকারী অবান্তর ইলমি আলােচনায় সময় নষ্ট করেন। যেমন, মাযহাবগত ক্যাচাল। এসব আলােচনা থেকে অতি সতর্কতার সাথে নিজেকে বাঁচিয়ে উঠে যাবেন। যদি অন্য ইতিকাফকারীর সাথে দ্বীনি আলােচনা করতেই হয়, তাহলে রিয়াদুস সালেহীন বা সহীহ বুখারির মত কোন বই নিয়ে যেতে পারেন। তাদের সাথে বিভিন্ন আমলের ফজিলত বিষয়ক হাদীস একসাথে বসে পড়তে পারেন।

(৭) ইতিকাফে আপনি আপনার আরামের জীবন থেকে বেরিয়ে এসে একটু কষ্টের মধ্যে দিন কাটাবেন। তাই মেজাজ বিগড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন। অন্য ইতিকাফকারীদের সাথে সদয় আচরণ করবেন। কেউ দুর্ব্যবহার করলে মাফ করে দিবেন। পারলে অন্য ইতিকাফকারীদের খেদমত করার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আপনার লক্ষ্য।

(৮) অনেকে রামাদানের প্রত্যেক রাতেই দুই তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেন। কিন্তু যদি আপনি বয়সে যুবক হয়ে থাকেন, ইতিকাফের রাত্রিগুলােতে না ঘুমানােই উত্তম। এই শেষ দশকের রাতগুলােতে জেগে থেকে ইবাদাতে লিপ্ত হন। কয়েক ধরনের ইবাদাতের পরিকল্পনা মাথায় রাখুন। এক আমলে ক্লান্তি আসলে অন্য আমল করলেন। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে ক্লান্তি চলে আসলে কুরআন মুখস্থ করলেন নতুবা কুরআন তিলাওয়াত করলেন। তা না হলে দুআ মুখস্থ করলেন। অথবা, শুয়ে শুয়ে কোন ইসলামি বই পড়লেন। এভাবে কয়েক ধরনের আমলের পরিকল্পনা রাখলে দীর্ঘ রাত্রি ইবাদাত করে কাটানাে সহজ হবে।

(৯) খাবারের ব্যাপারে সতর্ক হবেন। ইতিকাফে হাঁটাচলা অল্প হয়। তাই হজমে সমস্যা হয় এমন খাদ্য না খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

(১০) প্রতি রাতে সাদাকা করার জন্য কিছু টাকা হাতে রাখুন। আপনি যদি একশত টাকার দশটি নােট হাতে রাখেন আর প্রতি রাতেই মাসজিদের দানবাক্সে একটি করে নােট দিতে থাকেন, তাহলে তাে আপনি নিশ্চিত জানবেন যে অন্তত কাদরের রাত যে রাতেই হােক না কেন, সে রাতে আপনি কিছু টাকা মাসজিদে দান করতে পেরেছেন। মাসজিদে ইফতারের আগে অনেক ফকির মিসকিন আসেন। তারাবীহর পরেও আসেন। তাদেরকেও দান করতে পারেন।

(১১) ইতিকাফের জন্য নিচের খসড়া রুটিন অনুসরণ করতে পারেন। ইশরাক এর সালাত পড়ে ঘুমাতে যাবেন। ঘুম থেকে উঠে দুই-চার রাকাত নফল সালাত পড়বেন। তারপর যুহরের আগে পর্যন্ত কুরআন মুখস্থ করবেন। যুহরের সালাতের পরে হয় কুরআন মুখস্থ কিংবা তিলাওয়াত করলেন। ইচ্ছা হলে হাল্কা ঘুমাতে পারেন।

আসরের পর সন্ধ্যার সমস্ত যিকির আযকার শেষ করে ফেলবেন। আযকারগুলাে মুখস্থ না থাকলে হিসনুল মুসলিম দেখে দেখে মুখস্থ করা যেতে পারে। ইফতার আর ইশার সালাতের সময়টা কোন আমলের টার্গেট না রেখে বিশ্রাম করতে পারেন।

রাতে তারাবিহর পর একা একা তিলাওয়াত করার মিনিমাম একটা সময় নির্ধারণ করে নিবেন যে, রাতে অতটুকু সময় তিলাওয়াত করবেনই। কুরআন সারাদিনে যতটুকু মুখস্থ হল তা রিভাইস করে অন্য কোন মু’তাকিফকে ( যারা ইতিকাফ করেন তাদেরকে মুতাকিফ বলে ) পড়া দেয়াও এই সময়ে করা যেতে পারে। রাত দেড়টা থেকে সাধারণত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে পারেন। সালাতে কোয়ালিটির দিকে নজর দিন। প্রতি সিজদাতে আল্লাহর সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন।

অতঃপর শেষরাতে মন খুলে আল্লাহর নিকট দুআ করতে থাকুন। তারপর সাহরি খাওয়ার পর ফজরের জামাতের জন্য প্রস্তুত হােন এবং একান্তে কোথাও বসে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করার মাধ্যমে রাত সমাপ্ত করুন। ফজরের সালাতের পর সকালের যিকর করতে ভুলবেন না। তারপর সূর্যোদয়ের আগে পর্যন্ত কুরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। সূর্যোদয়ের ১৫-২০ মিনিট পর অন্তত ২-৪ রাকাত ইশরাকের নফল সালাত আদায় করে ঘুমাতে পারলে তাে খুবই ভালাে হয়।

যারা ইতিকাফ করবেন না, তারা কীভাবে রামাদানের শেষ দশকে প্রােডাক্টিভআমন করবেন?

অনেকেই পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণে হয়ত ইতিকাফ করতে পারবেন না। তারাও ইতিকাফকারীদের জন্য উপরে বর্ণিত কাজগুলাে যথাসম্ভব অনুসরণ করার চেষ্টা করতে পারেন। তাদের জন্য আরাে কিছু অতিরিক্ত পরামর্শ এখানে দেয়া হচ্ছে :—

(১) এই দশদিন সােশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বাদ দিয়ে দিন।
(২) দুনিয়াবি কাজ কমিয়ে ফেলুন।
(৩) সময় পেলেই আমল করুন। পারলে নফল ইতিকাফের নিয়ত করে মাসজিদে চলে যান। যতক্ষণ থাকলেন নফল ইতিকাফের সওয়াব হল। বেজোড় রাত্রিগুলাে যত বেশী সম্ভব মাসজিদে থাকার চেষ্টা করুন।
(৪) তা সম্ভব না হলে নিজের কক্ষে নির্জনে বসে ইবাদাত করুন।
(৫) দান খয়রাত করুন। গরীব রােজাদারদের ইফতারের ব্যবস্থা করতে পারেন। নবীজি (ﷺ) রামাদানে প্রবাহিত বাতাসের মত দান করতেন।
(৬) নিচের দুআটি বেশি বেশি পাঠ করুন৷

হে আল্লাহ! তুমিই ক্ষমাকারী। আর ক্ষমা করাকে তুমি পছন্দ করাে।

অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রামাদানে বেশি বেশি আমল করার তাউফিক যেন দান করেন। আমিন!!

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ১৬৮ – ১৭০

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন