অনিষ্টের কারণ হয়াে না

0
55

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

আশা বিন কায়েস ছিলেন ইয়ামামার নজদ এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ লােক। সে সময় নজদ থেকে মদিনায় গম, ভুট্টা ও এজাতীয়খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হত। সেখানকার লােকেরা ব্যবসায়ী ছিল। এ কারণে লােকেরা তাদের প্রতি কিছুটামুখাপেক্ষী ছিল। তারা মক্কায়ও খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করত। মক্কা তাে ইসলামের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আরবদের কাছে হজ্জের মৌসুমে পণ্যসামগ্রী আদান-প্রদানের উৎস বলে গণ্য হত। আশা বিন কায়েস ছিলাে নিজ জাতির অন্যতম সরদার। সে ছিলাে একজন অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত কবি। তার কবিতা সর্বত্র আলােচিত হত।

যখন তার বয়স বেড়ে নব্বই ছাড়িয়ে গেল তখন সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতে পেল। সে জানতে পারল, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে পথপ্রদর্শক হয়ে এক ঐশী কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন।তারা তখন মূর্তি ও অন্যান্য বস্তুর উপাসনায় লিপ্ত ছিল। সে নিজ জাতির দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখতে পেল, তারা মূর্তির কাছে আসা-যাওয়া করে, মূর্তির চতুর্পাশে প্রদক্ষিণ করে, মূর্তিকে স্পর্শ করে, মূর্তিকে সেজদা করে এবং মূর্তির সামনে পশু উৎসর্গ করে। তারা পাথরের পূজা-অর্চনা করে, যা তাদের কোনাে ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না। তখন সে মনে মনে ইসলাম নিয়ে ভাবল। এরপর সে এই বৃদ্ধ বয়সে উটের পিটে বসে রাসুলের শানে এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মদিনার পথে রওয়ানা হল-

‘তােমার চক্ষু অন্ধকার রাতে বুজে থাকেনি। তবে তুমি অসুস্থ ব্যক্তির মত রাতযাপন করেছে।’ 

‘হে প্রার্থী! তুমি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করছাে? কারণ মদিনা ভূমিতে তােমার একটা প্রতিশ্রুত সময় রয়েছে।’

এভাবে দীর্ঘ এক কবিতা আবৃত্তি করলেন। মদিনায় পৌঁছার আগেই রাসুলের শানে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকল; কিন্তু পথিমধ্যে কোরাইশ কাফেরদের একটি দলের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটলাে। তারা বলল, আপনি কে? সে বলল, আমি আশা বিন কায়েস। তারা বলল, আশ্চর্য! আপনি কি ইয়ামামার সরদার আশা বিন কায়েস?

জাহেলি যুগে উকায ও যুলমাজাযের মত আরবদের কিছু বড় বড় বাজার ছিল যেখানে তারা সকলে সমবেত হত। সেখানে কেউ কেউ মানুষের সামনে নিজের কবিতা আবৃত্তি করত। সেখানে আবার কবিতা নিয়ে প্রতিযােগিতা চলত। বলা হত, কে আছাে, হাসসানের কবিতা আবৃত্তি করবে। কে আছাে, আশা বিন কায়েসের কবিতা আবৃত্তি করবে? এভাবে বিখ্যাত কবিদের কবিতা-আবৃত্তির আসর জমতাে।

তারা বললাে, আপনিই আশা বিন কায়েস? বলল, হ্যা। কোথায় যেতে ইচ্ছা করেছেন? আমি মদিনায় যাচ্ছি, নবির সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামে দীক্ষিত হবাে। তারা এবার তার দিকে ভাল করে তাকাল। এবং বলল, হে আ’শা! তাহলে আপনার ধর্ম, আপনার বাপ-দাদার ধর্মের কী হবে? তাদের এ কথােপকথন মরুভূমিতে উটের পিঠেই চলছিল। তার সাথে ছিলাে তার পরিবার-পরিজন ও নিজ কওমের কিছু লােক। কোরাইশ কাফেররা চাচ্ছিল না যে, আশা মদিনায় পৌছে ইসলাম কবুল করুক। আর সে চাচ্ছিল মদিনায় পৌছে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরসাক্ষাৎ লাভ করবে। কোরাইশ কাফেরদের আশঙ্কার কারণ হল, যদি আশা ইসলাম কবুল করে, তবে তাে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঝুলিতে আরাে একজন শক্তিশালী কবি যুক্ত হবে- যা হবে মহাবিপদের কারণ। আর সে হাসসানের সাথে মিলে অন্য কবিদের প্রতিহত করবে।

আর পূর্বে কবিতার অনেক প্রভাব ছিল ।এ কারণেই তাে, ওমর রা.-এর আমলে যখন যাবরকান ইবনে বদর নামক আমির মদিনায় আসল তখন সে ওমর রা.-এর কাছে নালিশ করল। হে ওমর! এই জারির কবি আমার নিন্দা জ্ঞাপন করে কবিতা বানিয়েছে। কবিতায় আমাকে মন্দ বলেছে। তখন ওমর রা. বললেন, সে তােমার ব্যাপারে কী বলেছে? সে বলল,

অর্থাৎ ‘তুমি নিজেকে কষ্ট দিয়াে না, এখানে তােমার দেখভাল, খানাপিনা করানাের লােক আছে।’

ওমর রা. বললেন, আমি মনে করি সে তােমার প্রশংসা-ই করেছে। তখন সে বলল, আপনি হাসসানকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কবিতা সম্পর্কে ভালাে জানে। ওমর রা. বললেন, হাসসান! এব্যাপারে আপনি কী বলেন? সে কি তার নিন্দা করেছে? হাসসান রা. বললেন, নিন্দা করেনি বটে; কিন্তু তাকে আবর্জনাযুক্ত করেছে। তখন ওমর রা. জারিরকে শাসন করেছিলেন। বলা হয়, ঐ আমিরকে তিনি কিছু হাদিয়া দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, মুসলমানদের প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র আমি তােমার কাছ থেকে কিনে নিব। আলেমগণ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন- জনৈক কবি শহরের আমিরের কুৎসা গেয়ে একটি কবিতা বানিয়েছিল। এতে আমির চটে গিয়ে তাকে শাস্তির নির্দেশ দিয়েছিল। তার সারা শরীরে মানুষের মল মাখিয়ে শহরের অলি-গলিতে ঘােরানাে হয়েছিল। তাকে যখন ছেড়ে দেওয়া হল, তখন সে বাড়িতে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হল। এরপর আরেকটি কবিতা আবৃত্তি করল,

‘তুমি আমার সাথে যা করলে তা পানিতে ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে যাবে; কিন্তু তােমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা ক্ষয়ে যাওয়া অস্থিতেও অবশিষ্ট থাকবে।

তাতে সে বলেছে, তুমি এখন আমাকে ময়লা মাখিয়ে শহরের অলিগলিতে ঘুরিয়েছাে, আর শিশু ও অন্যরা পিছন থেকে আমাকে নিয়ে হাসিতামাশা করেছে। আমি তাদের কাছে একধরনের অপমান অনুভব করছিলাম, কারণ সব জায়গায় লােকেরা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা সত্য যে তুমি আমাকে অপমান করেছে; কিন্তু এ অপমান কিছুদিন পর শেষ হয়ে যাবে। তুমি যা করেছ, পানি তা ধুয়ে ফেলবে; কিন্তু তােমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা মহাকাল পর্যন্ত বাকি থাকবে। তােমার সম্পর্কে আমার কবিতা আবৃত্তি হতে থাকবে- যখন তুমি থাকবে আঁধার কবরে। তােমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে লােকজন বলবে, এটা অমুকের কবর, যার সম্পর্কে কবি এমন এমন কথা বলেছেন।

এ কবিতার প্রভাব বর্তমানেও রয়েছে। কত কবিতা যে, কবিকে হত্যা করেছে?কত কবিতা যে, কবিকে অমর করেছে?কত কবিতা যে, কবিকে পদচ্যুত করেছে?কত কবিতা যে, জাতির রক্ত ঝড়িয়েছে আর মস্তক বিদীর্ণ করেছে এবংএর কারণে কত নারী যে, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে?! এখনাে আরবদের কাছে কবিতাই ডায়েরি ও নথিপত্র হিসাবে গণ্য হয়।

যাই হােক, কোরাইশ কাফেররা আশা বিন কায়েসকে দেখে বলল, এই আশা বিন কায়েস যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে ইসলাম কবুল করে তবে তাঁর কাছে শক্তিশালী দু’জন হয়ে যাবে; তাই তার ইসলাম কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাে। তারা তার কাছে অগ্রসর হয়ে বলল, হে আ’শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাে ব্যভিচার হারাম করে। যখন ইসলাম কবুল করবে তখন আর ব্যভিচারের সুযােগ পাবে না। তুমি এখন যা ইচ্ছা তা করতে পার। লাত-উযযা তােমাকে এ-কাজ করতে নিষেধ করছে না; কিন্তু তুমি ইসলাম কবুল করলে যখন-তখন ব্যভিচার করতে পারবে না। আশা বলল, আমি অতিশয় বৃদ্ধ, আমার ব্যভিচারের কোনাে ইচ্ছে নেই। আমার সামনে থেকে চলে যাও। সে অগ্রসর হতে চাইল; কিন্তু তারা তার কাছ থেকে সরল না। তারা বললাে, দেখাে আ’শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু মদ নিষিদ্ধ করে। ইসলামে দাখেল হলে তােমার জন্যে মদের বৈধতা থাকবে না। বরং তুমি মদ পান করলে তােমার উপর দণ্ডবিধি কার্যকর করা হবে। আশা বলল, আমি অতিশয় বৃদ্ধ, আর মদ বিবেক-বুদ্ধিকে খেয়ে ফেলে। যে তা পান করে সে লাঞ্ছিতও অপমানিত হয়। আর এখন আমার মদের প্রতি কোনাে আসক্তি নেই।

অবশ্য সেই জাহেলি যুগেও কিছু লােক ছিলাে যারা মদ পান করত না। সেসময়ে এক কোরাইশ লােককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলাে যে মূর্তি পূজা করত এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত দাফন করত, তুমি মদ পান করাে কেননা? সে বলেছিল, আমি দেখেছি, যে ব্যক্তি মদ পান করে সে আপন মায়ের উপর অপবাদ আরােপ করে। এবং আপন বােনের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।’ সে বলতাে, মানুষ কীভাবে নিজেই নিজের বিবেক বুদ্ধিকে নষ্ট করতে পারে? অর্থাৎ এখন পর্যন্ত আমার মস্তিস্ক ঠিকঠাক আছে। আর মদ সে বিবেক নষ্ট করে দেয়।

একারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরােপ করে বলেন,

‘যে দুনিয়াতে মদ পান করবে সে পরকালে (জান্নতে) মদপান থেকে বঞ্চিত থাকবে।

তিনি আরাে বলেন, ‘যে মদপানে অভ্যস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহর সাথে সে মূর্তিপূজারীর ন্যায় সাক্ষাৎ করবে।’

একারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। আর ওলামায়ে কেরামও মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বড় বড় গােনাহের কপ আলােচনা করতেন তখন বলতেন, আমি কি তােমাদেরকে সবচেয়ে | গােনাহের কথা বলব না, আমি কি তােমাদেরকে সবচেয়ে বড় গােনাহের কথা বলব না, আমি কি তােমাদেরকে সবচেয়ে বড় গােনাহের কথা বল না?’ সাহাবায়ে কেরাম বলতেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যাদু করা এবং শিরক করা। এবং তিনি মদ পানের কথাটিও উল্লেখ করতেন।আর মদ একারণেই বড় গােনাহ যে, মদ মানুষের আকলকে নষ্ট করে দেয়। তার দীন-ধর্মকেও নষ্ট করে দেয়। এবং কখনাে কখনাে তাব্যক্তিকে অনেক অন্যায়-অপকর্মের দিকে নিয়ে যায়। কখনাে তাকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টাউপাহাস আবার কখনাে সে পাগলের প্রলাপ করে; ফলে মানুষ তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে। এসবকিছুই ঘটে তার মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে।

যখন সেই জাহেলি যুগেও কিছু কিছু মানুষ কুফর-শিরক করেও মদ থেকে দূরে থাকত; তখন কীভাবে সে একজন মুসলিম হয়ে মদ পান করতে পারে? একারণে আল্লাহ তাআলা মদের আলােচনা করতে গিয়ে বলেন,

‘হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীরএসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলাে থেকে বেঁচে থাকো; যাতে তােমরা সফলকাম হতে পারাে।’

আল্লাহ তাআলা এখানে মদের আলােচনা মূর্তির আলােচনার সাথেই উল্লেখ করেছেন। যে মদ পান করে সে সফল হতে পারে না।

তাে, তারা তাকে বলল, হে আ’শা! দেখ, তুমি যদি ইসলাম কবুল করাে তবে তােমার জন্যে মদ হারাম হয়ে যাবে। সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমার এ বয়সে মদপানের কোনাে ইচ্ছে নেই; সেটা তাে মানুষের বিবেককে নষ্ট করে আর ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করে। আর আমি এমনিতেও মদ পান করি না; তােমরা আমাকে ছাড়াে। এ বলে রওয়ানা হতে চাইল; কিন্তু তারা তার পথ আগলে ধরে বলল, হে আ’শা! জি, বলেন; এবার তারা তার সামনে সর্বশেষ টোপটি ফেলল- যার থেকে আশা বাঁচতে। পারেনি। সর্বশেষ টোপ; যার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‘বনি আদম এক দিকে বৃদ্ধ হয় আর অপর দিকে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় নবযুবক হয়।’

সে জিনিস দুটি হচ্ছে- যার কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনি আদম এক দিকে বৃদ্ধ হতে থাকে আর অপর দিকে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় যুবক হয়ে যায়। এক. দুনিয়ার ভালবাসা; দুই. দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।অথবা বলেছেন, সম্পদের ভালবাসা আর দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।

দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ জীবন লাভের আশা করা। আর এটা কেউ তােমাকে দিতে পারবে না। আর সম্পদ, এটা মানুষ তােমাকে দিতে পারবে। তারা বলল, হে আশা! তুমি তােমার নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাও। নিজের ধর্ম ও রীতি-নীতির উপর স্থির থাক। আমরা তােমাকে একশ’ উট উপঢৌকন দিচ্ছি। এ কথা শুনে আশার মনে একটা ধাক্কা খেলাে।

সে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল এবং দেখতে পেল, একশ’ উট তার সামনে দিয়ে ঘােরাফেরা করছে। আর পূর্ব থেকেই তাদের কাছে উটের একটা বিশেষ মূল্য ছিল। বর্তমানের অবস্থার মত নয়। মানুষ তাে তখন সফর, কূপ থেকে পানি উত্তোলন, চাষাবাদ ও মহর আদায়সহ বিভিন্ন কাজে এই উটকে ব্যবহার করত।তাদের কেউ স্ত্রীকে মহর দিতে চাইলে এই উট দিয়ে মহর আদায় করত; একটি, দুইটি, দশটি বা একশটি যার যেমন সামর্থ্য হতাে। কেউ সফর করতে চাইলে উটের ব্যবস্থা করত; কেউ জমি চাষাবাদ করতে চাইলে উটের দারস্থ হত; কূপ থেকে পানি উত্তোলন করতে এই উটকেই ব্যবহার করত- উটের পিঠে কাঠ বা বাঁশ বেঁধে দিত, অতঃপর তার সাথে রশি বেঁধে রশির অপর প্রান্তে বালতি বেঁধে দিত, উট একবার সামনে, আরেকবার পিছনে যেতাে;এভাবেই তারা তা দিয়ে পানি উঠাতাে। তারা রক্তপাতের রক্তপণ বা অন্য যে কোনাে জরিমানা আদায়ে এই উটই প্রদান করত। উট যবাই করে মেহমানদের মেহমানদারি করত। উটের এই বহুবিধ উপকারের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

তারা কি উটের দিকে তাকায় না, তাকে কেমন (উপকারী) করে সৃষ্টি করা হয়েছে?‘ [সুরা গাশিয়া: ১৭]

অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

তিনি চতুষ্পদ জন্তুকে সৃষ্টি করেছেন; এতে তােমাদের জন্যেরয়েছে শীত-বস্ত্রের উপকরণ। আর এতে রয়েছে বহুবিদ উপকার এবং এর কিছু তােমরা আহার করে থাকো।‘ [সুরা নাহল: ৫]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনাে যুদ্ধাভিযানে যেতে চাইলে সাহাবায়ে কেরামকে উট অনুদান করতে বলতেন। যেমন-

উসমান রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক অভিযানের অভাবী বাহিনীকে প্রস্তুত করতে চাইলাে তখন লােকদের বললেন, তােমরা দান করাে। তখন উসমান রা. দাড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশত উট দান করলাম। এরপর আরেকজন দাড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশত উট দান করলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার দান করতে বললেন, উসমান রা. আবার বললেন, সমাগ্র ও বস্ত্রাদিপত্র একশত উট তার দান করলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উসমান আজকে যে আমল করল, এরপর সে কোনাে ভুলত্রুটি করলেতার কোনাে ক্ষতি হবে না।

মােটকথা তারা আশা বিন কায়েসকে এ জাতীয় বস্তুর মাধ্যমে প্ররােচিত করল। আর সে ছিলাে অতিশয় বৃদ্ধ; কিন্তু তার সম্পদের প্রতি খুব মহব্বত ছিল। তারা তাকে বলল, আমরা তােমাকে একশত উট দিচ্ছি, তুমি তােমার কওমে ফিরে যাও। সে বলল, একশ’ উট, তােমরা কি এখনি আমার সামনে এনে দিবে? হ্যা, এখনি এনে দিব। দাও তাহলে; তখন তারা একশত উট তার সামনে হাযির করল। আর আল্লাহ তাআলা তাে সত্যই বলেছেন,

নিঃসন্দেহে কাফের সম্প্রদায় আল্লাহর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে নিজ ধনসম্পদ ব্যয় করে। বস্তুত এখন তারা আরাে ব্যয় করবে। আর তা হবে তাদের জন্যে আক্ষেপ ও হতাশার কারণ। শেষবধি তাদের পরাজয় নিশ্চিত, আর কাফের সম্প্রদায়কে তাে জাহান্নামের তাড়িয়ে নেওয়া হবে।‘ [সুরা আনফাল: ৩৬]

লােকটি উটগুলাে নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হল। সে সামনে চলছিলাে আর উটগুলাে চলছিল তার পিছু পিছু। সে উটগুলাে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আর এ কল্পনা করছিলাে যে, যখন নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাবে তখন এত সম্পদ দিয়ে সে কী করবে? এক পর্যায়ে যখন সে নিজবসতির কাছাকাছি এলাে তখন তার উটনীটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল আর সেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সাথে সাথে মারা পড়লাে ………সে দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হল,কারণ তার কাছে এখন কোনাে উট নেই; ………….. এবং পরকালেও ক্ষতিগ্রস্ত হল,কারণ সে ইসলাম কবুল করেনি। …………. আর এটাই প্রকাশ্য প্রকৃত ক্ষতি।

এ ঘটনা বলে দিচ্ছে, কিছু মানুষ ভাল হতে চায়; কিন্তুকতক বন্ধু তার ভাল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। কিছু মেয়ে পর্দা করতে চায় এবং হারাম সম্পর্ক ছাড়তে চায় কিছু লােক তাওবা করে মদ্যপান ছাড়তে চায়, নামায শুরু করতে চায়, অন্যান্য গােনাহের কাজ পরিহার করতে চায়। এবং অশ্লীল ও বেহায়াপনার দেশে ভ্রমণ করা থেকে তাওবা করতে চায়; কিন্তু না; তার কিছু বন্ধু-বান্ধব যারা ঐ অন্যায় কাজগুলােকে তার সামনে স্বাভাবিক ও সুন্দর করে পেশ করে। তারা ভালাে এবং সত্যের ব্যাপারে তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তােলে। তারা তাকে বলে, দেখাে! তুমি যদি পর্দা। করাে তাহলে তােমাকে ভাল দেখাবে না; কলাে দেখাবে, তােমাকে আকর্ষণীয় ও চিত্তগ্রাহী মনে হবে না। তােমার বিয়ে হবে না; কুমারী থেকে যাবে। আর যুবককে বলে, দেখাে! দাড়ি রাখলে তােমাকে স্মার্ট দেখাবে; বিদঘুটে দেখাবে; মানুষ হাসবে। ভাই! আপনি দাড়ি ছাড়াই নামায রােযা করুন এবং এজাতীয় আরাে নানা কথা বলে তাকে ভালাে কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। কখনও সুদ ছেড়ে দিতে চায়, সুদী কারবার থেকে বিরত থাকতে চায়; তখন তারা অভাবের ভয় দেখায়। কোনাে যুবতী যখন নিজেকে পাক-পবিত্র রাখতে চায় তখন তারা দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং বলে, তুমি এটা না করলে দুঃখ-কষ্টে পড়বে; অনাহারে কাটাবে; সাবলম্বী হতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

আমি তােমাদের পিছনে সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সঙ্গীরা তাদের অগ্র-পশ্চাতের (খারাপ) আমল তাদের দৃষ্টিতে শােভনীয় করে দিয়েছিলাে। তাদের ব্যাপারেও শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিলাে তাদের পূর্ববর্তী জিন ও মানুষের উপর। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত।‘ [সূরা ফুসসিলাত: ২৫]

তাে আল্লাহ তাআলা এখানে বর্ণনা করছেন, তাদের কিছু সাথী-সঙ্গী আছে যারা পথভ্রষ্টতার দিকেঠেলে দেয়। সুতরাং আমরা যেনাে এমন সাথী-সঙ্গী থেকে সতর্ক থাকি যারা অন্যায় ও অনিষ্টতার হােতা। যেমন ছিলাে আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খলফ। মুসলিম নিজে অনিষ্টতার কারণ হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে, এবং এ ব্যাপারেও খুব সজাগ থাকবে যে, শয়তান যেনাে তাকে তার মত শয়তান বানাতে না পারে। ফলে সে একজন মানুষ শয়তানে পরিণত হবে। আর শয়তান যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে তাকে নিয়ে খেলা করবে। যেমন জনৈক কবি বলেছেন,

আমি তাে ইবলিসের একজন সৈনিক ছিলাম,এরপর সে আমাকে এ অবস্থায় পৌছিয়েছে। ফলে ইবলিস এখন আমার সৈন্য হয়ে গেছে।

কিছু মানুষের সাথে তাে ইবলিস লেনদেন করে। নিজের বিষয়বস্তু তার কাছে শেয়ার করে। সে বলে, আমার কোনাে কাজ আসলে আমরা মিলেমিশে তা সমাধা করে নেবাে। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেনাে আমাদের সকলকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অনিষ্টক্ষতি থেকে রক্ষা করেন এবং তাঁর ইবাদত, আনুগত্য ও হেদায়েতের উপর রাখেন; আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ২৭৫ – ২৮৪

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন