পালাতক সুফিয়ান সাওরি

0
51

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

তােমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করাে, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলাে মেনে চলাে, তাহলে তিনি তােমাদের দুঃখ-মুসিবতের সময় তােমাদের স্মরণ করবেন এবং তােমাদের সাহায্য করবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কে এমনই অসিয়ত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে বলেন, হে বালক! তােমাকে কিছু উপদেশ শিক্ষা দিচ্ছি, মনোযােগ দিয়ে শােনাে! তুমি আল্লাহর সকল বিধিবিধান মেনে চলবে, আল্লাহ তাআলা তােমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধিবিধানগুলাের হেফাযত করাে, আল্লাহ তাআলাকে তােমার পাশে পাবে। তােমার কোনাে কিছুর চাওয়ার থাকলে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই তা চাইবে, সাহায্য চাওয়ার প্রয়ােজন হলে একমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকটেই সাহায্য চাইবে।

মনে রেখাে, সারা দুনিয়ার সকল মানুষও যদি তােমার কোনাে উপকার করতে একত্র হয় তাহলেও তারা তােমার কোনাে উপকার করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তাআলা তােমার জন্যে যতটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু ব্যতীত। এবং তােমার কোনাে ক্ষতি করতে সারা দুনিয়ার মানুষও যদি একত্র হয় তাহলেও তারা তােমার কোনাে ক্ষতি করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তাআলা তােমার জন্যে যতটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু ব্যতীত। তাকদির লিখার কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাতাও শুকিয়ে গেছে।

অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :  ‘তুমি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করাে তাঁর সকল আদেশ নিষেধগুলাে মেনে চলাে তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তােমাকে স্মরণ করবেন এবং তােমাকে সাহায্য করবেন।

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে বলেছেন এবং তাঁর আদেশ নিষেধগুলাে মেনে চলতে বলেছেন। তাহলে আল্লাহ তাআলাও দুঃখ মুসিবতের সময় আমাদের স্মরণ করবেন এবং আমাদের সাহায্য করবেন। এখন এ বিষয়ে আমরা সুফিয়ান সাওরি রহ. -এর একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বলবাে। তিনি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করার কারণে আল্লাহ তাআলা মুসিবাতের সময় কীভাবে তাঁর সাহায্য করলেন এবং তাকে বিপদ-মুসবত থেকে উদ্ধার করলেন? সে বিষয়টি জানবাে।

সুফিয়ান সাওরির পূর্ণ নাম হল সুফিয়ান ইবনে সাইদ আস-সাওরি। তিনি বাগদাদের অনেক বড় একজন আলেম ও ইমাম। তকালীন খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর তাঁকে কাযি বা বিচারক হিসেবে নিয়ােগ দিতে চাইলেন; কিন্তু তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আমাদের সালাফগণ সর্বদাই বিচারকের পদ গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকতেন। তাঁরা এই পদ গ্রহণ করতে ভয় পেতেন যে, হয়তাে তার দ্বারা কারাে প্রতি জুলুম হয়ে যাবে আর একারণে তাকে আল্লাহ তাআলার শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘যাকে বিচারক বানানাে হল, যেনাে তাকে ছুরি বিহিন জবাই করে দেওয়া হল।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘বিচারক তিন প্রকার, দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামে যাবে আর একপ্রকার জান্নাতে যাবে।

সুতরাং সালাফগণ সর্বদা এই ভয় করতেন যে, না জানি তার নাম আবার প্রথম দুই প্রকার জাহান্নমিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। হয়তাে তিনি মানুষের প্রতি জুলুম করে ফেলবেন অথবা না জেনে কারাে ব্যাপারে কোনাে কথা বলে ফেলবেন, সঠিকভাবে তদন্ত না করেই কারাে ব্যাপারে ভুল ফায়সালা দিয়ে দিবেন। সুতরাং নিরাপদ দূরে থাকার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। আর একারণেই সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ সরাসরি বিচারকের পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।

খলিফা আবু জাফর তাঁকে ডেকে পাঠালেন। আবু জাফর ছিলাে খুবই রাগী ও একরােখা প্রকৃতির মানুষ। তার মতাে একরােখা প্রকৃতির মানুষ দ্বিতীয়টি পাওয়া দুষ্কর। তিনি সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ কে বললেন, হে সুফিয়ান! আমি তােমাকে কাযি বানাতে চাই। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আমি বিচারক হতে চাই না। খলিফা বলল, তােমাকে কাযি হতেই হবে। সুফিয়ান সাওরি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি কাযি হবাে না। খলিফা বলল, তাহলে তরবারি দিয়ে গরদান উড়িয়ে দেবাে। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, আমিরুল মুমিনিন আমাকে আগামীকাল পর্যন্ত ভাবার সুযােগ দিন। সে বললাে, ঠিক আছে তােমাকে আগামীকাল পর্যন্ত ভাবার সুযােগ দেওয়া হল; কিন্তু রাতে সুফিয়ান সাওরি রহ. শহর ছেড়ে পালিয়ে বের হয়ে গেলেন। নির্দিষ্ট কোনাে গন্তব্য নির্ধারণ করা ছাড়াই তিনি শহর থেকে বের হলেন। তার প্রথম টার্গেট হল, যে করেই হােক এখান থেকে আগে পালাতে হবে। শহর থেকে বের হয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে তারপর ঠিক করলেন যে, তিনি ইয়ামানে যাবেন। তাই তিনি ইয়ামানের দিকে রওয়ানা হলেন।

কিন্তু ইয়ামানে পৌছার পূর্বেই পথে খাবার দাবার ও টাকা পয়সা সব শেষ হয়ে গেল। পূর্বে মানুষ সফরে বের হলে খাবার পানীয়সহ সকল জিনিস  সঙ্গে নিয়ে বের হতে হতাে, কারণ কোনাে কোনাে সফরে তাদের সপ্তাহ, মাস এমননি কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতাে। গন্তব্যে পৌছার পূর্বেই যদি কখনাে তাদের খরচ শেষ হয়ে যেতাে তাহলে পথিমধ্যে কোনাে শহরে বা বাজারে কয়েক দিন কাজ করতাে, মানুষের মালামাল বহন করতাে বা কারাে বাগানে কাজ নিতাে এবং চলার মত টাকা-পয়সা হলে আবার বাকি পথ সফর করতাে। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহর যখন পথখরচ শেষ হয়ে গেল, তিনি এক লােকের আঙ্গুর বাগানে কাজ নিলেন। এদিকে খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বিরাট পুরস্কার ঘােষণা করেছে। অন্যদিকে সুফিয়ান সাওরি রহ. একটি বাগানে কাজ নিয়েছেন; কিন্তু বাগানের মালিক জানে না যে, তিনি হলেন ইমাম সুফিয়ান সাওরি।

একদিন বাগানের মালিকের নিকট মেহমান এলে, তিনি সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে বললেন, হে গােলাম! আমাদের জন্যে কিছু আঙ্গুর নিয়ে এসাে। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ আঙ্গুর নিয়ে এলেন; কিন্তু তা ছিলাে টক। মালিক বললেন, এগুলাে নয়, মিষ্টি আঙ্গুর নিয়ে এসাে। তিনি আবার গেলেন এবং ভালভাবে বাছাই করে আঙ্গুর নিয়ে এলেন; কিন্তু এগুলােও ছিলাে টক। মালিক তখন তাকে বলল, তুমি কি টক আর মিষ্টির মধ্যে পার্থক্য করতেও জান না?

– আমি জানি না যে, বাগানের কোন আঙ্গুর টক আর কোন আঙ্গুর মিষ্টি?

– কেনাে জান না?

  • কারণ আমি কখনাে আপনার বাগানের আঙ্গুর খেয়ে দেখি নি।

– কেনাে?

– আপনি তাে আমাকে আঙ্গুর খাওয়ার অনুমতি দেন নি তাই। আপনার অনুমতি ব্যতীত যদি একটি আঙ্গুরও আমি খাই তাহলে এর জন্যে আল্লাহ তাআলা আমার কাছ থেকে হিসেব নিবেন।

মালিক বলল, তুমি এসব করেছে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে; আল্লাহর শপথ, তাহলে তাে তুমি সুফিয়ান সাওরির মত হয়ে যাবে। ইনিই যে সুফিয়ান সাওরি তা লােকটি জানে না। সুফিয়ান সাওরি রহ. যখন থেকে এই বাগানে কাজ নিয়েছেন, তখন থেকে তিনি সময় মত বাগানে এসে নির্ধারিত কাজ শেষ করে নিজের থাকার ঘরে চলে যেতেন। এছাড়া কখনই তিনি আঙ্গুরের একটি দানাও মুখে দিয়ে দেখেন নি, কারণ এই চুক্তি তার সাথে করা হয় নি এবং মালিক তাঁকে আঙ্গুর খাওয়ার অনুমতিও দেন নি। তাই তিনি নফসকে তা থেকে বিরত রেখেছেন।

এদিকে বাগানের মালিক বাজারে চলে গেল। বাজারে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন ধরনের মানুষ এসে থাকে। লােকটি সাথীদের সাথে কথা বলছিল, কথার এক ফাকে সে বলল, আল্লাহর শপথ আজ আমার এবং আমার বাগানের কাজের লােকটির সাথে এমন এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন সেখানে থাকা একজন বলল, আপনার কাজের লােকের চেহারা বা আকৃতির বর্ণনা কি আপনার মনে আছে? সে বললাে, হাঁ, তার চেহারার আকৃতি এমন এমন। চেহারার বর্ণনা শুনে লােকটি বলল, এটাতাে সুফিয়ান সাওরির আকৃতির বর্ণনা। অবশ্যই আমরা তাকে গ্রেফতার করে খলিফার নিকট নিয়ে যাবাে এবং তার কাছ থেকে ঘােষিত পুরস্কার গ্রহণ করবাে; কিন্তু তারা যখন সুফিয়ান সাওরিকে ধরার জন্যে আসলাে ততক্ষণে তিনি ইয়ামানের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছেন। তিনি ইয়ামানে প্রবেশ করে একটা সম্মানজনক কাজের সন্ধানে বাজারে গেলেন। যেমন লােকজনের মাল বহন করা, দোকানের কর্মচারী হওয়া, শ্রমিক হয়ে মজুর খাটা ইত্যাদি সম্মানজনক কাজ। শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম যদিও কল্যাণ উভয়ের মধ্যেই থাকে। মুমিন তাে এই হাদিস জানে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তােমাদের কেউ যদি রশি দিয়ে কাঠের বােঝা বেঁধে পিঠে বহন করে তা বিক্রি করে আর এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার অভাব দূর করেন এটা কারাে কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। মানুষের কাছে হাত পাতলে হয়তাে মানুষ কিছু দেয় অথবা মুখ ফিরিয়ে না করে দেয়। 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন লােক এলাে এবং বলল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি দরিদ্র, আমার কিছু নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তােমার বাড়িতে যা আছে তাই নিয়ে এসাে। লােকটি বাড়ি থেকে এক জোড়া জুতা নিয়ে এলাে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তা বিক্রির আদেশ দিলেন; কিন্তু সে তা বিক্রি করতে পারলাে না। তাই রাসুলুল্লাহ বললেন, কে আছাে যে, এই জুতা ক্রয় করবে? তখন এক সাহাবি তা দুই দেরহাম দিয়ে ক্রয় করলাে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লােকটিকে দুই দিরহাম দিয়ে বললেন, এখান থেকে এক দেরহাম দিয়ে একটি কুড়াল ও রশি ক্রয় করাে এবং অন্য দেরহাম দিয়ে তােমার সন্তানের জন্যে খাবার ক্রয় করাে।

লােকটি কুড়াল ও রশি কিনে আনল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যাও অমুক জায়গা থেকে কাঠ কেটে আনাে। লােকটি সেখানে গিয়ে কাঠ কাটলাে অতঃপর রশি দিয়ে বেঁধে কাঁধে করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে এলাে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কে আছাে যে, এই কাঠ কিনবে? তিনি তা এক দেরহামের বিনিময় বিক্রি করে লােকটিকে দিলেন এবং বললেন, এখন তােমার পুঁজি আছে এবং রশি ও কুড়াল আছে সুতরাং প্রতিদিন এভাবে নিজের জন্যে উপার্জন করবে।

কিন্তু দুঃজনক বিষয় হল, আমাদের মধ্যে অনেক মানুষ পূর্ণ শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজে কাজ না করে অন্যের কাছে হাত পাতে ও নিজেকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অপদস্থ করে। চমকার একটা ঘটনা বলছি, ঘটনাটি আমার এক বন্ধুর সাথে ঘটেছে। আমার এক সাথী রাতে হােটেলে গিয়েছিলাে খাবার খেতে। সেখান থেকে বের হয়ে সে যখন গাড়ির কাছে আসে তখন এক লােক এসে তার সামনে হাত পেতে বললাে, আমাকে দুইটা রিয়াল দিন, আমি রাতের খাবার খাবাে। লােকটি ছিলাে পূর্ণ সুস্থ। তখন আমার সাথীটি তাকে বললাে, তুমি ভাল মানুষ, কাজ করারও সামর্থ্য রাখ, তাহলে কাজ না করে মানুষের কাছে হাত পাতছাে কেনাে? লােকটি বলল, ভাই আমাকে কেউ কাজ দেয় না, আমি কোনাে কাজ খুঁজে পাই না।

আপনি আমাকে দুইটা রিয়াল দিন, আমি রাতের খাবার খবাে। আমার সাথী বলেন, আমি তখন গাড়ির ভেতর থেকে একটা ছিড়া তেনা ও বালতি বের করে লােকটিকে বললাম, এই নাও তেনা ও বালতি ওখান থেকে পানি এনে আমার গাড়িটা মুছে দাও, দুই-তিন রিয়াল নয় আমি তােমাকে পনের রিয়াল দিবাে। তখন লােকটি বললাে, ভাই আমি আপনার কাছে কাজ চাইনি বরং আমি আপনার কাছে কিছু টাকা সদকা চাচ্ছি। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! তুমি সামান্য একটু কাজ করে শরীরের ঘাম ঝড়িয়ে পনের রিয়াল ইনকাম করবে, এটা তােমার কাছে পছন্দ হচ্ছে না। অথচ তেনাও আমার বালতিও আমার আর ওখানে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত পানি রয়েছে তুমি শুধু একটু পরিশ্রম করে আমার গাড়িটা মুছবে আর পনের রিয়াল ইনকান করবে। এটা কি লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়ে হাত পাতার চেয়ে উত্তম নয়? তুমি যখন মানুষের কাছে হাত পাতাে তখন কেউ তােমাকে কিছু দেয় আবার কেউ অপমান করে ফিরিয়ে দেয়। তখন লােকটি আমার তেনা আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে একদিকে চলে গেল।

সুফিয়ান সাওরি রহ. জানতেন উপার্জনের জন্যে কাজ করা অপমানের কিছু নয়। বরং এটা অন্যের উপর নির্ভশীল হওয়া থেকে উত্তম। এর মাধ্যমে মানুষের শরীরের মান নষ্ট হয় না বরং তা আল্লাহ তাআলা হেফাযত করবেন এবং এর বিনিময়ে প্রতিদান দিবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করতে করতে মারা গেলে কিয়ামতের দিন তার চেহারার গােশতে কোনাে পানি থাকবে।  সুতরাং সুফিয়ান সাওরি রহ. অন্যান্য মানুষের মত বাজারে প্রবেশ করলেন এবং কারাে দয়া নয় বরং নিজের জন্যে একটা কাজ খুঁজলেন; কিন্তু অপরিচিত হওয়ার কারণে কিছু মানুষ তার উপর চোরের অপবাদ দিল। তিনি বললেন, হে লােকেরা আল্লাহর শপথ করে বলছি আমি চোর নই, আমি চুরি করি না; কিন্তু লােকেরা বললাে, না বরং তুমি চোর। এভাবে কিছুক্ষণ বিতর্কের পর লােকেরা তাঁকে ইয়ামানের আমিরের নিকট নিয়ে গেল। 

ইয়ামানে তখন খলিফা আবু জাফর আল মানসুরের নিয়ােগকৃত গভর্নর দায়িত্ব পালন করছিল। আর সুফিয়ান সাওরি রহ. খলিফা আবু জাফরের পালতক একজন আসামী। তাকে যখন গভর্ণরের সামনে নিয়ে যাওয়া হল, গভর্নর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন ইনি চোর হতে পারেন না, কারণ তার চেহারার মধ্যে সম্রান্ত লােকের প্রতিচ্ছবি ভাসছিল। তাকে দেখেই মনে হচ্ছিল তিনি একজন বড় আলেম হবেন। গভর্নরকে অনেক চোর বাটপারের বিচার করতে হয়, সুতরাং তিনি চেহারা দেখেই বলতে পারেন কে চোর আর কে ভাল মানুষ?তিনি সুফিয়ান সাওরির চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন ইনি চোর নন বরং ইনি একজন বড় আলেম হবেন। সুতরাং ইয়ামানের গভর্নর বিষয়টি যাচাই করাতে চাইলেন, তাই তিনি উপস্থিত লােকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তােমরা সকলে বের হয়ে যাও আমি তার সাথে একাকী কথা বলবাে। অতঃপর সকলে যখন বের হয়ে গেল, তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন তুমি কে?

– আমি আবদুল্লাহ, বললেন সুফিয়ান সাওরি।

– তােমার নাম কী?

– আবদুল্লাহ।

-আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছি তােমার প্রকৃত নাম বল।

– সুফিয়ান।

– কার ছেলে?

– আবদুল্লাহর ছেলে।

– আমি তােমাকে আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছি তুমি তােমার নাম এবং তােমার বাবার নাম বলাে।

-সুফিয়ান ইবনে সাইদ।

– আস-সাওরি? 

– হা আস-সাওরি।

-তুমিই কি সুফিয়ান ইবনে সাইদ আস-সাওরি?

-হাঁ আমিই সুফিয়ান ইবনে সাইদ আস-সাওরি।

-তুমি কি আমিরুল মুমিনিনের পালাতক অপরাধী?

-হা আমিই সেই।

-তােমাকে ধরার জন্যেই কি খলিফা পুরস্কার ঘােষণা করেছেন?

-হা আমাকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে পুরস্কার ঘােষণা করা হয়েছে।

অতঃপর গভর্নর কিছুক্ষণ চুপ রইলেন, মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর মাথা উঠিয়ে বললেন, হে সুফিয়ান! তুমি ইয়ামানের যেখানে পছন্দ হয় সেখানেই থাকতে পারাে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি যদি আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে থাকো আর তােমাকে যদি দেখা যায় হলে আমি আমার পা-ও উঠাবাে না।

সুতরাং তুমি যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করাে, তার সকল আদেশ-নিষেধগুলাে মেনে চলাে, তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তােমাকে স্মরণ করবেন এবং তােমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি সুস্থতার সময় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তিনি অসুস্থতার সময় তোমাকে স্মরণ করবেন, তােমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি স্বচ্ছলতার সময় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তিনি তােমার দরিদ্রতার সময় তােমাকে স্মরণ করবেন, তােমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি শক্তি-সামর্থ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তিনি তােমার দুর্বলতার সময় তােমাকে স্মরণ করবেন, তােমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি স্বাধীন থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তিনি তােমার বন্দি থাকা অবস্থায় তােমাকে স্মরণ করবেন, তােমাকে সাহায্য করবেন।

তুমি যদি সম্মানিত ও ক্ষমতাবান থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তিনি তােমার ক্ষমতা চলে গেলে তােমাকে স্মরণ করবেন, তােমাকে সাহায্য করবেন। অর্থাৎ তুমি যদি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করাে, তার সকল আদেশ-নিষেধগুলাে মেনে চলাে তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তােমাকে স্মরণ করবেন এবং তােমাকে সাহায্য করবেন। ইয়ামেনের গভর্নর বলল, তুমি ইয়ামানের যেখানে পছন্দ হয় সেখানেই থাকতে পারাে, আল্লাহর শপথ করে বলছি তুমি যদি আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে থাকো আর তােমাকে যদি দেখা যায় তাহলে আমি আমার পা-ও উঠাবাে না।

একবার আবু জাফর আল-মানসুর শুনতে পেল যে, সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ মক্কায় হারাম শরিফে অবস্থান করছেন। তখন ছিলাে হজের মৌসুম। আবু জাফরও হজ্জের জন্যে মক্কায় আসছিল। সে একথা শুনার সাথে সাথে এক দল সৈন্যকে এই নির্দেশ দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিল যে, তােমরা সুফিয়ান সাওরিকে হারাম থেকেই গ্রেফতার করবে। গ্রেফতার করে তাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে, আমি এসে নিজে তাকে হত্যা করবাে। আবু জাফরের প্রেরিত সৈন্যরা হারামে এসে ঘােষণা করতে লাগল যে, তােমাদের মধ্যে কে আছে, আমাদেরকে সুফিয়ান সাওরিকে চিনিয়ে দিতে পারবে? এবং সুফিয়ান সাওরির কাছে নিয়ে যেতে পারবে? তােমাদের মধ্যে কে আছে, আমাদেরকে সুফিয়ান সাওরিকে চিনিয়ে দিতে পারবে? এবং সুফিয়ান সাওরির কাছে নিয়ে যেতে পারবে? খলিফা আবু জাফর পথে আছেন, তিনি মক্কায় আসছেন।

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ তখন কাবার দিকে মুখ করে দুই হাত আসমানের দিকে তুলে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করে বললেন, “হে আমার রব! আমি আপনার কসম করে বলছি, আবু জাফর যেনাে মক্কায় পৌছতে না পারে, হে আমার রব আবু জাফর যেনাে মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে, সে আমার প্রতি জুলুম করেছে, সে মানুষের প্রতি জুলুম করেছে, হে আমার রব! আবু জাফর যেনাে মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ; ‘কিছু উষ্কখুষ্ক চুল ও ধূলােমলিন চেহারার অধিকারী লােক আছে, যাদেরকে কোনাে গুরুত্বই দেওয়া হয় না, তারা যদি আল্লাহ তাআলাকে নিয়ে কোনাে কসম করেন তাহলে আল্লাহ তাআলা তা পূর্ণ করেন। 

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আবু জাফর যেনাে মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। আর তখনই মৃত্যুর ফেরেশতা আসমান থেকে আবু জাফরের উপর নামলাে। আবু জাফর লাশ হয়ে মক্কায় প্রবেশ করল এবং হারামে তার জানাযা পড়া হল।

তুমি যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করাে, তার সকল আদেশ-নিষেধগুলাে মেনে চলাে তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তােমাকে স্মরণ করবেন এবং তােমাকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ তাআলার নিকট এই কামনা করি যে, তিনি যেনাে আমাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় তার স্মরণ করার ও তার সকল আদেশ নিষেধগুলাে মেনে চলার তাওফিক দান করেন। আল্লাহ তাআলা যেনাে আমাদেরকে এসকল ঘটনা থেকে উপদেশ গ্রহণ করার তাওফিক দান করেন। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:

নিশ্চয়ই তাঁদের ঘটনায় বুদ্ধিমানদের জন্যে রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনাে মনগড়া কথা নয়; বরং এটা হল এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁদের জন্যে হেদায়াত ও রহমতের উপকরণ। [সুরা ইউসূফ, আয়াত : ১১১]

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১৫৮ – ১৬৮

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন