অহংকার ও প্রবঞ্চনা মানবসত্তাকে কুফরির দিকে ঠেলে দেয়

0
70

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

বর্তমানে আমাদের মধ্যে অহংকার, প্রবঞ্চনা ও আত্মাভিমান কঠিনভাবে বাসা বেঁধেছে; কিন্তু আমরা জানি না যে, এই অহংকার ও প্রবঞ্চনা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে কুফরি পর্যন্ত পৌছে দেয়। মানুষ যে সকল কারণে কাফের হয়ে মৃত্যুবরণ করে অহংকার তার মধ্যে অন্যতম। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘যার অন্তরে অনু পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

অন্য হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছােট পিঁপড়ার আকারে উথিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।

এখানে ওমর রা.-এর খেলাফতকালে ঘটে যাওয়া অহংকার সম্পর্কে একটি অশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করছি।

আমরা এখন গাসসানের বাদশার ঘটনা অলােচনা করবাে। গাসসান জাযিরাতুল আরবের দক্ষিণে অবস্থিত একটি খৃস্টান অধ্যুষিত এলাকা। ওমর রা.-এর খেলাফতের সময় গাসসানের এক শাসক মদিনায় আগমন করলাে। লােকটি ঘােড়ার চড়ে ও অনেক লােক আর সৈন্যদের মধ্যে থেকে অহংকারের সাথে মদিনায় প্রবেশ করলাে। সে মদিনায় এসেছে ওমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। যখন সে ওমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাে তখন তার মাথায় ছিলাে স্বর্ণের মুকুট আর গায়ে ছিলাে রেশমী পােশাক। ওমর রা. তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। লােকটির নাম ছিলাে জাবালা ইবনুল আইহাম। তখন ইসলাম গ্রহণ করে সে মুসলমান হয়ে গেল। ইসলাম গ্রহণের পর ওমর রা. তাকে স্বর্ণের মুকুট আর রেশমী পােশাক খুলে ফেলতে বললেন এবং মুসলমানদের জন্যে বৈধ পােশাক পরিধান করতে বললেন।

লােকটি সেগুলাে খুলে ইসলামি পােশাক পরিধান করলাে, অতঃপর সে ওমরা পালনের ইচ্ছা করলে ওমর রা, তাকে ওমরার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিলেন এবং ইহরামের বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন। তখন সে ইহরাম পরিধান করে তালবিয়া পড়ে মক্কায় প্রবেশ করলাে; কিন্তু তার অন্তরে তখনও অহংকার ও আত্মাভিমানের কিছু অংশ বাকি ছিল।

সে মানুষের সাথে সাথে তালবিয়া পড়তে পড়তে মক্কায় আসলাে এবং কাবার চতুর্পার্শ্বে তাওয়াফ শুরু করলাে। কাবা তখন বর্তমানের মত এত বিশাল আয়তনের ছিলাে না এবং তা বহু তলা বিশিষ্টও ছিলাে না; পূর্বে কাবার ছিলাে পুরানাে একটি গৃহ এবং আয়তন ছিলাে অনেক ছােট। তখন কাবার পাশে বিভিন্নজন বিভিন্ন কিছু বিক্রি করতে অর্থাৎ কাবার পাশেই ছিলাে বাজার। জাবালা ইবনে আইহাম কাবার চতুর্পাশ্বে তাওয়াফ করতে লাগলাে। ওমর রা.ও তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তাওয়াফের সময় অসর্তকতাবশত এক বেদুইনের পা জাবালা ইবনে আইহামের চাদরের কোনায় লাগলাে। এতে জাবালা ইবনে আইহাম অনেক রেগে গেল, সে চোখ বড় বড় করে বেদুইন লােকটির দিকে তাকাল এবং আমার চাদরে পারা দিলি কেনাে একথা বলে তার চেহারার উপর জোড়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলাে। যাতে বেদুইন লােকটির চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। বেদুইন লােকটি মনে মনে বলল, আমরা এখন আল্লাহর ঘরে আল্লাহর সামনে আছি।

সুতরাং আমি কি হারামের ভিতর এই লােকটির গালে থাপ্পড় দিবাে? বেদুইন লােকটি জনতাে এখানে একজন বিচারক আছে, তাই সে তাকে কোনাে আঘাত না করে বিষয়টি বিচারকের দরবারে উপস্থাপন করার জন্যে গেল।

বেদুইন লােকটি ওমর রা.-এর নিকট গিয়ে বলল, হে ওমর! জাবালা ইবনে আইহাম আমার চেহারায় এত জোরে থাপর দিয়েছে যে, আমার চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওমর রা. তখন জাবালা ইবনে আইহামকে ডাকলেন। অতঃপর বিচার মজলিস কায়েম হল। ইসলামে বিচারের ক্ষেত্রে সবাই সমান, বড়-ছােট, ধনী-গরিব সকলেই সমান, কারাে মধ্যে কোনাে পার্থক্য নেই। এবিষয়ে এখানে আরাে একটি চমৎকার ঘটনা বলে নিচ্ছি। আলি ইবনে আবু তালেব , তখন আমিরুল মুমিনিন, খলিফাতুল মুসলিমিন। তিনি একদিন বাজারে গেলেন

এবং এক ইহুদিকে ঢাল বিক্রি করতে দেখলেন। ঢালটি দেখে আলি রা, চিনে ফেললেন যে, এটা তারই ঢাল, কোনাে এক যুদ্ধের সময় তার হাত থেকে এটা পড়ে গিয়েছিল। পরে তিনি তা আর খোঁজে পান নি। আলি রা, তখন ইহুদি লােকটিকে বললেন, মনে হচ্ছে এটা আমার ঢাল। ইহুদি বললাে, না এটা আপনার ঢাল নয়। আপনার কিনতে মনে চাইলে এটা কিনে নিতে পারেন। আলি রা. বললেন, আমি আমিরুল মুমিনিন, মিথ্যা বলা আমার জন্যে জায়েয নেই। বরং এটা আমারই ঢাল। ইহুদি বললাে, এটা আপনার ঢাল নয়। অতঃপর তারা দুজনে কাযির নিকট অভিযােগ নিয়ে গেল। হাঁ, ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সময়টা ছিলাে আলি রা.-এর খেলাফতের সময়!! তিনি তখন খলিফাতুল মুসলিমিন।

কাযির দরবারে আলি রা. গিয়ে বসে পড়লেন আর ইহুদি লােকটি তার ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কাযি বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি আপনার প্রতিপক্ষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আলি রা. তখন ইহুদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাযি তাঁকে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! বলেন আপনার অভিযােগ কী? আলি রা. বললেন, এই ঢালটি আমার ঢাল, অমুক যুদ্ধে আমার কাছ থেকে তা পড়ে গিয়েছিল। ইহুদি লােকটি বলল, না এটা আমার ঢাল, এটা আমি কিনেছি এবং আমি এখন এটা বিক্রি করতে চাই। কাযি বলল, হে আমিরুল মুমিনিন আপনার পক্ষে কোনাে সাক্ষী আছে? আলি রা, বললেন, আমার ছেলে হাসান আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। কাযি বললেন, বাবার পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য আমাদের নিকট গ্রহণযােগ্য নয়। আপনার কি অন্য কোনাে সাক্ষী আছে? তিনি বললেন, না। কাযি বললেন, তাহলে আমি ঢালটি ইহুদি লােকটিকে দেওয়ার ফায়সালা করছি। ইহুদি যখন এমন ফায়সালা দেখলাে তখন সে একবার আলি রা.-এর দিকে তাকায়, একবার কাযির দিকে তাকায়। তখন সে বললাে, এই ধর্মের বিচার এতটা ইনসাফপূর্ণ!!

কাযি আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে একজন ইহুদির পক্ষে ফায়সালা করছে!! যে কিনা বিশ্বাস করে উজাইর আল্লাহর পুত্র। আল্লাহ তাআলা দরিদ্র, আল্লাহরও ব্যর্থতা রয়েছে। সেই ইহুদির পক্ষে স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে ফায়সালা করছে!! ইহুদি এই দৃশ্য দেখে সাথে সাথে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন, এবং বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! নিন এটা আপনারই ঢাল, অমুক যুদ্ধে এটা আপনার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল, আপনি চলে যাওয়ার পর আমি তা নিয়ে নিয়েছিলাম। আলি রা. তখন বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছাে, সুতরাং আমি এটা তােমাকে হাদিয়া দিলাম, নাও এটা এখন থেকে তােমার, অতঃপর তিনি ঢালটি তাঁকে দিয়ে দিলেন।

ইসলামে বিচারের ক্ষেত্রে সকলে সমান। এখানে দূর্বলের উপর সবলের পক্ষে অন্যায়ভাবে ফায়সালা করা হয় না। এখানে সবাই সমান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘তােমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হওয়ার কারণ হল, যখন তাদের সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করতাে তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতাে। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতাে তখন তারা তার উপর দণ্ডবিধি আরােপ করতাে।’

বলছিলাম গ্রাম্য লােকটি জাবালা ইবনে আইহামের সাথে আমিরুল মুমিনিন ওমর রা.-এর সামনে দাঁড়ালাে। ওমর রা. বললেন, হে জাবালা! তুমি কেনাে তাকে থাপর দিয়েছাে? জাবালা বললাে, সে তার পা দিয়ে আমার চাদর মাড়িয়েছে। ওমর রা. তাকে বললেন, এক লােক ভুলে তােমার চাদর মাড়িয়েছে আর তুমি সকলের সামনে তাকে থাপ্পড় দিয়েছাে? এখানে তাে অন্য কোনােভাবেও তার সংশােধন করা যেতাে। এভাবে সকলেই যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বেঁধে যাবে এবং সমাজ আবার পূর্বের জাহিলিয়াতের দিকে ফিরে যাবে। পরস্পরের মাঝে রক্তারক্তি আর খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে। হে জাবালা! এখন ফয়সালা হল, এই লােকটিও ঠিক তােমাকে সেভাবেই থাপ্পড় দিবে তুমি যেভাবে তাকে থাপ্পড় দিয়েছে।

সে আমাকে থাপ্পড় দিবে অথচ আমি একজন রাজা? ওমর রা. বললেন হাঁ, তুমি রাজা হলেও সে তােমাকে থাপ্পড় দিবে। তবে ভিন্ন আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে আর তা হল তুমি এই লােকটিকে সন্তুষ্ট করে তার কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নিবে। তুমি তার হাত ধরাে, তার কপালে চুমাে খাও, অতঃপর তাকে বললা, ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর সে যদি তােমাকে ক্ষমা করে তাহলে বিষয়টি এখানেই শেষ। আর সে যদি তােমাকে ক্ষমা না করে তাহলে কিসাসই নিতে হবে। জাবলা ইবনে আইহাম বললাে, আমি আগামীকাল আসবাে, তখন সে আমার থেকে কিসাস নিবে এবং আমাকে মারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসাসের আদেশ দিতেন। এমনকি রহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকেও কিসাস নিতে বলতেন। বদরের যুদ্ধের দিন, তখনাে যুদ্ধ শুরু হয়নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের শৃঙ্খলার জন্যে মুসলমানদের কাতার সােজা করছেন। একে সামনে এগিয়ে দিচ্ছেন, ওকে পিছিয়ে দিচ্ছেন। সাওয়াদ ইবনে দাজিয়া রা. বদরের যুদ্ধে শাহাদাতের সৌভাগ্যপ্রাপ্ত সাহাবিদের একজন।

তিনি বারবার কাতারের সামনে এগিয়ে আসছিলেন। রাসুলুল্লাহ তাঁকে পিছিয়ে দিচ্ছেন আর তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে একটি লাঠি ছিল। তিনি সেটা দিয়ে সাওয়াদ রা.-এর পেটে গুতা দিয়ে বললেন, সাওয়াদ পিছনে যাও। সাওয়াদ রা. তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আমার থেকে কিসাস নাও। সে বললাে, আপনার লাঠি দিন। তিনি তাকে লাঠি দিলেন। অতঃপর সে বললাে, আপনার পেট থেকে কাপড় সরান, তাহলে আমি আপনাকে আঘাত করবাে যেমন আমাকে আঘাত করার সময় আমার পেটের উপর কাপড় ছিলাে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পেটের উপর থেকে কাপড় সরালেন আর তখন সাওয়াদ ইবনে দাজিয়া রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জড়িয়ে ধরে তার পেটের উপর চুমু খেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন সাওয়াদ! এমনটি করলে কেনাে? সাওয়াদ রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি তাে দেখতেই পাচ্ছেন যে, যুদ্ধ তাে শুরু হয়েই গেছে। তাই আমি চাইলাম সর্বশেষ আপনাকে স্পর্শ করি।

বলছিলাম জাবালা ইবনে আইহাম এটা মেনে নিতে পারছিলাে না যে, তাকে একজন গ্রাম্য লােক থাপ্পড় দিবে। তাই সে বলল, আমি আগামীকাল আসবাে। সে কি আগামীকাল এসেছিল? পরদিন ওমর রা. তাদের বিচারটা শেষ করার জন্যে জাবালার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন; কিন্তু জাবালা আসছে না, সে এর পূর্বেই বাহনে আরােহণ করে তার সাথীদের নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে শামের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছে এবং আবার তার দেশে গিয়ে খৃস্টান ধর্মে ফিরে গেছে। এবং

বলুন তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম। দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।‘ [সুরা ইখলাস: ১-৩]

এটা বলার পরিবর্তে সে বলছে খােদা তিনজন। ইসা আ. আল্লাহর পুত্র। এভাবেই খৃস্টান অবস্থাতেই সে বৃদ্ধ হয়ে গেল। এবং বৃদ্ধ বয়সে এসে সে একটি কবিতা রচনা করল

‘একটি থাপ্পরের লজ্জায় সম্ভ্রান্ত লােকটি খৃস্টান হয়ে গেল। আমার কী ক্ষতি হতাে যদি আমি ধৈর্য ধারণ করতাম?

‘আমার অহংকার ও আত্মাভিমান আমাকে শেষ করে দিল। এই অহংকারের কারণেই আমি সুস্থ চক্ষু বিক্রি করেছি অন্ধ চক্ষুর বিনিময়ে। ‘হায়! আমার মা যদি আমাকে জন্মই না দিত। হায়! আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি ওমরের কথায় ফিরে যেতাম।

‘হায়! আমি যদি শামের সাধারণ কোনাে নাগরিক হতাম। শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সম্প্রদায়ের লােকদের সাথে বসে আছি।

লােকটি এই কবিতা বারবার আবৃত্তি করতাে এবং সে একথাও বলতাে, হায়! আমি যদি খৃস্টান হওয়ার পরিবর্তে অসহায় মিসকিন হয়ে কোনাে নির্জন প্রান্তরে মেষ বা উট চড়াতাম!! অতঃপর লােকটি এভাবে খৃস্টান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলাে। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন। এই লােকটির খৃস্টান হয়ে মৃত্যবরণ করার কারণ কী? একমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনাই তাকে বেইমান করে মৃত্যুবরণ করালাে। সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নতিস্বীকার করেনি, অহংকার করে আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই মৃত্যুর সময় তার ইমান নসিব হয়নি।

অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার সমস্যা হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানুষকে হক ও সত্য গ্রহণে বাধা প্রধান করে। কত মানুষ যে রয়েছে অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে।আবার অনেক মানুষ শুধু বিনয় ও নম্রতার কারণেই হক গ্রহণ করতে পেরেছে। কত মানষকে হকের দিকে আহ্বান করা হয়েছে কিন্তু তারা হককে হক হিসেবে জানার পরও শুধুমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে।

উদাহরণস্বরূপ আবু জাহেলের কথাই বলি। আবু জাহেল ছিলাে এই উম্মতের ফেরাউন। একবার এক সাহাবি আবু জাহেলের সাথে সাক্ষাৎ করলাে। লােকটির উদ্দেশ্য ছিলাে আবু জাহেলকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। সে বলল, হে আবুল হিকাম! তােমাকে একটি প্রশ্ন করি, তুমি কি জানাে না যে, মুহাম্মাদ হকের উপরে আছে? আবু জাহেল বলল, না না সে বাতিলের উপর আছে, সে মিথ্যাবাদী সে প্রতারক। লােকটি আবার তাকে প্রশ্ন করলাে, সত্যি করে বলাে দেখি আমার সাথে মিথ্যে বলবে না। আবু জাহেল বলল, আমি জানি যে, সে সত্যের উপরই আছে আর আমরা যে মূর্তির পূজা করছি তা আমাদের কোনাে উপকার করতে পারবে না। লােকটি তখন তাকে প্রশ্ন করলাে, তাহলে তুমি সত্য দীন গ্রহণ করছাে না কেনাে? আবু জাহেল বলল, আমরা বনু মাখজুম গােত্র আর আবদে মানাফ গােত্র সর্বদা কুরাইশের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্যে প্রতিযােগিতা করেছি। তারা যদি মানুষকে খাবার খাওয়ায় তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, তারা যদি মানুষকে পানি পান করায় তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম।

অর্থাৎ আমরা প্রতিযােগিতার ঘােড়ার মত একবার এটা আগে আকেবার ওটা। এখন আবদে মানাফ গােত্রে নবি আসলে আমরা নবি কোথায় পাবাে? এটা যদি খাবার খাওয়ানাের কোনাে বিষয় হতাে তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, এটা যদি পানি পান করানাের মত কোনাে বিষয় হত তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম; কিন্তু এটাতাে পানি পান করানাে বা খাবার খাওয়ানাের মত কোনাে বিষয় না। এটা হল নবুওয়াতের বিষয়; তারা যখন বলবে, আমাদের মাঝে নবি আছে তখন আমরা নবি পাবাে কোত্থেকে?? সুতরাং এর থেকে বাঁচার উপায় একটাই, তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাকে নবি হিসেবে না মানা।

হে ভাই! একটু লক্ষ করে দেখ, অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর বংশের গৌরব তাকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখলাে, দীনে ইসলামে প্রবেশে বাধা দিল। এই অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর বংশের গৌরব যে কত মানুষকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে!! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন : আর তাকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় করাে, তখন তার পাপ তাকে অহঙ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্যে দোযখই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হল নিকৃষ্টতম ঠিকানা।‘ [সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৬]

অনেক মানুষকে অন্যের হক আদায় করার উপদেশ দেওয়া হয়; কিন্তু অহংকারবশত সে এই নসিহত গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে এবং বলে, আমাকে নিয়ে তােমাদের ভাবতে হবে না, আমার বিষয় আমিই ভাল জানি। আমার পক্ষে কি কাউকে জুলুম করা সম্ভব? তােমরা আমাকে নসিহতের উপযুক্ত নও। এই অহংকারের কারণেই কত মানুষের সাথে তার ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, তা আর কখনাে ঠিক হয় নি।

এক লােক তার স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করার কারণে তার স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমরা যখন সেই লােককে বললাম যে, আপনি স্বীকার করেন আর না করেন এখানে দোষ আপনারই। ভুল আপনিই করেছেন। সুতরাং আপনার স্ত্রীর নিকট যান এবং তার নিকট দুঃখ প্রকাশ করুন। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন। আপনার ছেলে-মেয়েরা ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত এতিমের মত জীবনযাপন করছে। আপনার স্ত্রী আপনার কাছে কোনাে ধন-সম্পদ চায় না। আপনি শুধু একবার তার সামনে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করুন, দেখবেন সে চলে আসবে। আবার সবকিছু আগের মত ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু সে বলে আমি তার সামনে দুঃখ প্রকাশ করবাে? তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমি ছােট হবাে? না এটা হতে পারে না। আমি তার সামনে গিয়ে। দুঃখ প্রকাশ করতে পারবাে না। ভাই! কোন জিনিসের কারণে সে এমনটি করলাে? এটা কি শুধুমাত্র অহংকারের কারণে হয়নি? অবশ্যই অহংকারের কারণেই সে এটা থেকে বিরত থেকেছে।

অনেক মানুষ আছে যারা ইচ্ছা করে কোনাে কারণ ছাড়াই বাম হাত দিয়ে খাবার খায়। আমরা যখন তাকে বলি, ভাই আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আপনি ডান হাত দিয়ে খাবার খান; কিন্তু সে আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কোন জিনিস তাকে সঠিক বিষয়টা বুঝা থেকে ফিরিয়ে রাখলাে? শুধু কি অহংকারের কারণেই এমনটি করেনি এবং সঠিক বিষয়টা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেনি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের সাথে বসা ছিলেন, সেখানে এক লােক বাম হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমলভাবে অত্যন্ত মেহ-সহানুভূতির সাথে তাকে বললেন, তুমি ডান হাত দিয়ে খাবার খাও। সে বলল, এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি আর কখনাে সক্ষম হবেও না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তার ডান হাত অবশ হয়ে গেছে, সে আর কখনাে তা উঠাতে পারে নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন অহংকারের কারণে সে এটা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলাে।

ভাই! একটু লক্ষ করুন, শুধুমাত্র অহংকারের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বদ দোয়া দিলেন। এই অহংকারের কারণে মানুষ ইসলাম গ্রহণ থেকে দূরে থাকে। অহংকারের কারণে অনেক মানুষ  মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। সে বলে আমি মসজিদে যাবাে? সেখানে কত নিচু প্রকৃতির লােকও সালাত পড়ে!! হাজ্জাজ ইবনে আরতারাহ একজন হাদিসের রাবি। অনেকেই তাকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলেছেন, কারণ সে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতাে না। তারা বলেন, আমরা তাকে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়ের ব্যাপারে নসিহত করতাম; কিন্তু সে বলতাে আমি মসজিদে যাবাে? অথচ সেখানে কুলিমজুররাও থাকে, আমি তাদের সাথে একসাথে সালাত আদায় করবাে।

অর্থাৎ আমি আমার সুগন্ধিযুক্ত সুন্দর পােশাক নিয়ে তাদের সাথে দাঁড়িয়ে সালাত পড়বাে? আর বর্তমানেও তাে অহংকারের কারণে কত মানুষ মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। যেমন কলেজের প্রিন্সিপাল, ভার্সিটির চ্যান্সেলর, এলাকার গভর্নর ইত্যাদি লােকেরা মসজিদে গিয়ে সালাত পড়ে না। তারা বাড়িতে ছেলে সন্তানদের নিয়ে অথবা খাদেমখুদ্দাম ও আশপাশের লােকদের নিয়ে সালাত আদায় করে। আল্লাহ তােমাকে আহ্বান করছেন। তিনি তােমাকে বলছেন তােমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। অর্থাৎ তিনি বলছেন তােমরা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়কারীদের সাথে সালাত আদায় করাে। সুতরাং হে প্রিন্সিপাল! হে চ্যান্সেলর! হে গভর্নর! আপনারা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করুন, কারণ মসজিদ বানানাে হয়েছে সালাত আদায়ের জন্যে। এজন্যে নয় যে, প্রত্যেকে নিজ নিজ গৃহে সালাতের স্থান বানাবে এবং বলবে, আমি কৃষক-শ্রমিকদের সাথে সালাত আদায় করবাে? আমি ছাত্রদের সাথে সালাত আদায় করবাে? সে এটা কেননা করল? শুধুমাত্র অহংকারের কারণে কি সে এমনটি করেনি?

হে ভাই! কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছােট পিঁপড়ার আকারে উথিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে। এবং যার অন্তরে সামান্য পরিমাণও অহংকার থাকবে সে কখনই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাকে এবং আপনাদেরকে শুধুমাত্র তার জন্যে বিনয় ও নম্র হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ৬৭ – ৭৬

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন