Home ইসলামিক বই পড়ার প্রতি অনীহার প্রতিকার

পড়ার প্রতি অনীহার প্রতিকার

0
96

লেখক: মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ | অনুবাদক: আবদুল্লাহ আল মাসউদ

সব ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য সর্ব প্রথম কাজ হল, আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। তার উপর ভরসা করা। দোআর মাধ্যমে তার আশ্রয় গ্রহণ করা। এর পাশাপাশি অন্যান্য উপায়গুলোও অবলম্বন করা। সেগুলো হলো-

১. ইলম ও জ্ঞানের মূল্য বোঝা। জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। পড়ার গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করা। এগুলো হল প্রতিকারের সবচে কার্যকরী মাধ্যম এবং ধর্মীয় বই-পুস্তকের মর্যাদা ও বারাকাত সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার অন্যতম উপায়। এর জন্য যেসব মাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম তা হল, জুমুআর বয়ান, বিভিন্ন দরস, সেমিনার, আলোচনা সভা, বই-পত্র, প্রবন্ধ- নিবন্ধ ইত্যাদি।

উৎসাহ প্রদান করতে বইপাঠের যেসব উপকারের কথা সাধারণত বলা হয়ে থাকে তার কিছু তুলে ধরা হল।

  • বই পাঠ করলে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন হয়। যার উপর আমল সঠিক হওয়া নির্ভরশীল। অজ্ঞতা দূর হয়ে যায়। এটি দূর না হবার কারণেই মূলত মানুষ নিন্দাবাদে জর্জরিত হওয়া, হারামে লিপ্ত হওয়া ও আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হওয়ায় আক্রান্ত হয় । সুতরাং জ্ঞান হল জীবন ও আলো আর অজ্ঞতা হলো মৃত্যু ও অন্ধকার।
  • আল্লাহর কালাম, নবীগণের কথা এবং উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
  • সময়ের হেফাজত ও তা মূল্যবান কাজে ব্যয় হয়।
  • একজন ব্যক্তি ও তার সময় বিনষ্টকারী বিপথগামী সাথী-সঙ্গীদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

২. পড়ার প্রতি মানুষকে উৎসাহ প্রদান করা । এর জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তা হল-

  • বইমেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা । পশ্চিমারা প্রচুর পরিমাণ এই জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। ফলে তাদের সমাজে বই-সপ্তাহ, লেখক-সংঘ, পাঠক-সংঘ ইত্যাদি সাংস্কৃতির দেখা পাওয়া যায়। পাঠকদেরকে বইপাঠে আরো বেশি উৎসাহিত করে এমন যে কোন ধরনের চিন্তা ও পরিকল্পনার তাদের তুলনায় আমরাই বেশি হকদার। সুতরাং পাঠকদেরকে পড়ার প্রতি উৎসাহিত করার জন্য সব ধরনের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সহায়তা নেওয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য।
  • অধ্যয়ন সম্পর্কীয় সেমিনারের আয়োজন করা। বিভিন্ন স্কুল-মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ধারার কার্যক্রম সংযোজন করা। এবং পড়ার জন্য যথাসম্ভব আলাদাকরে বিশেষ কিছু সময় বরাদ্দ দেওয়া।
  • বিভিন্ন পুরস্কার প্রদান, প্রশংসা করা এবং বড় বড় অক্ষরে লেখা সহজ ভাষার রং-বেরঙের মজাদার শিশুতোষ গল্পের বই সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে ছোট বয়স থেকেই শিশুদের হৃদয়ে বই-পুস্তক ও পাঠের প্রতি ভালোবাসার বীজ বুনে দেওয়া। ব্যয়-খাতের একটা অংশ তাদের বই কিনে দেওয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা। পাশাপাশি তাদেরকে বইয়ের প্রতি যত্নবান হওয়ার ও বইয়ের হেফাজত করার উপদেশ দেওয়া। তবে শিশুদের ভেতর ভয়ের সঞ্চার করে কিংবা তাদের মনোজগতকে দূষিত করে এমন কিচ্ছা-কাহিনীর বই থেকে তাদেরকে দূরে রাখা বাঞ্চনীয় । বিশেষ করে তাদেরকে এমন সব বই-পুস্তক পড়তে দেওয়া উচিত যেগুলোতে সাহাবী, আলেম-উলামা ও বুযুর্গানেদ্বীনসহ এই উম্মতের মনীষী ও বীর-বাহাদুরদের জীবনালেখ্য আলোচিত হয়েছে। যাতে করে তাদেরকে অনুসরণ করার ভাবনা শিশুদের কচি মনের গহীনে গেঁথে যায়।
  • ঘরের ভেতর সুন্দর ও গোছালো ব্যক্তিগত পাঠাগারের ব্যবস্থা করা।
  • বই পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদানকারী নানা রকম প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
  • বিয়ে-শাদী, আকীকা, ঈদ ইত্যাদি বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বই-পুস্তক উপহার দেওয়া।
  • বই প্রকাশের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া এবং যথাযথ মূল্য নির্ধারণ করা। লোভ ও একচেটিয়ে লাভের মনোভাব পরিত্যাগ করা। জনকল্যাণমূলক বিতরণ, উপহার প্রদান অথবা খরচ-মূল্যে বা অল্প লাভে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে যেসব বই প্রকাশ করা হয় সেগুলোর মান ও সৌন্দর্য সঠিক রাখার চেষ্টা করা। এমনিভাবে দূরবর্তী শহরে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থানকারী পাঠকদের হাতে ডাকযোগে বই পৌঁছে দেওয়ার সহজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভ্রাম্যমান পাঠাগারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা।

৩. বই পাঠের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় যে, বইপাঠ ফলপ্রসু কিংবা ব্যর্থ হওয়া এর উপরই নির্ভরশীল। সঠিকভাবে বইপড়া শুরু করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার পূর্বে এর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করে নেওয়া ভাল হবে। তা হল-

মানুষের ভেতর মূল বিষয় হল অজ্ঞতা। আল্লাহ তাআলা বলেন- আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের উদর হতে এমন অবস্থায় ভূমিষ্ট করেছেন যে, তোমাদের কোন জ্ঞানই ছিল না।‘ [সূরা নাহল : ৭৮]

সকাল থেকে নিয়ে বিকেল এই সময়কালের মাঝে সব কিছু শিখে ফেলা অসম্ভব। কোন ব্যক্তি চাইলেও একদিন একরাত সময়ের মধ্যেই সচেতন ও যত্নশীল পাঠক হয়ে উঠতে পারে না। এর জন্য ধৈর্যসহকারে অনুশীলনের দরকার হয়। নিরবচ্ছিন্ন পড়ার ক্ষেত্রে একজন পাঠককে সাধারণত যেসব ধাপ পাড়ি দিতে হয় সেগুলোকে নিম্নোক্ত পাঁচ প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে-

১. প্রথমেই পড়ার প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা সৃষ্টি করা।

এই বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হল প্রচণ্ড আগ্রহ ও উদ্দীপনা থাকা। যেমন অনেকের জীবনীতে ও বিভিন্ন ঘটনায় আমরা এর দৃষ্টান্ত দেখে থাকি।

২. দ্বিতীয়ত একাগ্র অধ্যয়ন।

সাধারণত এর জন্য প্রচণ্ড ধৈর্য আর সহিঞ্চুতার প্রয়োজন পড়ে । এই ধাপে প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠক তেমন ফলাফল ও উপকার দেখতে পায় না। কারণ তিনি নতুন নতুন বিষয়ের সাথে প্রথমবারের মতো সবেমাত্র পরিচিত হচ্ছেন। পঠিত বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা ও উপলব্ধির জন্য তাকে আরো কিছু সময় ব্যয় করতে হবে। পাঠকের উচিত বিরক্ত না হয়ে ধৈর্যের সাথে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখা। কারণ গন্তব্যে পৌঁছতে হলে তো অবশ্যই রাস্তায় দৃঢ়ভাবে থাকতে হয়।

৩. তৃতীয়ত উপলব্ধিমূলক অধ্যয়ন।

এই ধাপে এসে পাঠক উচ্চস্তরে পৌছে যায়। ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও সাধনার ফলস্বরূপ পঠিত বিষয় তার ভালোভাবে বুঝে আসে। কঠিন সব খানা-খন্দক পাড়ি দিয়ে তিনি অধিকাংশ পড়াই বুঝতে সক্ষম হন। আগের জানা বিষয়ের সাথে নতুন করে জানা বিষয়ের সূত্রমূল খুঁজে পান। নিজের ভেতর জ্ঞানগত উন্নতি ও প্রাচুর্যের উপস্থিতি স্পষ্টরূপে অনুভব করতে শুরু করেন।

৪. চতুর্থত পর্যালোচনামূলক অধ্যয়ন।

এই ধাপে এসে একজন মুসলিম পাঠকের সামনে ঐশী পথের দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং তার জ্ঞানের পূর্ণতা আসে। শরঈ মাপকাঠির বিকাশ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত ও বিচার-বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি হয়। এর ভিত্তিতে সে লেখকদের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং তাদের বিচ্যুতি ও পদস্খলন বুঝতে পারার যোগ্যতা অর্জন করে। এভাবেই এক সময় হাতের কাছে পাওয়া সব ধরনের বই পড়া তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে।

৫. পঞ্চমত অনুসন্ধানমূলক অধ্যয়ন।

এই ধাপে এসে একজন পাঠক ইলম ও জ্ঞানের মূলনীতিসমূহ আয়ত্ব করে অধ্যয়ন জগতের প্রশস্ত আঙ্গিনায় বিচরণ করে থাকেন। বড় বড় বই-পুস্তকের জটিল ও কঠিন জায়গাগুলো অনায়াসে পাড়ি দেন এবং অধ্যয়নের বিস্তৃত জগতে বিচরণ করা তার পক্ষে সহজ হয়ে যায়।

পড়ার পদ্ধতি বিষয়ক এই লম্বা আলোচনার পর এবার আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

উৎস: কী পড়বেন কীভাবে পড়বেন, পৃষ্ঠা: ৩৮ – ৪৩

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

NO COMMENTS

আপনার মন্তব্য লিখুন