আমরা যে কত নেকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!!

0
429

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর চাওয়া ও কামনার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরনের। আমাদের হাবিব, আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রা.কে জান্নাতের উঁচুস্তর কামনা করার জন্যে উৎসহিত করতেন। সাহাবাদের মধ্যে জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু স্তর অর্জনের জন্যে আগ্রহ সৃষ্টি করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাহাবায়ে কেরামের জিজ্ঞাসা ও প্রশ্নের ধরন থেকেই এটা বুঝা যায় যে, তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিষয়টাই কামনা ও পেতে চাইতেন।

উদাহরণস্বরূপ বলছি, যেমন একজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনােটি? একটু ভেবে দেখাে যে, সকল আমলই তাে পছন্দনীয়; কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় কোনােটি? তাই তাঁর প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনােটি? তিনি বলেন, সময়মতাে সালাত আদায় করা।অপর একজন এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী কে থাকবে? লক্ষ করে দেখুন, এখানে কিন্তু সে এই প্রশ্ন করে নি যে, কারাকারা আপনার নিকটবর্তী থাকবে? বরং তার প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকবর্তী কে থাকবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তােমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তীসে-ই থাকবে, যার আখলাক-আচরণ তােমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর হবে।

এক সাহাবি এক যুদ্ধের শুরুতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! বান্দার কোন আমল দেখে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন এবং তিনি হাসেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে শত্রুদের ভিতরে গিয়ে যুদ্ধ করে। চতুর্থ আরেক জন এসে প্রশ্ন করে, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে উত্তম আমল কোনােটি? অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা জান্নাতের উঁচুস্তর ও সবচেয়ে উঁচুমর্যাদা কামনা করতেন। আর একারণেই প্রতিটি কল্যাণকর কাজের বিষয়ে তারা অনেক আগ্রহী থাকতেন। এবং আমলের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে প্রতিযােগিতায় লিপ্ত হতেন। জান্নাতের উঁচু মর্যাদা নিয়ে প্রতিযােগিতাকারী সাহাবিদের মধ্যে একজন হলেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.। জানাযার নামাজ নিয়ে তার একটি চমকার ঘটনা রয়েছে, এখন আমরা এখানে সেই ঘটনাটি উল্লেখ করছি।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আবু হুরাইরা রা.কে একটি হাদিস বলতে শুনলেন। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যে ব্যক্তি জানাযার সালাত আদায় করবে তার এক কিরাত সাওয়াব হবে। (আর এক কিরাত হল উহুদ পাহারের সামান সাওয়াব) আর যে, কবর দেওয়ার আগ পর্যন্ত মাইয়েতের সাথে থাকবে, তার দুই কিরাত সাওয়াব হবে।

 আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এই হাদিস প্রথম শুনলেন, তাই তিনি আবু হুরাইরা রা.কে বললেন, ধিক তােমাকে! তুমি এটা কী বলছাে? আবু হুরাইরা রা. বললেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তােমাদেরকে তাই বলছি যা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি। অর্থাৎ যারা যারা জানাযার সালাত আদায় করবে, তার জন্যে এক কিরাত সাওয়াব হবে। আর যারা তাকে অনুসরণ করে কবর পর্যন্ত যাবে, কবর খনন করবে, তাকে গােসল করাবে, তাকে কবরে নামাবে, জানাযার খাটিয়া বহন করবে, তাকে কবর দিবে, মাইয়েতের পরিবারকে শান্তনা দিবে, তাদের জন্যে দুই কিরাত সাওয়াব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. যখন এই হাদিস প্রথমবার শুনলেন তখন তিনি এক লােককে এই হাদিস যাচাই করার জন্যে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন। আয়েশা রা. আলেমা সাহাবি, তিনি ছিলেন হাফিযুল হাদিস এবং ফকিহ। তাই আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এক লােককে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন এবং তাকে বললেন, তুমি আয়েশা রা.-এর নিকট গিয়ে এই হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাে।

লােকটি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর নিকট থেকে চলে গেল, তখন ইবনে ওমর রা. একটি পাথরের টুকরা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে লােকটির আসার অপেক্ষা করতে ছিলেন এবং ভাবতে লাগলেন, এটা কি হাদিস হিসেবে প্রমাণিত হবে না-কি হবে না। যদি এটা হাদিস হয়ে থাকে তাহলে এতগুলাে বছর আমি এই সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছি!! আমি আখেরাতের ব্যাপারে সাওয়াব অর্জনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ মনােযােগী নই। আমি যদি আখেরাতের ব্যাপারে পূর্ণ মনােযােগী হতাম! তাহলে আমি কেননা এই হাদিস জানি না? তিনি পেরেশানিতে একটি পাথর হাতে নিয়ে ঘুরাতে লাগলেন এবং লােকটি ফিরে আসা পর্যন্ত এঅবস্থায়ই ছিলেন। অতঃপর যখন লােকটি ফিরে এসে বলল, হাঁ আয়েশা রা. বলেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই হাদিস শুনেছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হাতে থাকা পাথরটি মাটিতে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, সুবহানাল্লাহ! কত সাওয়াব আমাদের থেকে ছুটে গেল!!

যেই মানুষ নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসােস করে ও সামনে যেনাে তা ছুটে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকে সেই তাে সফল মানুষ। সাইদ ইবনে আবদুল আজিজ বলতেন, আমি সর্বদাই জামাতে সালাত আদায় করার ব্যাপারে খুবই সর্তক থাকতাম। একদিন আমার জামাত ছুটেগেল, তখন আমার খুবই আফসােস হল, আমি পেরেশান হয়ে পড়লাম। অধিক আফসােস ও পেরেশানির কারণে আমি ভেঙ্গে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার এক সাথী ইবনে মারওয়ান আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিলাে,আল্লাহ তােমাকে জামাত ছুটে যাওয়ার শােক কাটিয়ে উঠার তাওফিক দান করুন। তিনি বলেন, আমার সন্তান যদি মারা যেতাে তাহলেও তাে আমাকে কতশত মানুষ শান্তনা দিতে আসতাে।অথচ আজ আমার জামাত ছুটে গেল কিন্তু…..। অর্থাৎ তাদের কাছে জামাত ছুটে যাওয়াটা সন্তান মরে যাওয়ার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ছিল। তারা এটাকে এর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ও কষ্টকর মনে করতেন। সালাফদের একজন বলেছেন,আমার একবার এশার জামাত ছুটে গেল, তখন আমি পার্শ্ববর্তী মসজিদে গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখি সেখানেও জামাত শেষ হয়ে গেছে। অতঃপর আমি অন্য পার্শ্ববর্তী মসজিদে গিয়ে দেখি এখানেও জামাত চলছে। অতঃপর আমি বাড়ি ফিরে এলাম এবং আফসােস করতে লাগলাম যে, কীভাবে আমার সাতাশটি মর্যাদাছুটে গেল!! তিনি বলেন, অবশ্যই আমি সাতাশবার সালাত আদায় করবাে।

কোনাে নেকির কাজ ছুটে যাওয়া তাদের কাছে সাধারণ কোনাে ব্যাপার ছিলাে না। তারা এটাকে কোনাে সাধারণ ব্যাপার মনে করতেন না। তাদের কেউ এরকম বলতাে না যে, একবার জামাত ছুটেছে, এটা তাে সাধারণ ব্যাপার, আমি তাে সবসময় জামাতেই সালাতআদায় করি। গতকাল জামাতের সাথে সালত পড়েছি, এর পূর্বে পড়েছি সামনেও পড়বাে। এক ওয়াক্ত জামাত ছুটেছে তাে এতে কী এমন বিশেষ ক্ষতি হয়ে গেছে? অথবা আমি এই মিসকিনকে কিছু সদকা করিনি তাে কী হয়েছে? আমি তাে ইতঃপূর্বে অনেক সদকা করেছি? না তারা কখনাে এমনটি বলেননি। বরং তাদের যখনই কোনাে নেকির কাজ ছুটে যেতাে তখনই তারা এর জন্যে অনেক আফসােস করতেন। বরং এটা তাদের কাছে নিজ সন্তান হারানাের চেয়েও বেশি কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল।

উক্ত সালাফ বলেন, অতঃপর আমি সাতাশবার সালাত আদায় করলাম। সালাত আদায় করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে গেলাম। আমি যখন ঘুমিয়ে গেলাম তখন স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটা ঘােড়ায় আরােহণ করেছি। আর আমার ঐসকল সাথীরাও ঘােড়ায় আরােহণ করেছে যারা জামাতের সাথে ইশার সালাত আদায় করেছে, অতঃপর তারা ঘােড়া ছুটাচ্ছে এবং দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমিও তাদের পিছন পিছন ঘােড়া ছুটাচ্ছি, তাদের সমানে যাওয়ার জন্যে অনেক চেষ্টা করছি; কিন্তু আমি তাদের সামনে যাবাে তাে দূরের কথা তাদেরকে ধরতেই পারছি না। তখন তাদের থেকে একজন আমার দিকে তাকিয়ে বললাে, তুমি তাে আমাদের কিছুতেই ধরতে পারবে না,কারণ আমরা তাে ইশারের নামায জামাতের সাথে আদায় করেছি।

হয়তাে অধিক পেরেশানির কারণে এই স্বপ্নটা দেখেছে, কারণ সে এই আফসােস করেকরে রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাে যে, কীভাবে আমার জামাত ছুটেগেল; কিন্তু তার এই আফসােস ও পেরেশানি ছিলাে বিশাল প্রতিদান পাওয়ার আশায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবয়ে কেরামকে উৎসাহ দিতেন তারা যেনাে বেশি বেশি সাওয়াবের আশা করে এবং নেক আমল করার ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। একারণেই সাহাবায়ে কেরাম রা. কোনাে কল্যাণ ও নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসােস করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.কে বলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর! (আবুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বয়স তখন পনের বছরেরও কম ছিলাে) তুমি অমুকের মতাে হয়াে না, সে তাে রাতে জাগ্রত হয়েও কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেনা।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. সারা বছর রােযা রাখতেন। তিনি দুই ঈদের দিন ব্যতীত আর কোনাে দিন রােযা ভাঙ্গতেন না। তিনি সারা রাত্র জাগ্রত থেকে সালাত আদায় করতেন এবং দৈনিক এক খতম করে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি মানুষকে কোনাে সময়ই দিতেন না,এমনকি নিজ পরিবারকেও কোনাে সময় দিতেন না। দিন-রাত শুধু ইবাদত-বন্দেগি করতেন। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাঁকে এর উপর উৎসাহিত করেছেন? তিনি তাঁকে সাওয়াব অর্জনের প্রতি এই আগ্রহের প্রশংসা করেছেন না-কি তিনি তার এই আগ্রহকে দমিয়ে দিয়েছেন?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবনে আমর! আমি কি তােমাকে বলবাে যে, তুমি সারা রাত জেগে সালাত আদায় করাে? তিনি বললেন, হাঁ হে আল্লাহর রাসুলুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি রাতের তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক রাত জেগে সালাত আদায় করবে। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারথেকে কিছুটা ইবাদত কমাতে চাইলেন, যাতে করে অতিরিক্ত ইবাদতের কারণে লােকটি ক্লান্ত না হয়ে পড়ে। হাঁ সাওয়াব ও নেকির কাজ ছুটে গেলে আমাদের ক্রন্দন ও আফসােস করা উচিত। যেমনটি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর ব্যাপারে ঘটেছিল। যখন হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর মায়ের মৃত্যু হল, তখন তিনি অধিক ক্রন্দন করতে লাগলেন। লােকেরা তাকে বলল, শায়খ! আপনি কাঁদছেন অথচ আপনিই তাে আমাদের ধৈর্য শিক্ষা দেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি এজন্যে কাঁদছি যে, আমার জান্নাতে যাওয়ার দুইটি পথ ছিল, আজ আমার থেকে একটি বন্ধ হয়ে গেল। আর এখন মাত্র একটি পথ বাকি আছে।

হে ভাই! সালাফগণ কোনাে নেকি ছুটে গেলে এমনই আফসােস করতেন। বলছিলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. কে বললেন, আমার কাছে বলা হয়েছে তুমি না-কি দৈনিক কুরআন খতম কর? তিনি বললেন, জি। তিনি বললেন, তুমি এমনটি করাে না বরং তুমি মাসে এক খতম তিলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তেলাওয়াত করতে পারবাে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রতি সপ্তাহে এক খতম তেলাওয়াত কর। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তেলাওয়াত করতে পারবাে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি প্রতি তিন দিনে এক খতম তেলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তেলাওয়াত করতে পারবাে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; এরচেয়ে বেশি তেলাওয়াত করতে পারবে না। যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে তেলাওয়াত করে সে কুরআন বুঝে পড়ে না। আর সিয়ামের ব্যাপারে তাকে বললেন, তুমি মাসে তিন দিন সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবাে? রাসল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রতি সােমবারে ও বৃহস্পতিবারে সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবাে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি একদিন সিয়াম পালন করে ও একদিন ভঙ্গ করবে অর্থাৎ একদিন পর পর সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবাে? তিনি বললেন, না; এর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। এটা হচ্ছে দাউদ আ.-এর সিয়াম। তিনি একদিন সিয়াম পালন করতেন এবং একদিন ভঙ্গ করতেন।

এরপর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. এভাবে আমল করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা নেক আমলের জন্যে আগ্রহী থাকতেন। তাদের একটা নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসােস করতেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. ‘কিরাতে’র হাদিস দেরিতে শুনার পর আফসােস করেছেন। তিনি যখন জানতে পারলেন,জানাযার সালাত আদায় করলে এক কিরাত এবং তাকে সমাহিত করা পর্যন্ত তার সাথে থাকলে আরাে এক কিরাত মােট দুই কিরাত সাওয়াব পাওয়া যায় তখন তিনি অধিক পেরেশান হয়ে পাথর হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। এভাবেই তাদের যখন কোনাে নেকির কাজ ছুটে যেতাে তখন তারা এর জন্যে আফসােস করতেন ও কাঁদতেন।

হজ্জের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রা.এর নিকট গিয়ে দেখেন আয়েশা রা. কাঁদছেন। তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি কাঁদছাে কেনাে? একথা শুনে তিনি আরাে বেশি করে কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসুলুল্লাহ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি এজন্যে কাঁদছাে যে, তুমি হায়েযা হওয়ার কারণে তােমার উমরাহ ছুটে গেছে? তিনি বললেন হাঁ, আমার সাথীরা হজ্জ ও উমরাহ নিয়ে ফিরে যাবে আর আমি শুধু হজ্জ নিয়ে যাব। হে ভাই! তুমি কি একবার লক্ষ করেছাে? নেকির কাজ ছুটে যাওয়ার কারণে তিনি কীভাবে কাঁদছেন যে, উম্মে সালাম রা. হজ্জ ও উমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, হাফসা রা. হজ্জ ও উমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, যায়নাব রা, হজ্জ ও উমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, তাহলে তিনি কীভাবে শুধু হজ্জ করে ফিরে যাবেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আয়েশা রা.-এর ক্রন্দন দেখলেন তখন তিনি তার ভাই আবদুর রহমান রা. কে আদেশ দিলেন তিনি যেনাে তাকে উমরাহ করিয়ে নিয়ে আসেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারাে মধ্যে ভালাে কাজের আগ্রহ দেখতেন তখন তিনি খুশি হতেন। আবদুর রহমান রা. আয়েশা রা.কে নিয়ে তাইমে গেলেন, তানইম হল সবচেয়ে কাছের মিকাত। মক্কাবাসীদের মিকাত এবং যারা দূর থেকে হজ্জ করতে আসে তাঁরা উমরার জন্যে সেখান থেকে ইহরাম বাঁধে। তাইমে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম মসজিদে আয়েশা রা., কারণ আয়েশা রা, উমরার জন্যে সেখান থেকে ইহরাম বেঁধেছেন এই কারণে এ মসজিদের নাম হয়েছে ‘মসজিদে আয়েশা রা.’। অতঃপর আয়েশা রা. তাঁর ভাই আবদুর রহমান রা.-এর সাথে তানইমে গেলেন এবং ইহরাম বাঁধলেন, অতঃপর বাইতুল্লাহয় এসে তাওয়াফ করে তালবিয়া পড়ে উমরাহ আদায় করলেন। হাঁ সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিন এভাবেই কোনাে নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসােস করতেন ও এর জন্যে ক্রন্দন করতেন।

হে ভাই! যারাই নেকির কাজ করার জন্যে দৃঢ় সংকল্প করবে এবং কোনাে নেকির কাজ ছুটে গেলে এর জন্যে আফসােস করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কল্যাণের কাজ করার তাওফিক দান করবেন। যে ব্যক্তি সালাতের আগের সুন্নত ছুটে গেলে আফসােস করে, অতঃপর ফরয সালাতের পর এর কাযা করে নেয়, সে অচিরেই জামাতের সাথে সালাত আদায় করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একবার দেখলাম

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর সালাত আদায় করছেন। ফলে আমি আশ্চর্য হলাম,কারণ সেটা হল সালাতের জন্যে নিষিদ্ধ সময়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, তখন আমি আমার এক দাসীকে বললাম, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে তাকে বলবে, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করছেন। তাহলে আপনি কীভাবে সালাত আদায় করছেন? তিনি বলেন, তিনি যদি তােমাকে ইশারা করেন তাহলে তুমি সেখান থেকে চলে আসবে? তখন দাসীটি রাসুলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বলল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! উম্মে সালাম বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি যে, আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করছেন। তাহলে আপনি কীভাবে সালাত আদায় করছেন? তখন রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইশারা করলেন এবং তিনি সালাত আদায় করতে থাকলেন। তখন সে চলে গেল। অতঃপর তিনি যখন সালাত শেষ করলেন তখন বললেন, হে উম্মে সালামা বনি কায়েসের প্রতিনিধি দল এসেছিলাে, তারা আমাকে যােহরের পরের দুই রাকাত সালাত পড়া থেকে ব্যস্ত রেখেছিলাে, তাই আমি তা এখন আদায় করলাম।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে এর উপর প্রশিক্ষণ দিতেন। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এক সাহাবি ফজরের পর নিষিদ্ধ সময়ে সালাত আদায় করছে। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন,তুমি কী করছাে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ফজরের নফল (সুন্নত) আদায় করছি, আমি তা ফজরের পূর্বে আদায় করতে পারিনি। আমার থেকে তা ছুটে গেছে। সুতরাং আমি তা এখন আদায় করছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন না বরং তাকে তা আদায়ের ব্যাপারে সমর্থন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:

‘যে সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে যাবে অথবা সালাত আদায়ের কথা ভুলে যাবে, অতঃপর যখন স্মরণ হয় তখনই যেনাে সে তা আদায় করে নেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থতা বা অন্য কেননা কারণে কিয়ামুল লাইল না করে ঘুমিয়ে থাকতেন, তিনি তা সকালে সূর্য উঠার পর আদায় করে নিতেন। যাতে এর প্রতিদান থেকে বঞ্চিত না হন।

সুতরাং আমাদের অবস্থাও যেনাে এমন হয় যে, আমাদের কোনাে নেকের কাজ ছুটে গেলে এর জন্যে আফসােস করিযে, হায়! আমি উত্তম সময়ে সালাত আদায় করতে পারলাম না, মুস্তাহাব সময়ে উমরাহ করতে পারলাম না, দোয়া কবুলের উত্তম সময় দোয়া করতে পারলাম না এবং মসজিদ নির্মাণের সুযােগটি আমি গ্রহণ করতে পারলাম না। এমন বিভিন্ন আমল ও সাওয়াবের কাজ আমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেলে আমাদের আফসােস করা উচিত এবং পরে এর অনুরূপ কাজ করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইমান ও হেদায়াত এবং প্রতিটি কল্যাণকর কাজ সময়মতাে করার তাওফিক দান করেন। এবং আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থাই থাকি তিনি আমাদেরকে তাঁর রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখেন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১৯৪ – ২০৩

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Whatsapp, Telegram, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। ইসলামি দা’ওয়াহ্‌র ৮০ টিরও বেশী উপায়! বিস্তারিত জানতে এইখানে ক্লিক করুন "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন