Home বিষয় সিয়াম (রোজা) ও রামাদান সিয়াম পালনকারীর দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না

সিয়াম পালনকারীর দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না

0
326

লেখকঃ ড. আইদ আল কারণী | সম্পাদনা ও সংযোজনঃ আকরাম হোসাইন

সহীহ হাদীসে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

সিয়াম পালনকারীর দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।[1]

এর কারণ কী? কারণ, সিয়াম পালনকারীর হৃদয় থাকে ভগ্ন। তার মন থাকে নরম। সে তার মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আহার-বিহার বর্জন করেছে। আসমান-যমীনের প্রতিপালকের ভয়ে কামনা-বাসনা ত্যাগ করেছে। ফলে সে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলার নৈকট্যলাভে ধন্য হয়েছে।

নুমান ইবনু বাশির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

দুআই হলাে ইবাদাত।[2]

অতএব, যদি কোথাও দেখা যায়, কোনাে বান্দা কাকুতি-মিনতি করে দুআ করছে তাহলে বুঝতে হবে, সে আল্লাহর নৈকট্যলাভের প্রয়াসী এবং তার প্রতি চূড়ান্ত আস্থা স্থাপনকারী।

একদা সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের রব কি আমাদের নিকটে যে, আমরা তাকে গােপনে ডাকবাে, না তিনি আমাদের থেকে দূরে যে, আমরা তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবাে? তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন—

(হে নবী,) আমার বান্দাগণ যখন তােমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন (তুমি তাদের বললাে যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। সুতরাং, তারাও আমার কথা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করুক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।[3]

আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

তােমরা কোনাে বধির বা দূরবর্তী সত্তাকে ডেকো না; বরং তােমরা এমন সত্তাকে ডাকো—যিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদর্শী। তিনি তাে তােমাদের উফ্রীর গলার চেয়েও নিকটবর্তী।[4]

দুআ হলাে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে এক নিবির সম্পর্কের শক্ত বন্ধন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন—

যে দুআ করে সে কিছুতেই ধ্বংস হয় না।[5]

আল্লাহ তাআলা আমাদের দুআ করার প্রতি আহ্বান করেন। তিনি চান আমরা যেন তার কাছে প্রার্থনা করি। কুরআনে কারীমে ঘােষিত হয়েছে—

তােমরা বিনীতভাবে ও চুপিসারে নিজেদের প্রতিপালককে ডাকো। নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্নকারীদের পছন্দ করেন না।[6]

অন্যত্র ঘােষিত হয়েছে—

তােমাদের প্রতিপালক বলেছেন, আমাকে ডাকো। আমি তােমাদের দুআ কবুল করব। নিশ্চয় অহংকারবশে যারা আমার ইবাদাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[7]

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একটি সহীহ বর্ণনায় এসেছে—

রাসূল (সাঃ) বলেন, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং এই বলে ডাকতে থাকেন, আছে কি কোনাে প্রার্থনাকারী? আমি তার প্রার্থনা পূরণ করব। আছে কি কোনাে আহ্বানকারী? আমি তার আহ্বানে সাড়া দেবাে। আছে কি কোনাে ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবাে।[8]

রামাদান মাস আল্লাহর কাছে চাওয়ার মাস। ক্ষমা প্রার্থনার মাস। দুআ কবুলের মাস। সুতরাং, পিপাসা-কাতর হে সিয়াম পালনকারী, ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্যকারী হে রােজাদার, তুমি তােমার মহান রবের কাছে হাত পাতাে৷ কাকুতি-মিনতি করাে। কায়মনােবাক্যে তার কাছে দুআ করাে। কারণ, তাঁর দৃষ্টিতে এটা মুমিনের প্রশংসিত গুণ। ঘােষিত হয়েছে—

তারা ভালাে কাজে প্রতিযােগিতা করত এবং আমাকে ডাকত—আশায় আশায় ও ভয়ে ভয়ে। আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনীত।[9]

দুআর বেশ কিছু আদব রয়েছে। প্রত্যেকেরই তা জানা উচিত এবং দুআ কবুলের স্বার্থেই সেগুলাের প্রতি লক্ষ রাখা উচিত।

দুআর আদবগুলাে হচ্ছে—

এক. আল্লাহর দয়া ও দানের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে দুআ করা। সহীহ হাদীসে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

তােমাদের কেউ যেন এমন না বলে, হে আল্লাহ, আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করুন। বরং চাওয়ার সময় দৃঢ়তার সাথে চাইবে। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার ক্ষমতা কারও নেই।[10]

দুই. দুআর শুরু, শেষ এবং মাঝখানে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা এবং আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর ওপর দরূদ পড়া।

তিন. দুআ কবুলের বিশেষ মুহূর্তগুলােতে গুরুত্বসহকারে দুআ করা। যেমন—রাতের শেষ ভাগে দুআ করা। সেজদায় দুআ করা। আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়ে দুআ করা। ফরয সালাতগুলাের পর দুআ করা। জুমআর দিনের শেষ সময়ে দুআ করা। আসরের পর দুআ করা এবং আরাফার দিন দুআ করা।

চার. দুআর মধ্যে কৃত্রিম ছন্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। লৌকিকতা ও সীমাল থেকে বেঁচে থাকা।

পাঁচ. কোনাে গুনাহের কাজের জন্য দুআ না করা। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য দুআ না করা।

হে সিয়াম পালনকারী, সূর্যাস্তের পূর্বের সময় তােমার জন্য এক মহা নিয়ামত। ইফতারের পূর্বে যখন তােমার ক্ষুধা ও পিপাসা প্রচণ্ড আকার ধারণ করে তখন তুমি আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করাে। কাকুতি-মিনতি করে তােমার রবের কাছে প্রার্থনা করাে। সাহরীর গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তােমার রবের কাছে প্রার্থনা করাে। প্রার্থনা করতেই থাকে। কারণ, তুমি নিঃস্ব, দরিদ্র। তােমার প্রতিপালক ধনী। তুমি দুর্বল। তিনি সর্বশক্তিমান। তুমি মরণশীল। তিনি চিরঞ্জীব।

প্রিয় ভাই, এমন মহান সত্তার কাছে কেন তুমি হাত পাতবে না? তার দরজায় কেন তুমি কড়া নাড়বে না? অথচ সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ মানবেরাও তাে তার কাছেই চাইত। তার কাছেই হাত পাতত। দেখাে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কী সুন্দর দুআ করেছেন—

হে আমার প্রতিপালক, আমাকেও সালাত কায়েমকারী বানিয়ে দিন এবং আমার সন্তানসন্ততির মধ্য থেকেও (এমন লােক সৃষ্টি করুন, যারা সালাত কায়েম করবে)। হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার দুআ কবুল করে নিন। হে আমার প্রতিপালক, যে-দিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সে-দিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল ঈমানদারদের ক্ষমা করুন।[11]

মুসা আলাইহিস সালাম দুআ করেছেন—

হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিন এবং আমার কাজকে সহজ করে দিন।[12]

সুলাইমান আলাইহিস সালাম দুআ করেছেন—

হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন, যা আমার পর অন্য কারও হবে না। নিশ্চয় আপনিই তাে সবচেয়ে বড় দাতা।[13]

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) কত চমৎকারভাবে আমাদের রবের কাছে প্রার্থনা করেছেন—

হে আল্লাহ, হে জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের রব, হে আসমান-জমিনের স্রষ্টা, আপনার বান্দাদের মধ্যে মতবিরােধের বিষয়গুলােতে আপনিই তাে ফায়সালা করবেন। হকের বিষয়ে যে-মতবিরােধ হচ্ছে সে-বিষয়ে আপনি আপনার অনুগ্রহে আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আপনি তাে যাকে ইচ্ছা তাকে সঠিক পথ দেখান।[14]

দুআর চারটি উপকারিতা রয়েছে—

এক. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সামনে নিজের দাসত্ব প্রকাশ করা; দুর্বলতা ও অক্ষমতা তুলে ধরা এবং তার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এগুলােই ইবাদাতের প্রাণ ও মূল উদ্দেশ্য।

দুই. দুআ করে সাড়া পাওয়া। হয়তাে কোনাে কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জিত হবে; নয়তাে কোনাে অকল্যাণ দূর হবে। আর এর ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে।

তিন. দুনিয়ায় যদি দুআর বাহ্যিক কোনাে ফলাফল না-ও পাওয়া যায় তবুও এর সাওয়াব আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকবে এবং পরকালের কঠিন বিপদের সময় তা পাওয়া যাবে। আর এটাই তাে অধিক কল্যাণকর। অধিক উপকারী।

চার. দুআর মাধ্যমে মানুষের কাছে চাওয়া-পাওয়ার বিশ্বাস দূর হয়। আল্লাহর সাথে বন্ধন দৃঢ় হয়। তাওহীদ ত্রুটিমুক্ত হয়। সব কিছুকে ত্যাগ করে বান্দা আল্লাহমুখী হয়।

হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের যে হিদায়াত দান করেছেন তারপর আর আমাদের অন্তরে বক্তৃতা সৃষ্টি করবেন না। উপরন্তু আমাদের আপনার একান্ত রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি অসীম দাতা।

উৎসঃ ভালোবাসার রামাদান, পৃষ্ঠাঃ ১৬৫ – ১৭১


[1] সুনানু ইবনি মাজাহ : ১৭৫৩
[2] সুনানু আবি দাউদ : ১৪৭৯; জামি তিরমিযী : ৩৩৭২
[3] সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৬
[4] সহীহ বুখারী : ৬০২১; সুনানু বায়হাকী : ৩৯৩
[5] সহীহ ইবনু হিব্বান : ৮৭১
[6] সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৫
[7] সূরা গাফির, আয়াত : ৬০
[8] সহীহ বুখারী : ১১৪৫; সহীহ মুসলিম : ১২৬১
[9] সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ৯০
[10] সহীহ বুখারী : ৭৪৭৭; সহীহ মুসলিম : ২৬৭৯
[11] সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৪০-৪১
[12] সূরা ত-হা, আয়াত : ২৫-২৬
[13] সূরা সােয়াদ, আয়াত : ৩৫
[14] জামি তিরমিযী : ৩৪২০

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

NO COMMENTS

আপনার মন্তব্য লিখুন