রামাদানের শেষ দশক: শেষ মুহূর্তে যেন থাকি গ্রোডাক্টিভিটির চূড়ায় – পর্ব ১

0
340

লেখকঃ উস্তাদ আলী হাম্মুদা, মোহাম্মাদ ফারিস| সম্পাদনা ও সংযোজনঃ মুওয়াহহিদ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

কখনাে কি দৌড় প্রতিযগিতা দেখেছেন? দীর্ঘ রেসের শেষমুহূর্তে দেখবেন সবাই গতি বাড়িয়ে দেয়। আবার পরীক্ষার হলেও দেখবেন শেষ আধা ঘণ্টা সময়ে সাধারণত কেউ কারাে দিকে তাকায় না। সবাই যত বেশি সম্ভব উত্তর খাতায় লিখতেই মনােনিবেশ করে। কিন্তু যে সম্পূর্ণ রেসে পেছনে ছিল সে সাধারণত শেষ মুহূর্তে গতি বাড়িয়েও প্রথম হতে পারে না।

রামাদান মাসের ব্যাপারও অনুরূপ। আপনি যদি সমগ্র মাস জুড়ে প্রােডাক্টিভ থাকতে না পারেন, শেষ অংশে এসে আপনি হঠাৎ করেই আমলের গতি বাড়িয়ে দিতে পারবেন না। এখানে অভ্যস্ত হওয়ার ব্যাপার আছে। মনােযােগ ধরে রাখার ব্যাপার আছে। আর তাই রামাদানের শেষ দশকে আরাে বেশি প্রােডাক্টিভ আমল করার জন্য সমগ্র রামাদান মাস জুড়ে ভাল আমল করে যেতে হবে। আর রামাদান মাস জুড়ে আমলের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে হলে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতে হবে।

কিন্তু তাই বলে কি রামাদানের শেষভাগে আমল বাড়িয়ে দিবেন না? ধরুন, আপনি রামাদানের প্রথম ২০ টি দিন তেমন কোন আমল করতে পারেন নি। কিন্তু, এখনাে রামাদান শেষ হয়ে যায়নি। লাইলাতুল ক্বাদর নামের হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রাত্রি এখনাে শেষ হয় নি। তাই, এখনই আশা হারানাের কিছু নেই।

উপরন্তু রামাদানের শেষ দশকে আটঘাট বেঁধে আমলে নেমে পড়ুন। আগের দশদিনের সব ঘাটতি পুষিয়ে দিন এই শেষ দশদিনের আমলে। আপনার সম্পূর্ণ রামাদান মাসের আমলের সবচেয়ে প্রােডাক্টিভ সময়টা যেন কাটে এই শেষ দশ দিনেই।

ইতিকাফঃ আল্লাহর ঘরে, আল্লাহর তরে

ইতিকাফ শব্দের অর্থ অবস্থান করা। দুনিয়াবি সকল কাজ থেকে অবসর হয়ে রামাদানের শেষ দশদিনে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদাত করতে থাকার প্রথাকে ইতিকাফ বলা হয়ে থাকে। রামাদান মাসে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করার জন্য, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য এবং আমলের চূড়ায় অবস্থান করে রামাদান মাসকে বিদায় জানানাের জন্য ইতিকাফ অত্যন্ত পরীক্ষিত একটি আমল। তাই আসুন, প্রথমে জেনে নেই যে, কেন ইতিকাফ করা উচিত।

ইতিকাফ করা উচিত, কারণ:

  • নবী-রাসূলগণ ও আগের নবীদের উম্মতেরাও ইতিকাফ করনে। “যখন আমিকা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলনহল ওশান্তির আলয় করলাম, আর তােমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানাের জায়গাকে সালাতের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তােমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। [1]
  • নবীজি (ﷺ) প্রত্যেক রামাদানে ইতিকাফ করতেন। উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুলাহ (ﷺ) রামাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, ইঞ্জিকাল পর্যন্ত। এরপর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন। অপর হাদিসে এসেছে, “আইশা (রা:) বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যেক রামাদানে ইতিকাফ করতেন।” [2]
  • নবীজি (ﷺ) – এর অনুসরণ করে সাহাবীগণও ইতিকাফ করতেন। “আর যতক্ষণ তােমরা এতেকাফ অবস্থায় মাসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশে।[3]
  • হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রাত্রি লাইলাতুল কদর পাওয়ার সুযােগ রয়েছে। এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, নবীজি (ﷺ) বলেন, “আমি এ রাতের সন্ধানে (রামাদানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ পালন করি। অতঃপর ইতিকাফ পালন করি মাঝের দশে। পরবর্তীতে ওহীর মাধ্যমে আমাকে জানানাে হয় যে, এ রাত শেষ দশে রয়েছে। সুজাং, তােমাদের মাঝে যে এ দশে) ইতিকাফ পালনে আগ্রহী, সে যেন তা পালন করে।” [4]
  • সম্পূর্ণ ইতিকাফের সময় নেক আমল হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। ( ইতিকাফকারীগণ যখন ইতিকাফের নিয়ত করে মাসজিদে প্রবেশ করেন তখন সম্পূর্ণ ইতিকাফের সময়ে ফেরেশতাগণ ঐ ব্যক্তির নেকি লিখতে থাকেন। এমনকি ঐ ব্যক্তি মাসজিদে ঘুমিয়ে থাকলেও ফেরেশতাগণ তা নেকি হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন, কারণ সে ইতিকাফরত। )
  • ফেরেশতারা ইতিকাফকারীদের জন্য দুআ করতে থাকেন। (ইতিকাফকারীগণ সালাতের জামাত পড়ে বাসায় চলে যান না। বরং এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্যে মাসজিদেই অপেক্ষারত থাকেন। নবীজি (ﷺ) বলেন, “নিশ্চ ফেরেশতারা তােমাদের একজনের জন্য।)
  • প্রােডাক্টিভ রামাদান ৭ মাসজিদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়। ইকিাহকারীর অন্তরে মাসজিদের ভালােবাসা তৈরি হয়ে যায়। হাদীস অনুযায়ী কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তার সুশীতল আরশের ছায়া প্রদান করবেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন, “ওই ব্যক্তি, মসজিদের সাথে যার হৃদয় ছিল বাধা।[5]
  • আল্লাহর নৈকট্য হসিল হয়। ইতিকাফকারী আল্লাহর স্মরণের জন্য, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহর ঘর মাসজিদে অবস্থান করতে থাকে। এভাবে অবস্থানের কারণে আল্লাহ ইতিকাফকারীর অন্তরে আল্লাহর ভালােবাসা তৈরি করে দেন। কারণ, আল্লাহ বলেন, “সুতরাং তােমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তােমাদের স্মরণ রাখবাে। এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়াে না।[6]

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ। যদি তুমি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, তবে আমি তােমাকে মনে মনে স্মরণ করব আর যদি তুমি আমাকে কোনাে বৈঠকে স্মরণ করাে তবে আমি তাদের চেয়ে উত্তম বৈঠকে তােমার অবণ করব।[7]

  • ইতিকাফকারীর লাইলাতুল কদর মিস হওয়ার কোন সুযােগই নেই। (লাইলাতুল কাদর রামাদানের শেষ দশকে হওয়ার ব্যাপারে হাদীস থেকে জানা যায়। আর ইতিকাফকারী এই সম্পূর্ণ সময়টাই মাসজিদে ইতিকাফবত অবস্থায় কাটান। তাই, লাইলাতুল কদর এই শেষ দশকের যে রাতেই হােক না কেন, ইতিকাফকারী লাইলাতুল ক্বাদর ইবাদাতরত অবস্থাতেই কাটাবেন। অর্থাৎ, ইতিকাফকারীর লাইলাতুল কদরের মহিমান্বিত রাত্রিকে মিস করার কোন সুযােগই নেই।)
  • তাহাজ্জুদ ও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতে অভ্যস্ত হওয়া যায়। (ইতিকাফের সময়টা প্রােডাক্টিভভাবে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকদিন যদি বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত ও রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়, তাহলে একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যাবে, যা রামাদানের পরেও চাইলে অব্যাহত রাখা যাবে বিইযনিল্লাহ।)  
  • সময়কে খুব প্রােডাক্টিভভাবে কাজে লাগানাে যায়। (যেহেতু সম্পূর্ণ সময় বাকি সব কাজ থেকে চিন্তামুক্ত হয়ে আমলে মনােনিবেশ করা হয়ে থাকে, তাই ইতিকাফের সময়কালে চাইলে অনেক প্রােডাক্টিভ আমল করা যায়।)
  • অন্তর নরম ও প্রশান্ত হয়। (আল্লাহওয়ালাদের সাথে আল্লাহর স্মরণে সময় কাটানাের কারণে অন্তরে আল্লাহর মুহাব্বাত তৈরি হয়ে যায়। অন্তরের কাঠিন্য দূর হয়। অন্তর নরম ও প্রশান্ত হয়। ইবাদাতের মিষ্টতা অনুভূত হয়।)
  • গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা যায়। (গীবত, কুৎসা রটনা, মারামারি, অশ্লীলতা ইত্যাদি দুনিয়াবি পঙ্কিলতা থেকে দূরে থেকে ইতিকাফকারী এই দশদিন মাসজিদে ইবাদাতে কাটান। তাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।)
  • নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ট্রেনিং হয়। (ইতিকাফকারী নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে মাসজিদে মুসাফিরের মত জীবন যাপন করে। অহেতুক কথাবার্তা, অধিক ঘুম ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকে। একারণে, নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশিক্ষণ সে লাভ করে। সে বুঝতে পারে, সে চাইলে নিজের নফসকে বাগে আনতে পারে। কট্রোল তার হাতেই রয়েছে। এই ভরসা তার মাঝে ফিরে আসে।)

দুআ করতে থাকে যতক্ষণ সে কথা না বলে সালাতের স্থানে অবস্থান করে।” [বুখাবি, হাদিস-ক্রম : ৬৫৯]

এছাড়াও ইতিকাফের আরাে অনেক উপকারিতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, রামাদান মাসকে যদি আপনি সবচেয়ে বেশি প্রােডাক্টিভভাবে কাজে লাগাতে চান তাহলে আপনার পরিকল্পনায় ইতিকাফ রাখতেই হবে। তা না হলে ইতিকাফকারীগণ এই দশদিনে আপনার চেয়ে অনেক বেশীই হয়ত এগিয়ে যাবেন।

পর্ব- ১ | পর্ব- ২

উৎসঃ প্রোডাক্টিভ রামাদান, পৃষ্ঠা: ১৬৮ – ১৭০


[1] [সূরা বাকারাহ, আয়াত-ক্রম: ১২৫]
[2] [বুখারি, হাদিস-ক্রম :২০২৪, মুসলিম, হাদিস-ক্রম ;১১৭২] [বুখারি, হাদিস-ক্রম :২০৪১]
[3] [সূরা বাকারাহ, আয়াত-ক্রম : ১৮৭]
[4] [মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ১১৬৭]
[5] [বুখাবি, হাদিস-ক্রম : ৬৬০]
[6] [সূরা বাকারাহ, আয়াত-ক্ৰম : ১৫২]
[7] [কানজুল উম্মাল, হাদিস-ক্ৰম : ১১৩৪]

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন