দৃষ্টি অবনত রাখা

0
74

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

সকল ঘটনা-দুর্ঘটনার সূচনা দৃষ্টি থেকে।
বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সূচনাও হয় তুচ্ছ স্ফুলিঙ্গ থেকে।
কত দৃষ্টি যে দ্রষ্টাকে করেছে লণ্ডভণ্ড।
ধনুকহীন তীরের ন্যায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে করে ছিন্নভিন্ন।
অন্তর কষ্ট পায়, চক্ষু শীতল হয়।
এমন আনন্দের কোনাে প্রয়ােজন নেই যা কষ্ট বয়ে বেড়ায়।

দৃষ্টি ও দৃষ্টি নিবন্ধের অনেক অবাক করা ও আশ্চর্যজনক ঘটনা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সৃষ্টি করলেন। এবং জান্নাতে তাঁর প্রশান্তির জন্যে খানা-পিনা, পােশাক-পরিচ্ছেদ, বিভিন্ন নহরসহ মনােরঞ্জনের সবকিছুই প্রস্তুত করে দিলেন।

সেখানে তােমাদের জন্যে রয়েছে তােমাদের কাঙ্ক্ষিত যত সব আর তােমরা দাবি কর সেখানে তার সবকিছুই তােমাদের জন্যে থাকছে।‘ [সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩১]

তা সত্ত্বেও আদম আ. এমন একজনের প্রয়ােজন অনুভব করছিলেন যে জান্নাতে তাকে সঙ্গ দিবে, তার সাথে কথা বলবে। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে তার সৃষ্টিজীবের মধ্য থেকে কোন জিনিসকে বেছে নিলেন? তিনি কি কোনাে পাখিকে বেছে নিলেন, যে মিষ্টি স্বরে তাঁকে গান শুনাবে? না-কি কোনাে আহ্লাদে বিড়ালকে তার সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করলেন, যার সাথে দুষ্টমি করে তিনি সময় কাটাবেন? না-কি কোনাে ঘােড়া নির্ধারণ করলেন যার উপর সওয়ার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবেন। না-কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে এর কোনােটাকেই নির্ধারণ করেননি, কারণ যেনাে আল্লাহ তাআলার আদম আ.কে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তিনি জানতেন যে, আদমের একজন নারী সঙ্গিনী প্রয়ােজন। যার দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু শীতল হবে, মন প্রশান্ত হবে, এবং আত্মা স্থীর হবে।

সুতরাং আল্লাহ তাআলা আদমের সঙ্গী হিসেবে হাওয়া আ.কে নারী হিসেবে সৃষ্টি করলেন।

সুতরাং তিনিই সে সত্তা যিনি তােমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটিমাত্র সত্তা থেকে আর তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া, যাতে করে সে। তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে।‘ [সুরা আরাফ, আয়াত : ১৮১]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হওয়া আ.কে আদম আ.-এর পাজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এবং একজনের সাথে অন্য জনের দিকে আকৃষ্ট করে দিয়েছেন। এখন আমরা কয়েকজন প্রেমিকের গল্প শুনবাে। তারা কীভাবে প্রেমে পড়ে ছিল? এবং কেনাে প্রেমে পড়ে ছিল?

বর্ণিত আছে আসমায়ি রহিমাহুল্লাহ একদিন এক শহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি সেখানে দুই/তিন দিন অবস্থান করলেন এবং শহরের আশপাশে ঘােরাঘুরি করলেন। ঘােরাফেরার সময় শহরের বাইরে একটি পাথরের উপর তার দৃষ্টি আটকে গেল, যার উপর লেখা ছিলাে-

হে প্রেমিকরা! আল্লাহর জন্যেবলাে, কোনাে যুবক প্রেমে পড়লে সে কি করবে?

তখন আসমায়ি রহিমাহুল্লাহ তার পাশে আর একটি পাথর নিয়ে তার উপর লিখলেন: সে তার আসক্তিকে দমিয়ে রাখবে এবং তার দুঃখ লুকিয়ে রাখবে। প্রেমাষ্পদের সকল বিষয়ে তৃপ্ত হবে। সে কীভাবে তার আসক্তিকে দমিয়ে রাখবে অথচ প্রেমাসক্তি তার ভিতরকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে এবং দিনদিন তার হৃদয় কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। সে যদি তার ইশক লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোনাে সমাধান না পায় তাহলে মৃত্যু ব্যতীত তার আর কোনাে সমাধান নেই। আমি শুনলাম ও মানলাম অতঃপর মরেই গেলাম। তাকে আমার সালাম পৌছে দিয়ে যে সাক্ষাতে অমত ছিল।

এটা পাথরের কাহিনী, জানি না এটা সত্য না-কি মিথ্যা। তবে মজার ও আশ্চর্যের বিষয় হল আমি দুই বছর পূর্বে একবার শামে গিয়েছিলাম। আমি তখন কয়েকজন সঙ্গীর সাথে একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম। রেস্টুরেন্টটি ছিলাে শহরের বাইরে একটি বিনােদনকেন্দ্রে। রেস্টুরেন্টটির পাশে ছিলাে একটি পাহাড়। তার উপর একটি বিশাল পাথরের গায়ে লেখা- ভালবাসার হৃদয়।

তখন আমি হােটেলের এক কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলাম। এই পাথরের উপর এটা লেখার কারণ কী? সে বলল, আমরা এই পাথরের নাম রেখেছি প্রেমিরের পাথর। আমি তাকে বললাম, তােমরা এর নাম কেনাে প্রেমিকের পাথর রেখেছাে? একথা বলে আমি পাহাড়ের উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম পাহাড়টা অনেক উঁচু। এই পাহাড়ে উঠে সেই পাথর পর্যন্ত পৌছা অনেক কষ্টকর ব্যাপার এবং পাথরের উপর সত্যিই খােদাই করে লেখা- ভালবাসার হৃদয়।

আমি তাকে বললাম, এর কারণ কী? সে বললাে, এক লােক প্রেমে পড়েছিলাে; কিন্তু সে তার প্রেমাস্পদকে পায়নি। তাই সে এই পাহাড়ের উপর এসে নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ কারণে এর নাম হয়েছে ভালবাসার হৃদয়।

জানি না সত্যিই এমন কোনাে ঘটনা ঘটেছিলাে কি-না? অথবা এটাও আর দশটা কাহিনীর মত বানানাে কোনাে কাহিনী; কিন্তু এই ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আমার এটা বুঝানাে উদ্দেশ্য যে, ইশক ও মুহাব্বত মানুষের হৃদয় নিয়ে খেলা করে। আর এই ইশকের সূচনা হয় দৃষ্টি থেকেই। অর্থাৎ মানুষ প্রথমে কারাে প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অতঃপর তার প্রেমে পড়ে।

আর এ কারণেই আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগন্তুক নারীর দিক থেকে ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। একবার হজ্জের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাহনের চড়ে মানুষের হজ্জের বিষয় পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তার পাশে একটি উটের উপর ফজল ইবনে আব্বাস রা. ছিলেন। এমন সময় খুসমি গােত্রের এক নারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললাে, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার বাবার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে; কিন্তু তিনি অতিশয় বৃদ্ধ, বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না। সুতরাং আমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করলে কি তার জন্যে তা আদায় হবে? এই নারীটি ছিলাে অত্যন্ত সুন্দরী ও পরিচ্ছন্ন। আর ফজল ইবনে আব্বাস রা. ছিলেন সুদর্শন যুবক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর চেহার এই নারীর দিক থেকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর পবিত্র হাত ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারার উপর রেখে তার চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন, যাতে সে এই নারীর দিকে দৃষ্টি দিতে না পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করার পর বললেন : আমি এক যুবক ও যুবতীকে দেখলাম, অতঃপর আমি তাদের উপর শয়তানের ধোকার ব্যাপারে নিরাপদ ছিলাম না।

এই ঘটনাটি ছিলাে হজ্জের সময়। এটা বর্তমান সময়ের কোনাে বাজারে ছিলাে না। অথবা ইন্টারনেটে কম্পিউটারের সামনে ছিলাে না, যেখানে সে নারীকে যেভাবে খুশি সেভাবে দেখতে পারে। অথবা কোনাে মােবাইলের সামনে ছিলাে না, যার মাধ্যমে ভিডিও কলে সরাসরি চেহারা দেখে কথা বলা যায়। অথবা এটা কোনাে টেলিভিসন চ্যানেলেও ছিলাে, যেখানে নারীর শরীরের আবৃত অংশের চেয়ে অনাবৃত অংশ থাকে বেশি। অথবা এটা কোনাে ভার্সিটিও ছিলাে না যেখানে নারীরা শরীরের সাথে লাগানাে টাইট পােশাক পরে আসে এবং তাদের কেউ কেউ টাইট জামা পরে মাথার উপর স্কার্ফ রেখে ভাবে যে, সে পর্দা করছে!! অথচ তারা পর্দার ধারে কাছেও নেই। বরং তা ছিলাে হজ্জের সময়, যখন মানুষ লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলছে তখন এক মহিলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফাতওয়া জানতে এসেছে। আর যুবকটিও ছিলাে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী।

তা সত্তেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মুবারক ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর গালের উপর রাখলেন এবং তার চেহারা ঐ নারীর দিক থেকে ঘুরিয়ে দিলেন। যদিও ফজল ইবনে আব্বাস রা. নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হজ্জ পালনরত অবস্থায় ছিলেন; কিন্তু শয়তান তাে খুবই ধূর্ত, শয়তান সদা ব্যস্ত, শয়তান আল্লাহ তাআলাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে : ‘সে বললাে, আপনার ইযযতের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেব।’ [সুরা ছাদ, আয়াত : ৮২]

শয়তান মানুষকে বিপথগামী করার দায়িত্ব নিয়েছে। আল্লাহ তাআলা শয়তান সম্পর্কে বলেন : এরপর আমি আসবাে তাদের সামনের দিক থেকে, পিছনের দিক থেকে, ডান দিক থেকে, এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।‘ [সুরা আরাফ, আয়াত : ১৭]

এমন স্থানে হজ্জের সময় নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন, তার মাঝে এবং হারাম দৃষ্টি নিক্ষেপের মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়ালেন। এ কারণেই নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনাে নারীর সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের চোখকে অবনত রাখল, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ইমান দান করবেন যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করতে পারবে।

হে ভাই তুমি নারীর সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকে তােমার চোখকে অবনত রাখ। হােক সেটা ইন্টারনেটে, কম্পিউটারে, মােবাইলে, টেলিভিসন চ্যানেলে অথবা বাজারে বা ভার্সিটিতে, এক কথায় সর্বাবস্থায় তুমি নারীর দিকে তাকানাে থেকে তােমার দৃষ্টি অবনত রাখ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন : ‘হে নবি আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেনাে তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্যে সবচেয়ে বড় পবিত্রতা। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা আবহিত আছেন।‘ [সুরা নূর, আয়াত : ৩০]

হাঁ, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টি অবনত রাখলে, আল্লাহ তাআলা এমন ইমান দান করবেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করতে থাকবে। সাহিত্যের বইয়ে দাসীর প্রতি এক বেদুইনের আকৃষ্ট হওয়ার একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে। মরুভূমিতে তাবু গেড়ে এক বেদুইন থাকত। তার একটি দাসী ছিল, সে তাকে প্রচণ্ড রকমের ভালবাসতাে, সর্বদা প্রেমে মত্ত থেকে তার ভালবাসায় ব্যকূল থাকত। বেদুইন লােকটি তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতাে, সেও তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতাে।

একবার তারা হাসাহাসি করছিলাে আর আঙ্গুর খাচ্ছিল, হঠাৎ একটি আঙ্গুর দাসীটির শ্বাসনালীতে আটকে গেল আর সে শ্বাস কষ্টে মারা গেল। তখন বেদুইন লােকটি প্রচণ্ড কাদতে লাগলাে আর দাসীটিকে চুমু খেতে লাগল। তার শরীর ধরে তাকে নাড়াতে লাগলাে। অথচ দাসীটি তখন মারা গিয়েছে। সে সাত দিন পর্যন্ত ঘর থেকে বের হয়নি এবং দাসীটির লাশও সেখান থেকে সরিয়ে দাফন করেনি। লাশটি তার সামনেই পড়েছিলাে আর সে তাকে ধরে কাঁদছিল। অথচ এই কয়দিনে লাশটি পচে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। সাতদিন পর আশপাশের লােকেরা এসে তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, মহিলাটি মারা গিয়েছে, তার সামনে যা আছে এটা মহিলার লাশ, এবং তা এরই মধ্যে বিকৃত হয়ে গেছে; কিন্তু অতি ইশক ও মুহাব্বতের কারণে সে তা টেরই পায়নি। ইশক ও মুহাব্বত এমন বিষয় যখন কোনাে মানুষের অন্তরে তা প্রবেশ করে এবং ইবলিস শয়তান এর উপর তাকে সাহায্য করতে থাকে তখন এটা তার বিবেক নষ্ট করে দেয় এবং তার দীন ও দুনিয়া উভয়টাই ধ্বংস করে দেয়।

অন্য আরেকটি ঘটনা, এক বেদুইন মরুভূমিতে দিনে পশু চড়াতাে আর তাবুতে রাত কাটাতাে। তার কাছে একটি দাসী ছিলাে, যাকে সে প্রচণ্ড ভালবাসতাে। সে সর্বদা তার চিন্তায় ব্যস্ত থাকত। একদিন সে দেখলাে তার এক গােলাম দাসীটির দিকে তাকিয়ে আছে। ফলে বেদুইন লােকটি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে একটি বর্শা দিয়ে আঘাত করে দাসীটিকে হত্যা করে দিল। এরপর সে তার মাথার নিকটে বসে কাঁদতে লাগল।

ভাই লক্ষ করে দেখাে, লােকটি কীভাবে ভালবাসার কারণে এক নারীকে হত্যা করে ফেলল। আর বর্তমানে অধিক ভালবাসা বা আগ্রহের কারণে একজন অপর জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। বর্তমানে শুধু যে, সুন্দরী নারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণে অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে তা নয়; বরং অনেকে শাহীন সুশ্রী-সুদর্শন বালকের দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণেও অনেক অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। আমি জেলের ভিতর নিজ চোখে দেখেছি, এইধরনের অবৈধ ইশকের কারণে বিভিন্ন জন জেলে শাস্তি ভােগ করছে।

যেমন কারাে এক বছরের, কারাে দুই বছর কারাে তিন বছর আবার কারাে এর চেয়েও বেশি। সময় জেলে বন্দি থাকার শাস্তি হয়েছে। আবার কারাে কারাে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, কারণ সে তার মতই কোনাে যুবকের সাথে। অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে, কেউ আবার কোনাে সুশ্রী বালককে অপহরণ করে তার সাথে অবৈধ-অনৈতিক কাজ করেছে, অতঃপর সে গ্রেফতার হয়েছে। (আল্লাহর পানাহ) আবার কেউ অপহরণ করার পর। অনৈতিক কাজ করে তাকে হত্যাও পর্যন্ত করেছে, অতঃপর সে। গ্রেফতার হয়েছে। সে এমন একটা জঘন্য কাজ কেনাে করল? কারণ। সে তার প্রতি কুদৃষ্টি দিয়েছে, অতঃপর তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে। পড়েছিল। সে যদি আল্লাহকে ভয় করে তার প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থাকত এবং তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গ্রহণের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করতাে তাহলে তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টাই নিরাপদ থাকত; কিন্তু…..!!

আমি এমন যুবককেও দেখেছি যে কোনাে এক যুবতীর সাথে অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে। অতঃপর তাকে ফুসলিয়ে বাইরে নিয়ে খারাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে। এরপর মেয়েটির পেটে তার সন্তান ধারণ করেছে। অতঃপর উভয় জনকে গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি করা হয়েছে আর ঐ সন্তানকে জারজ সন্তান হিসেবে ঘােষণা দেওয়া হয়েছে, কারণ তারা অবৈধভাবে মিলিত হওয়ার কারণে তাদের এই সন্তান জন্ম নিয়েছে। এই যে, এতসব ঘটনা ঘটে, এর কারণ কী? এর মূল কারণ হল প্রথমে কুদৃষ্টি। তারপর অবৈধ সম্পর্ক তারপর……..!!

পূর্বে প্রেমিক-প্রেমাস্পদের সম্পর্ক থাকত তাকানাে, দেখা আর কথা বলার মাঝে সীমাবদ্ধ; কিন্তু বর্তমানে অবস্থাটা অনেক গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বাহজাতুল মাজালিস নামক কিতাবে আন্দালুসি বলেন, পূর্বের প্রেমিক-প্রেমাস্পদের অবস্থা ছিলাে দেখা করা আর কথা বলার মাঝে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ বলা যায় পূর্বের প্রেম ছিলাে পবিত্র প্রেম। এমনকি আনতারা, আবলারাও মেয়েকে ঘর থেকে বের করে হােটেলে নিয়ে যায়নি। বরং তারা ছিলাে প্রেমিক, যদিও তাদের প্রেম ছিলাে শরিয়ত-বিরুদ্ধ কাজ; কিন্তু তা ছিলাে পরিচ্ছন-নির্মল প্রেম। তারা যার নাম দিয়েছিলাে নিষ্কাম প্রেম বা পবিত্র ভালবাসা। প্রেমিক প্রেমিকাকে নিয়ে আর প্রেমিকা প্রেমিককে নিয়ে কবিতা রচনা করতাে। বাহজাতুল মাজালিস কিতাকে উল্লেখ আছে, পূর্বে প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রেম ছিলাে তাকানাে আর কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর বর্তমানের প্রেম হল স্পর্শ করা, চুম্বন করা আর তারপর…….!! তারপর…….!!অর্থাৎ বর্তমানের প্রেম হল অশ্লীলতা আর নােংরামি। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেফাযতকরুন। বর্তমানে মােবাইলে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে, ফেসবুক টুইটারও অন্যান্য সামজিক যােগাযােগ মাধ্যমগুলাের মাধ্যমে তারা যােগাযােগ রক্ষাকরে, ছবি আদান-প্রদান করে প্রেমিক প্রেমিকারা তাদের সম্পর্ক বজায় রাখে।……

পূর্বেও শয়তান ছিলাে এবং সে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করতাে; কিন্তু তখন মানুষকে ধোকা দেওয়া, পথভ্রষ্ট করা অত সহজ ছিলনা। তখন ছেলে মেয়েদের বিপথে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তারা চাইলেই কোনাে ভ্রষ্টপথে যেতে পারতাে না, কোনাে খারাপ কাজে লিপ্ত হতে পারতাে না, কারণ তার পরিবার সর্বদা তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতাে। তার সকল গতিবিধি তারা লক্ষ করতাে। তখন তাদের হাতে মােবাইল ছিলাে না, ইন্টারনেট ছিলাে না যে, যখন তখন বাড়ির বাইরের কারাে সাথে যােগাযােগ করবে, বাড়ির নির্জনতার সুযােগে বাইরের কাউকে বাড়িতে নিয়ে আসবে; কিন্তু বর্তমানে ছেলেদের হাতে, মেয়েদের হাতে মােবাইল রয়েছে, কারাে কাছে দুইটাতিনটা পর্যন্ত মােবাইল থাকে। এর মাধ্যমে খুব সহজেই তারা কারাে সাথে খারাপ সম্পর্ক করতে পারে এবং তা স্থায়ীও রাখতে পারে। অতঃপর সামান্য সুযােগে দেখা-সক্ষাতও করতে পারে।

ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ ইউসুফ আ.-এর সাথে আযিযে মিসররের স্ত্রীর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, সুবহানাল্লাহ! যখন মহিলাটি তাকে কুপ্রস্তাব দিল তখন কীভাবে তিনি নিজেকে রক্ষা করলেন? মহিলাটি তাকে বলল, এসাে আমরা খারাপ কাজে লিপ্ত হই; কিন্তু তিনি বললেন, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি আমার প্রতিপালক, তিনি আমাকে উত্তম আশ্রয়স্থল দান করবেন। অতঃপর তিনি তার সামনে থেকে পিছন দিকে। দৌড় দিলেন আর মহিলাটি পেছন থেকে তাঁর জামা টেনে ছিড়ে ফেলল। তিনি পলায়ন করতে সক্ষম হলেন। অতঃপর নিজেকে অশ্লীল কাজ থেকে। বাঁচাতে গিয়ে কয়েক বছর জেলে বন্দি রইলেন। ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ এই ঘটনা উল্লেখের পর বলেন, এর মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকার প্রকাশ পেয়েছে।

আনুগত্য শুধু দুই রাকাত সালাত আদায় করা, নফল সিয়াম পালন করার নাম নয়; বরং আল্লাহর ভয়ে তাঁর নাফরমানির কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করাও আল্লাহ তাআলার আনগত্যের বিশেষ অংশ। বরং নির্জন মুহূর্তে যেখানে গুনাহের সুযােগ ও উপকরণ উভয়টাই থাকে তখন আল্লাহর ভয়ে নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষা করা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকার। মানুষ যখন শক্তভাবে ইসলামকে আঁকড়ে ধরবে এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে ও নযরের হেফাযত করবে তখন তার ইমান বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে আল্লাহর ইচ্ছায় গুনাহের কাজে পতিত হওয়া থেকে। বেঁচে থাকতে পারবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন : হে নবি! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেনাে তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্যে সবচেয়ে বড় পবিত্রতা। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা আবহিত আছেন।‘ [সুরা নূর, আয়াত : ৩০]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘ইমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেনাে তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে।‘ [সুরা নূর, আয়াত : ৩১]

দ্বিতীয় বিষয়টি হল প্রতিটি মানুষকেই ফিতনার স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। যে বাজারে, যে মার্কেটে বেপর্দা নারীদের বেশি আনাগােনা, তুমি সে বাজার বা মার্কেটে না গিয়ে অন্য বাজার বা মার্কেটে যাও যেখানে নারীদের যাতায়াত কম। যে কলেজ বা ভার্সিটিতে মেয়ের সংখ্যা বেশি বা মেয়ের ফেতনা বেশি তুমি সেই কলেজ ভার্সিটি ত্যাগ করে অন্য কলেজে ভর্তি হও, যেখানে মেয়েদের ফেতনা কম। তােমার যে বন্ধু তােমাকে খারাপ কাজের দিকে নিতে চায় তাদের বন্ধুত্ব ত্যাগ করে ভাল ও ভদ্র ছেলেদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করাে। তােমার যে বান্ধবী তােমাকে খারাপ কাজের দিকে নিতে চায়, পর্দাহীনতার দিকে নিতে চায়, তাদের বন্ধুত্ব ত্যাগ করে ভাল ও পর্দাশীল মেয়েদের বান্ধবী হিসেবে গ্রহণ করাে। যারা ধ্বংসের পথে গিয়েছে তাদের প্রতি লক্ষ না করে, তাদের পথে না গিয়ে বরং যারা ভাল তারা কীভাবে ভাল হল সেই দিকে লক্ষ করাে এবং তাদের পথ অবলম্বন করাে।

আল্লাহর তাআলার আমাদেরকে এবং তােমাদেরকে পূর্ণ কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদের প্রত্যেককে গােপন ও প্রকাশ্য সকল ফেতনা থেকে হেফ্যত করুন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ৭৭ – ৮৮

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন