জান্নাতের আনন্দসমূহের মধ্যে হাসিও থাকবে পর্ব: ২

0
40

লেখকঃ ড. আয়িদ আল করনী | অনুবাদঃ ডা. হাফেজ মাওলানা মােহাম্মদ নূর হােছাইন

পর্ব: ১ | পর্ব: ২

তাদের যা কিছু ঘটে, তাতেই তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করার ক্ষমতা রাখে। তারা তিলকে তাল করে। তাদের ভালাে কাজ করার ক্ষমতা অবহেলিত এবং তাদের যা আছে যদিও তা প্রচুর পরিমাণে আছে-তাতে তারা কখনও সুখী বা পরিতৃপ্ত নয়। তাদের বিত্তবিভব-সহায় সম্পদ যতই বিশাল হােক না কেন তারা কখনও তাতে কোনরূপ রহমতের কথা বুঝতে পারে না।

জীবন তাে একটি শিল্পকলা বা বিজ্ঞানের মতােই। এই শিল্পকলা বা বিজ্ঞানকে শিখতে হয় এবং চর্চা করতে হয়। পকেটে বা একাউন্টে সহজে টাকা আসার পথকে পরিষ্কার করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে টাকা বাড়ানাের চেয়ে জীবনের প্রতি ভালােবাসার বীজ বপন করা অনেক বেশি ভালাে। চারিত্রিক সৌন্দর্য, মহিমা-গৌরব ও স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি ভালােবাসা চর্চার প্রতি কোনরূপ চেষ্টা-তদবীর না করে যখন জীবনের সমস্ত শক্তি দিয়ে শুধুমাত্র সম্পদের পাহাড় গড়ে তােলার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন জীবনের কী মূল্য আছে?

অধিকাংশ লােকই জীবনের সৌন্দর্যের প্রতি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে না। শুধু সােনা-রূপার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা আরামপ্রদ ও বিলাসবহুল বাগান, সুন্দর ফুলশয্যা, বহমান নদী বা গানেরত পাখির ঝাঁকের মাঝেই তাদের জীবন অতিবাহিত করে। তবে এসব দৃশ্য দেখেও তাদের অন্তর আত্মা কেঁপে উঠে না। তাদের অন্তর শিহরিত হয় না। তাদের মনে সাড়া জাগে না।

তাদের পকেটে টাকা আসা আর যাওয়াই শুধু তাদের মনকে দোলা দেয় বা নাড়া দেয়। টাকা সুখী জীবনের একটি উপায় মাত্র, তারা এ সত্যকে উল্টে-পাল্টে দিয়েছে। তাদের সুখী জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে এবং টাকাকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়েছে। সৌন্দর্যকে দেখার জন্য আমাদের দেহখানিকে নয়নযুগল দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে, তবুও আমরা নেত্রদ্বয়কে শুধুমাত্র টাকার দিকেই তাক করেছি।

নৈরাশ্যের চেয়ে অধিকবার ও অধিক গভীরভাবে ভ্রুকুটি করতে অন্য কিছুই পারে না। আপনি যদি একজন হাসি-খুশি ব্যক্তি হতে চান তবে নৈরাশ্য ও হতাশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনার ও অন্যদের জন্যে সুযােগের দরজা যেমন সর্বদা খােলা আছে, সাফল্যের দ্বারও তেমনি ভােলা আছে। সুতরাং, ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির আশা দিয়ে আপনার মনকে প্রলুব্ধ, উদ্বুদ্ধ, অনুপ্রাণিত, জাগরিত বা চেতনাপ্রাপ্ত করুন।

আপনি যদি মনে করেন যে, আপনি অকিঞ্চিতকর, তুচ্ছ বা নগণ্য এবং কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যই আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তবে আপনার জীবনের সাফল্য বা কৃতিত্ব কখনও এই প্রাথমিক লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যাবে না। আর যদি আপনি মনে করেন, আপনার জীবনের কর্মই হলাে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করা তবে আপনি আপনার মাঝে এমন এক দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অস্তিত্ব টের পাবেন, যা সকল বাধার প্রাচীরকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে পারে। এ কথাটিকে নিম্নোক্তভাবে উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

যে লােক একশত মিটার দৌড় প্রতিযােগিতার অংশগ্রহণ করে, সে দৌড় শেষ করার পর মুহূর্তেই ক্লান্তিবােধ করবে। পক্ষান্তরে কেউ চারশত মিটার দৌড় প্রতিযােগিতায় অংশগ্রহণ করলে সে একশত মিটার বা দুইশত মিটার চিহ্ন অতিক্রম করার পর ক্লান্তিবােধ করবে না। সুতরাং মনই দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি জুগিয়ে দেয় এবং আপনার লক্ষ্যের অনুপাতে শক্তি যােগায়। এ কারণে আপনাকে অবশ্যই আপনার লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং তা হতে হবে উচ্চ (লক্ষ্য)। যতদিন পর্যন্ত সে লক্ষ্যে পৌছার পথে আপনি প্রতিদিনই একটি নতুন পদক্ষেপ ফেলবেন ততদিন পর্যন্ত কখনই হতাশাবােধ করবেন না। কিসে আত্মাকে ভ্রুকুটি করে অন্ধকার কারাগারে বন্দী করে এর অগ্রগতিরােধ করে? উত্তর হলাে- নৈরাশ্য, হতাশা, সবকিছুকেই মন্দ ভাবা, অন্যের দোষ অন্বেষণ করা এবং সবসময় পৃথিবীর দোষ বর্ণনা করা।

ধন্য সে ব্যক্তি, যে ব্যক্তির প্রাকৃতিক দক্ষতা ও গুণকে উন্নত করার জন্য এবং তার (জ্ঞান ও গুণের) পরিমণ্ডলসমূহকে প্রশস্ত করার জন্য একজন সাহায্যকারী শিক্ষক আছে। সর্বোত্তম শিক্ষক তিনিই যিনি তার ছাত্রের মাঝে দয়া ও উদারতা ধীরে ধীরে সঞ্চার করেন। মানুষ যে সর্বোত্তম কাজের জন্য চেষ্টা করতে পারে তা শিক্ষা দেন আর তা হল, সাধ্যানুসারে অন্যের উপকার করা। আত্মাকে সূর্যের মতাে আলাে বিকিরণকারী ও আশাপ্রদ হতে হবে। আত্মাকে কোমলতা, পুণ্য বা সদগুণ, বদান্যতা এবং যারা কল্যাণ পেতে চায় তাদের নিকট কল্যাণ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অকৃত্রিম ভালােবাসা দ্বারা পূর্ণ হতে হবে।

হাসি-খুশি লােকে সমস্যা দেখলে তা কাটিয়ে উঠতে ভালােবাসে। তিনি সমস্যা দেখলে হাসেন, সেগুলাের সমাধান করার সুযােগে প্রচুর আনন্দ লাভ করেন। কুটিকারী ব্যক্তি যখন সমস্যার সম্মুখীন হয়; তখন সে সমস্যাকে বড় করে দেখে এবং এর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করে করে সময় নষ্টের মাধ্যমে নিজের দৃঢ় প্রত্যয়কে খর্ব করে। সে জীবনে সফলতা চায়, তবে এর মূল্য দিতে (পরিশ্রম করতে) রাজি নয়, সে সব পথে দাঁত বের করা সিংহ দেখতে পায়। সে শুধু আকাশ থেকে স্বর্ণ বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে বা জমিন ফেঁটে কোন গুপ্তধন বেরিয়ে আসার প্রতীক্ষা করে।

জীবনে জটিল-কঠিন জিনিস তাে আপেক্ষিক বিষয় মাত্র। কারণ, সাধারণ লােকের কাছে সবকিছুই কঠিন। অপরদিকে উল্লেখযােগ্য লােকের জন্য ভীষণ জটিলতা বলতে কিছুই নেই। যখন স্মরণীয় ব্যক্তিরা বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে নিজেদের মূল্য বৃদ্ধি করে, তখন দুর্বল ব্যক্তি সমস্যার ভয়ে পালিয়ে নিজের হীনতা বৃদ্ধি করে। সমস্যা হলাে পাজি কুকুরের মতাে। এটা আপনাকে ভীতু বা পলায়নকারী দেখতে পেলে ঘেউ ঘেউ করে এবং আপনার পিছু নেয়। অবশ্য, এটা আপনার অবজ্ঞা, নিরুদ্বিগ্নতা ও এটার দিকে আপনার চোখ রাঙাননা দেখলে রণেভঙ্গ দিয়ে পিছু হটে যায়।

এতদ্ব্যতীত হীনমন্যতাবােধের চেয়ে বেশি মারাত্মক আর কোন কিছুই নেই। এটা এমনই অনুভুতি, যা হীনমন্য ব্যক্তিকে তার চেষ্টার চূড়ান্ত পর্যায় সকল বিশ্বাস হারাতে বাধ্য করে। তাই, যখনই সে কোন প্রকল্প শুরু করে তখনই সে এটাকে সমাপ্ত করার ব্যাপারে বা সফলতার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং এই সন্দেহকে প্রশ্রয় দিয়ে তদানুপাতে কাজ করে (অর্থাৎ প্রকল্প বাদ দেয়)। এভাবে সে ব্যর্থ হয়, আত্মবিশ্বাস থাকা এক মহৎ গুণ এবং এটা জীবনে সফলতার ভিত্তি।

এটা লক্ষ্য করা জরুরি যে, আত্মগরিমা ও আত্মবিশ্বাসের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। আত্মগর্ব বলতে বুঝায় প্রবঞ্চণাময় কল্পনার উপর এবং মিথ্যা গর্বের উপর নির্ভর করা। আর আত্মবিশ্বাস বলতে বুঝায়, সত্যিকার দক্ষতার উপর নির্ভর করা; এর অর্থ দায়িত্ব সম্পন্নকরণ, মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাসমূহের উন্নতি সাধন।

একটি হাসি, একটি হাসি-খুশি মুখ, সহজ রীতিনীতি-আচার-আচরণ এবং একটি ভদ্র, উদার আত্মা আমাদের সত্যিই কতই না অভাব! নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: “অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তােমাদের (এতটা) বিনীত হওয়া উচিত, যাতে একে অপরের উপর অত্যাচার না করে, একে অপরের উপর গর্ব না করে।”

পর্ব: ১ | পর্ব: ২

উৎসঃ লা তাহযান [হতাশ হবেন না], ক্রমিক নংঃ ৩৬, পৃষ্ঠা: ৯১ – ৯৪

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আপনার মন্তব্য লিখুন