Home বিষয় ইবাদত পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন

পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন

0
9

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

এক লােক সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করলাে, সালাতের সময় কাতারের কোন পাশে দাঁড়ানাে উত্তম? প্রথম কাতারের ডান পাশে না-কি বাম পাশে? তখন সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, প্রথমে দেখাে খাবারের জন্যে রুটির যে টুকরােটা নিয়েছে তা হালাল না-কি হারাম? তুমি কাতারের যেখানেই সালাত আদায় করাে তা তােমার কোনাে ক্ষতি করবে না। তুমি সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে খুব ভালভাবে যাচাই-বাছাই করাে যে, আমি সালাত কোথায় আদায় করব? অথচ তুমি এমন একটি কাজে লিপ্ত যা তােমাকে সালাত কবুল হওয়া থেকে বিরত রাখে। যেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রা.কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

তােমরা কি জানাে প্রকৃত দরিদ্র কে? তারা বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র তাে সেই যার কোনাে দিনার বা দেরহাম নেই (অর্থ-কড়ি নেই)। তখন তিনি বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে দরিদ্র তাে সে-ই যে, কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতের সাওয়াব নিয়ে আসবে; কিন্তু সে এ-ব্যক্তিকে গলি দিয়েছে, একে প্রহার করেছে, অন্যায়ভাবে এর মাল ভক্ষণ করেছে, তখন এই লােক তার সাওয়াব থেকে নিবে, এই লােক তার সাওয়াব থেকে নিবে, অতঃপর যখন তার সওয়াব শেষ হয়ে যাবে তখন এই লােক তার অপরাধগুলাে এই লােককে দিয়ে দিবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

সুতরাং সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ লােকটিকে বলেন, তুমি প্রথম কাতারে সালাত আদায় করলে তাতে কী লাভ হবে যদি তুমি মানুষের হক নষ্ট করাে, অন্যের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করাে? সুতরাং তুমি হলাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ কর।

হালাল খাবারের ক্ষেত্রে আমাদের সালাফদের অবস্থা সম্পর্কে এখন আমরা আলােচনা করবাে। দোয়া কবুলের গােপন রহস্য হল হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করা এবং এবিষয়ে এখানে কিছু হাদিস ও ঘটনা উল্লেখ করবাে। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না এবং তিনি মুমিন বান্দাদের তাই আদেশ করেছেন যা তিনি নবিরাসুলদের আদেশ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন: হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত।‘ [সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৫১]

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র খাবারকে নেক আমলের পূর্বে এনেছেন। অর্থাৎ তােমর সালাত আদায় করা, দিনের বেলা সিয়াম পালন করা এবং রাত্রি জাগরণ করে আল্লাহর ইবাদত করা ও কুরআন। তেলাওয়াত করার পূর্বে হালাল খাবার ভক্ষণ করাে। আল্লাহ তাআলা এখানে তার রাসুলদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে রাসুলগণ! তােমরা হালাল খাবার গ্রহণ করাে। এরপর তিনি বলেছেন, এবং সৎ আমল করাে। অর্থাৎ নেক আমলের পূর্বে হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করাে, যাতে করে হারাম খাবার গ্রহণের কারণে তােমার নেক আমলগুলাে নষ্ট হয়ে যায়। একারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন: তােমরা পবিত্র বস্তু গ্রহণ কর এবং সআমল কর।

অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ধূলােমলিন চুল ও চেহারা ওয়ালা এক লােকের উপমা দিয়ে বলেন, সে আসমানের দিকে হাত তুলাে বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! তিনি বলেন, অথচ তার খানা-পিনা হারাম, তার পােশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, সে যা ভক্ষণ করে তা হারাম, তাহলে তার দোয়া কবুল হবে কীভাবে!?

আবুল মাআলি আল-জুয়াইনি, হারমাইন শারিফাইনের ইমাম, মুনাযারার ময়দানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রতিপক্ষ কখনই তাকে নিরুত্তর করতে পারতাে না। তার পিতা ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খােদাভীরু একজন মানুষ। সংসারে অভাব-অনটন আর দরিদ্রতা থাকা সত্যেও তিনি সর্বদা হালালভাবে উপার্জন করতেন এবং পরিবারের জন্যে হালাল ও পবিত্র খাবারের ব্যবস্থা করতেন। সন্তান আবুল মাআলি আল-জুয়াইনির যখন জন্ম হল তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি সর্বদা সতর্ক থাকো যে, সন্তানকে তুমি ব্যতীত অন্য কেউ যেনাে দুধ পান না করায়, কারণ আমি জানি যে, তুমি তাকে যে দুধ পান করাবে তা হালাল খাবার থেকে উৎপন্ন, কারণ আমি কেবল হালাল খাবারই তােমার জন্যে উপস্থিত করি; কিন্তু অন্যের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। সুতরাং তুমি সতর্ক থাকবে যে, তাকে যেনাে তুমি ব্যতীত অন্য কেউ দুধ পান না করায় এবং আমার সন্তান হালাল ব্যতীত কখনাে হারাম খাবার গ্রহণ না করে ।

একদিন তার এক প্রতিবেশিণী তার বাড়িতে বেড়াতে আসলাে। তখন তার স্ত্রী মেহমানদের জন্যে অন্য ঘরে খাবার আনতে গেলে সন্তান কাঁদতে শুরু করল। প্রতিবেশী মহিলাটি তখন কান্না থামানাের জন্যে তাকে কোলে নিয়ে তার দুধ পান করানাে শুরু করলাে। (তখনকার সময়ে এক মহিলা অন্য কারাে সন্তানকে স্তন্য পান করানােটা ছিলাে অতি সাধারণ ব্যাপার।) তার মা খাবার নিয়ে এসে দেখে প্রতিবেশীনি তার ছেলেকে দুধ পান করাচ্ছে, তখন দ্রুত তার কাছে থেকে তাকে কেড়ে নিল এবং তাকে এর জন্যে তিরস্কার করে বললাে, এর বাবা আমাকে এব্যাপারে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি আমার সন্তানের ব্যাপারে এটা আশ্বস্ত থাকতে চান যে, সে হালাল দুধ ব্যতীত কখনাে হারাম দুধ পান করে নি। আর এব্যাপারে তিনি আমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। আবুল মাআলি আল-জুয়াইনি। রহিমাহুল্লাহ বড় হলেন এবং অনেক বড় আলেম ও মুনাযিরে পরিণত হলেন। বর্ণিত আছে তিনি মুনাযারার সময় কথার মাঝখানে মাঝে মাঝে চুপ হয়ে যেতেন, তাঁর মুখ দিয়ে কোনাে কথা বের হতাে না। তখন তিনি বলতেন, এটা হল সেই মন্দ দুধ পানের ফল।

এই ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, হালাল খাবার মানুষের মেধা, ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলে। যেমনিভাবে সুফিয়ান সাওরি রা. ঐলােককে বলেছিলেন, যে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাে সালাতের সময় কাতারের কোন পাশে দাঁড়ানাে উত্তম? প্রথম কাতারের ডান পাশে না-কি বাম পাশে? তখন সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ তাকে বলেছিলেন, প্রথমে দেখাে খাবারের জন্যে রুটির যে টুকরােটা নিয়েছাে তা হালাল না-কি হারাম? তুমি কাতারের যেখানেই সালাত আদায় করাে তা তােমার কোনাে ক্ষতি করবে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ঘরে প্রবেশ করে বিছানার উপর একটি খেজুর পেলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। তিনি খেজুরটা মুখের কাছে নিয়ে খাবার উপক্রম হলেন অতঃপর তা না খেয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ আমার যদি এই ভয় হত যে, এটা সদকার খেজুর তাহলে আমি তা ভক্ষণ করতাম। এরপর তিনি তা সদকা করার আদেশ দেন। একবার তাঁর কাছে সদকা জমা করা হল, তখন হাসান অথবা হুসাইন রা. এসে একটি খেজুর নিয়ে মুখে দিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ কাছে এসে হাত দিয়ে তার মুখ থেকে সেই খেজুর বের করলেন এবং তাঁকে বললেন, বাখ! বাখ! তার মুখ থেকে সেই খেজুর বের করে হাত দিয়ে মুছে যথাস্থানে তা রেখে দিলেন এবং তাঁকে বললেন, তুমি কি জান না যে, এগুলাে সদকার খেজুর আর মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারের জন্যে তা হালাল নয়। এই হাদিসই প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল খাবার গ্রহণের ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন?এবং তিনি কখনই হালাল ব্যতীত হারাম খাবার গ্রহণ করেননি।

একবার সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমার জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করুন, তিনি যেনাে আমাকে মুস্তজাবুদ দাওয়া (যার দোয়া কবুল হয়) বানিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে হাত তুলে তার জন্যে এই দোয়া করে বলতে পারতেন যে, হে আল্লাহ! আপনি সা’দকে মুস্তজাবুদ দাওয়া বানিয়ে দিন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামেরকে এই শিক্ষাই দিতেন যে, কোনাে কিছুই তাদের জন্যে প্রস্তুত করে রাখা হবে না বরং কর্মের মাধ্যমে সবকিছু অর্জন করতে হবে। তাই তিনি সা’দ রা.-এর জন্যে সাথেসাথে হাত তুলে এই দোয়া করেননি যে, হে আল্লাহ! আপনি সা’দকে মুস্তজাবুদ দাওয়া বানিয়ে দিন’ বরং তিনি তাঁকে বললেন, তুমি তােমার খাবারকে পবিত্র করাে, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হয়ে যাবে’।

হে ভাই! সমস্যা দোয়ার মধ্যে না বরং সমস্যা তােমার মধ্যে। তুমি তােমার খাবারকে পবিত্র করাে তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হয়ে যাবে।

এরপর থেকে সা’দ রা. কখনই হালাল ব্যতীত কোনাে খাবার গ্রহণ করেননি। বর্ণিত আছে সা’দ রা.-এর বাড়িতে একটি বকরি ছিলাে তিনি ও তাঁর পরিবার এর দুধ পান করতেন, একদিন বকরিটি তার এক প্রতিবেশীর ক্ষেতে প্রবেশ করে। সেই ক্ষেতের মধ্যে ঘাসের সাথে গম ও গব ছাড়ানাে ছিল। বকরিটি সেখান থেকে খেয়ে পেট পুরে ঘরে ফিরল। অতঃপর সা’দ রা. এই বিষয়টি জানতে পেরে এই ভয়ে আর কখনই সেই বকরির দুধ পান করেননি যে, হয় তাে তার দুধ অনুমতি ব্যতীত প্রতিবেশীর ক্ষেত থেকে খাওয়া খাবার থেকে উৎপন্ন হয়েছে। হাঁ, সা’দ রা. ছিলেন মুস্তাজাবুদ দাওয়া।

ওমর রা. সা’দ রা. কে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। একবার ওমর রা.-এর নিকট ইরাকবাসীর পক্ষ থেকে সা’দ রা.এর ব্যাপারে অভিযােগের একটি চিঠি আসলাে; তাতে লেখাছিলাে যে, সা’দ এমন এমন। ওমর রা, তার ব্যাপারে কোনাে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে বিষয়টি যাচাই করতে চাইলেন। তিনি খবর শুনার সাথে সাথে তার ব্যাপারে কোনাে সিদ্ধান নেননি, কারণ তিনি সা’দ রা.কে চিনতেন, তার ব্যাপারে ভালভাবেই অবগত ছিলেন যে, তিনি কেমন? তাই তিনি বিষয়টি ভালভাবে যাচাই করতে চাইলেন, যেমনিভাবে সুলাইমান আ, হুদহুদ পাখির সংবাদ যাচাই করেছেন। ইরশাদ হয়েছে : “আমি এক নারীকে সাবাবাসীর উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের (মন্দ) কার্যাবলী সুশােভিত করে দিয়েছে, অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। তাই তারা সৎপথ পায় না।” [সুরা নামল, আয়াত : ২৩-২৪]

এই সংবাদ শুনে সুলাইমান আ, কী বললেন? তিনি কি সাথে সাথে একথা বললেন যে, হে আমার বাহিনী! তােমরা তারাতারি তাদের উপর আক্রমণ করাে এবং তাদের সবকিছু ধ্বংস করে দাও। বরং তিনি বলেছেন, ইরশাদ হয়েছে: সুলাইমান বললেন, এখন আমি দেখবাে তুমি সত্য বলছাে না-কি মিথ্যা বলছাে।‘ [সুরা নামল, আয়াত : ২৭]

আর এটাই হল শরয়ি বিধান যে, কোনাে সংবাদ এলে তা যাচাই করে তারপর সে ব্যাপারে কোনাে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভালভাবে যাচাই ছাড়া কোনাে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। একারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সামনে এই আয়াত তেলয়াত করতেন।

মুমিনগণ, যদি কোনাে পাপাচারী ব্যক্তি তােমাদের কাছে কোনাে সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তােমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তােমরা কোনাে সম্প্রদায়ের প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।‘ [সুরা হুজরাত, আয়াত : ৬]

সুতরাং যে কোনাে সংবাদ প্রথমে যাচাই করতে হবে। কোনাে একটা বিষয় শুনেই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

তাই ওমর রা. সা’দ রা.-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্যে ইরাকে একজন দূত প্রেরণ করলেন। দূত এসে সা’দ রা.কে সবকিছু খুলে বললাে। দূত বললাে, আমি মানুষের কাছে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবাে, সুতরাং আপনি আমার সাথে আসুন, আমরা কয়েকটি মসজিদে সালাত আদায় করাবাে এবং মানুষকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবাে। অতঃপর সে একটি মসজিদে আসলাে এবং সেখানে সালাত আদায় করলাে, মনে করুন যােহরের সালাত আদায় করলাে, সালাতের পর তিনি লােকদের উদ্দেশ্যে বললেন, হে লােক সকল! আমি তােমাদের নিকট ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পক্ষ থেকে এসেছি। তার কাছে এমন এমন সংবাদ পৌছেছে, সুতরাং তােমাদের আমিরের ব্যাপারে তােমাদের কোনাে অভিযােগ ও মন্তব্য থাকলে তা আমাকে বল। লােকজন সা’দ রা.-এর প্রশংসা করলেন, কেউ তার ব্যাপারে কোনাে অভিযােগ বা মন্তব্য করেনি। এভাবে তিনি অনেকগুলাে মসজিদে ঘুরলেন; কিন্তু কেউ সা’দ রা.-এর ব্যাপার কোনাে অভিযােগ করেনি। অতঃপর তিনি বনি আসাদের মসজিদে গেলেন এবং এই মসজিদে এমন একটি ঘটনা ঘটলাে যা সা’দ রা.কে অনেক কষ্ট দিল এবং তা তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট দুহাত তুলে দোয়া করতে বাধ্য করল।

ওমর রা.-এর দূত সা’দ রা.কে সঙ্গে নিয়ে এই মসজিদে আসলেন এবং সেখানে সালাত আদায়ের পর দাঁড়িয়ে বললেন, হে লােক সকল! আমি তােমাদের নিকট ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পক্ষ থেকে এসেছি। তার কাছে এমন এমন সংবাদ পৌছেছে, সুতরাং তােমাদের আমিরের ব্যাপারে তােমাদের কি কোনাে অভিযােগ ও মন্তব্য আছে? যদি থাকে তাহলে আমাকে তা বলাে। তখন লােকজন সা’দ রা.-এর প্রশংসা করলেন, কেউ তার ব্যাপারে খারাপ কোনাে অভিযোেগ বা মন্তব্য করলেন না। তাদের কেউ বললেন, তিনি হলেন সর্বোত্তম আমির; অপর একজন বললেন, এটা তাে আমাদের জন্যে অনেক বড় সৌভাগ্য যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবি আমাদের আমির। দূত কারাে কাছ থেকে কোনাে অভিযােগ না পেয়ে আবার বললেন, একথা ব্যতীত তােমাদের অন্য কোনাে কথা আছে কি?লােকেরা সকলে চুপ করে তার কথা শুনছিলাে, কেউ কোনাে কথা বললাে না। অতঃপর দূত যখন সেখান থেকে ফিরে আসার ইচ্ছা করলেন এবং সা’দ রা.-এর প্রশংসা ব্যতীত কারাে কোনাে মন্তব্য শুনতে পেলেন না, তখন তিনি তাদের সকলকে আবার বললেন, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তােমাদের সকলকে বলছি, একথা ব্যতীত তােমাদের অন্য কোনাে কথা আছে কি-না আমাকে বল। তখন পেছন থেকে এক লােক বললাে, আপনি যেহেতু আমাদেরকে আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছেন, সুতরাং আপনাকে সত্য বলা আমাদের জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেছে। তিনি তখন তাকে বললেন, ঠিক আছে তােমার অভিযােগ কী বল? লােকটি তখন বলল, তােমার সা’দ সমানভাবে বণ্টন করে না, সে ন্যায়বিচার করে না এবং সে জিহাদে বের হয় না। অর্থাৎ সে আমাদের মাঝে সমানভাবে বণ্টন করে না, আমাদের মাঝে ন্যয়বিচার করে না, আমাদের কেউ তার কাছে বিচার নিয়ে গেলে শত্রুতাবশত একজনের ব্যাপারে অন্যায় ফয়সালা করে। এবং সে কাপুরুষ, জিহাদে যেতে ভয় পায়, আমাদেরকে জিহাদে পাঠিয়ে সে ঘরে বসে থাকে।

এমন কথা কি সা’দ রা.-এর ব্যাপারে বলা যেতে পারে? একমাত্র সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-ই হলেন সেই সৌভাগ্যবান সাহাবি যার ব্যাপারে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘তােমার জন্যে আমার মাতা-পিতা কুরবান হােক’ তিনি বলেন হে সা’দ! তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তােমার জন্যে আমার মাতা পিতা কুরবান হােক। উহুদের যুদ্ধের দিন কিছু সাহাবির ভুলের কারণে কাফেররা যখন মুসলমানদের উপর আক্রমণ শুরু করলাে। এবং মুসলমানগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখনমাত্র কয়েকজন সাহাবি কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে তীর নিক্ষেপ করছিল, সা’দ রা, তাঁদের অন্যতম। সা’দ রা. তীর নিক্ষেপ করে করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন এবং তাকে পাহাড়ের উপর একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থলে যাওয়ার জন্যে সাহায্য করছিলেন। সা’দ রা. যখন কাফেরদের দিকে তীর নিক্ষেপ করছিলেন তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,  হে সা’দ! তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তােমার জন্যে আমার মাতা-পিতা কুরবান হােক। একমাত্র | সা’দ রা.-ই হলেন সেই সাহাবি যার ব্যাপারে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তােমার জন্যে আমার মাতা-পিতা কুরবান হােক। আর তুমি সেই সা’দের ব্যাপারে বলছাে, সে ভীরু, কাপুরুষ; যুদ্ধে বের হয় না!!

সা’দ রা. জানতেন এই লােকটি তার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলছে, সে তাঁর উপর জুলুম করছে। আর তিনি তাে হালাল খাবার গ্রহণ করতেন, সুতরাং তিনি হাত উঠালেন এবং লােকটির জন্যে দোয়া করলেন। লােকটি বলছে সা’দ রা. ইনসাফ করে না; কিন্তু দেখাে দেয়ার ক্ষেত্রেও সা’দ রা. কতটা ইনসাফ করে দোয়া করছেন!! তিনি দোয়ায় বললেন, হে আল্লাহ! যদি আপনার এই বান্দা অহংকারবশত এমনটি করে থাকে তাহলে আপনি তার হায়াতকে বৃদ্ধি করে দিন, সর্বদা তাকে দরিদ্রতার মধ্যে রাখুন এবং তাকে ফেতনায় পতিত করুন। এরপর সা’দ রা. সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন এবং বললেন, আমার মাঝে এবং তােমার মাঝে আল্লাহই যথেষ্ট হবেন, যিনি আমার সকল গােপন বিষয় জানেন এবং তােমার সকল গােপন বিষয় জানেন। তিনি আমার অতীত জানেন এবং তােমার অতীত সম্পর্কে জানেন, আর তিনিই আমার জন্যে তােমার ব্যাপারে যথেষ্ট হবেন। সা’দ রা. বলেন, আমি ইমারত (নেতৃত্ব) চাই না আর এর কিছুই চাই না। তিনি ইমারত ছেড়ে চলে গেলেন। আর তার দোয়া এই লােকের উপর লেগেই রইল, কারণ সা’দ রা.-এর ইন্তেকাল হয়ে গেল আর আল্লাহ তাআলা তাে চিরঞ্জিব, তার কোনাে মৃত্যু নেই। এই লােকটির হায়াত অনেক দীর্ঘ হল যে, সে বৃদ্ধ হতে হতে তার জ্ব ঝুলে চোখের উপর পড়ল। তার উপর কঠিন দরিদ্রতা নেমে এলাে, ফলে সে রাস্তার পাশে বসে মানুষের নিকট হাত পেতে ভিক্ষা করা শুরু করলাে। আর তার পাশ দিয়ে যখন কোনাে মহিলা অতিক্রম করতাে, তখন সে চোখ তােলে তার দিকে তাকাত, তাদেরকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতাে, তাদের সামনে দাড়িয়ে যেতাে। 

লােকেরা তখন তাকে বলতাে, তােমার কি লজ্জ নেই? এমন বুড়াে বয়সে এমন কাজ করাে। তােমার চেহারা নিয়ে কি তােমার লজ্জা হয় না? তুমি একজন বৃদ্ধ মানুষ, বয়সের ভারে চেহারা ঝুলে পড়েছে, রাস্তার পাশে। বসে মানুষের কাছে ভিক্ষা করছাে আর তােমার পাশ দিয়ে কোনাে মহিলা অতিক্রম করলে তুমি হাত বের করে তাদেরকে স্পর্শ করাে!! তােমার কি একটুও লজ্জা নেই।? যদি কোনাে যুবক এমনটি করতাে তাহলে অবশ্যই আমরা তাকে শাস্তি দিতাম; কিন্তু তােমার মত এমন একজন বৃদ্ধ একাজ কীভাবে করে? তখন সে বলত, আমি কী করবাে? আমার উপর যে, সৎ ও নেককার সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর বদদোয়া লেগেছে।

সুতরাং তুমি তােমার খাবারকে হালাল ও পবিত্র করাে, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হতে পারবে। (অর্থাৎ তােমার দোয়া কবুল করা হবে)

তােমাদের পালনকর্তা বলেন, তােমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবাে। যারা আমার এবাদতে অহঙ্কার করে তারা সত্বরই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নমে দাখিল হবে।‘ [সুরা গাফির, আয়াত : ৬০]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে দোয়া করার আদেশ দিয়েছেন। এবং তিনি আমাদের দোয়া কবুলের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তােমাদের প্রতিপালক বলেন, তােমরা আমার নিকট দোয়া কর।

আমরা যদি আপনার নিকট দোয়া করি, তাহলে এর ফলাফল কী হবে? তিনি বলেন- তাহলে আমি তা কবুল করবাে।

তাআলার রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম। হে আল্লাহ! আপনি কেনো আমাদেরকে আপনার নাম সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন? তিনি বলেন: তােমরা তাঁর (নামের) মাধ্যমে দোয়া করাে।

তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করে বল- ‘হে শ্রবণকারী! আমার দোয়া শ্রবণ করুন ও তা কবুল করুন। হে নিকটবর্তী! আমাকে আপনার নৈকট্য দান করুন। হে ক্ষমাশীল! আমাকে ক্ষমা করুন। হে শেফা দানকারী! আমাকে শেফা দান করুন। হে গােপনকারী! আমার দোষত্রুটিগুলাে গােপন করুন। হে ধনী-অমুখাপেক্ষী! আমাকে ধনাঢ্যতা দান করুন। এভাবে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা দোয়া কবুল করবেন; কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। বরং কখনাে কখনাে আমরা নিজেরাই আমাদের মাঝে এবং দোয়া কবুলের মাঝে একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখি, যে প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের দোয়া কবুল হয় না। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাটি হলহালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ না করা।

তুমি প্রবিত্র খাবার গ্রহণ কর, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তির কথা বলেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ধূলােমলিন চুল ও চেহারার, যে আসমানের দিকে হাত তুলে বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! তিনি বলেন, অথচ তার খানা-পিনা হারাম, তার পােশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, সে যা ভক্ষণ করে তা হারাম, তাহলে তার দোয়া কবুল হবে কীভাবে!? একজন হারাম কজে লিপ্ত এবং নাপাকি তথা মদ পান করে, এরপর বলে, ভাই! আমার দোয়া কবুল হয় না। হাঁ, তােমার দোয়া তাে কবুল হবেই না, কারণ তুমি তাে মদ পান করাে।

আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি মদাসক্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করলাে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সাথে মূর্তি-পূজারীর মত সাক্ষাৎ করবে।

অন্য হাদিসে তিনি বলেন: যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের পূজ ও মলমূত্র পান করাবেন। 

কখনাে কখনাে তুমি অন্যায়ভাবে মানুষের হক ভক্ষণ করাে। শ্রমিকের পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দাও না। তােমার বাড়ির অসহায় কাজের মেয়েটিকে তার প্রাপ্য ভাতা প্রদান করাে না। আর তুমি আবার অভিযােগ করে বলাে, আমার দোয়া কবুল হয় না??

গতকাল আমার কাছে একজন ফাতওয়া চেয়েছে যে, শায়খ! আমার ভাইয়ের নিকট এক কাজের মেয়ে সাত বছর ধরে কাজ করে, এই সাত বছরে সে তার কাছ থেকে বেতন গ্রহণ করে নি এবং সে ব্যক্তি বেতন তার পরিবারের নিকট পাঠাতেও রাজি নয় এবং সে তা খরচও করে নি। এখন আমার ভাইয়ের নিকট তার কি কোনাে হক আছে? সে কি আমার ভাইয়ের নিকট বেতন পাবে?

হে ভাই! এক মহিলা একটি বিড়ালকে আটকে রাখার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, তাহলে তােমার কী ধারণা আল্লাহর বান্দার উপর জুলুম করলে কী অবস্থা হবে? হে ভাই! একজন ইহুদিও যদি তােমার নিকট কাজ করে, তাহলে তােমার উপর ওয়াজিব হল তুমি তার পারিশ্রমিক ঠিক মত দিবে। তাহলে এখন অন্যদের ব্যাপারে তােমার কী ধারণা?

তুমি তােমার খাবারকে পবিত্র রাখাে; তাহলে তুমি দোয়া করলে তা কবুল হবে। আমি আমার ছেলে-মেয়েদের বলি, তােমরা মদ ও ধূমপান করা থেকে সাবধান থাকবে, কারণ এগুলাে হল নাপাকি, কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র জিনিসকে হালাল করেছেন এবং অপবিত্র জিনিসকে হারাম করেছেন। তােমরা চুরি ও মানুষের সাথে প্রতারণা থেকে সাবধান থাকবে এবং সাবধান থাকবে অন্যায়ভাবে মানুষের মাল ভক্ষণ করা থেকে।

আল্লাহ তাআলার নিকট আমার জন্যে এবং আপনাদের সকলের জন্যে প্রার্থনা করি যে, আমরা যেখানেই থাকি তিনি যেনাে আমাদের উপর রহম ও বরকত দান করেন এবং তাঁর নিকট এই প্রার্থনা করি তিনি যেনাে আমাদের পবিত্র খাবার খাওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১৬৮ – ১৮০

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

NO COMMENTS

আপনার মন্তব্য লিখুন