জান্নাতি নারীদের সর্দার

0
661

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

আমরা এখন কথা বলবাে জান্নাতি নারীদের সর্দার ফাতেমাতুয যাহরা রা. সম্পর্কে। ফাতেমা রা. হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্টতম মানব মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও শ্রেষ্টতম মানবী খাদিজা রা.-এর কন্যা।(খাদিজা রা. হলেন নারী ও পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিণী এবং ইসলামের জন্যে সর্বপ্রথম অর্থব্যয়কারিণী।) এখন আমরা ফাতেমা রা. সম্পর্কে কথা বলবাে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ফামেতা রা.-এর সাথেঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলােচনা করবাে। এর মাধ্যমে সকল বাবারা জানতে পারবে যে, মেয়েদের সাথে তাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত এবং মেয়েরা জানতে পারবে যে, বাবাদের সাথে তাদের আচরণ-উচ্চারণ কেমন হওয়া উচিত।

ফাতেমা রা. হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরকন্যা, জান্নাতের সর্দার হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা, ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি হায়দার রা.-এর স্ত্রী এবং তিনি জান্নাতি নারীদের সম্রাজ্ঞী। ফাতেমা রা, নারী ও পুরুষদের মধ্যে চেহারায় ও চরিত্রে নবি কারিম রা.-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ দিকের ঘটনা। ফাতেমা রা. একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন। ফাতেমা রা. যখন আসতেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসতেন এবং তাঁকে নিজের ডান পাশে অথবা বাম পাশে বসাতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যখন ফাতেমা রা.-এর নিকট যেতেন তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং নিজ আসনে তাকে বসাতেন; কিন্তু এবার যখন ফাতেমা রা. আসলেন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন, কারণ এখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ সময়, তিনি শয্যাশায়ী। ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে বসলেন। আয়েশা রা. বলেন, ফাতেমা রা. আমাদের নিকট আসলেন, তার হাঁটা ছিলাে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাটার মত; কিন্তু এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন,কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন। 

তিনি এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেয়ে আমার! অভিনন্দন তােমাকে, তােমার আগমন শুভ হােক! এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর কানে কানে কী যেনাে বললেন, আর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তিনি যখন কাঁদলেন তাঁর কানে আরাে কিছু বললেন আর তিনি হেসে দিলেন। আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কিছুই দেখিনি যে, প্রথমে কাদলেন এরপর ততক্ষণাত আবার হাসলেন। আমি ফাতেমা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, হে ফাতেমা! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে কী বলেছেন?

তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গােপন রেখেছেন আমি তা প্রকাশ করবাে না। আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর একদিন আমি ফাতেমা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আপনাকে কী বলেছিলেন? তখন তিনি আমাকে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আমাকে বলেছিলেন, হে মেয়ে! জিবরাইল আ. প্রতি বছর একবার করে আমার সাথে কুরআন দাওর তথা পুনরাবৃত্তি করেন;কিন্তু এবছর তিনি আমার সাথে দুইবার কুরআন দাওর করেছেন,তাই আমার মনে হচ্ছে আমার অন্তিম মুহূর্ত সন্নিকটে। ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি কেঁদে দেই ।এরপর তিনি আমাকে বললেন , তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি জান্নাতি নারীদের সম্রাজ্ঞী হবে? ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি হেসে দেই। এটাই আমার সুসংবাদ ও হাসির কারণ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর প্রতি অনেক বেশি লক্ষ রাখতেন, এমনকি আলি রা.-এর সাথে বিয়ের পরও তার খোঁজ-খবর নিতেন। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক যুদ্ধ বন্দি নিয়ে আসা হল। আলি রা, তখন ফাতেমা রা. কে বললেন, একা একা বাড়ির সকল কাজ করতে কি তােমার ক্লান্তি লাগে না? বিয়ের পর থেকে বাড়ির সকল কাজ তিনি একাই করতেন এবং এতে তার অনেক কষ্ট হতাে, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। আগেকার মেয়েরা বর্তমানের মেয়েদের মত এত আরামআয়েশে থাকত না। তাদের কুপ থেকে পানি আনতে হত, চাক্কি ঘুরিয়ে আটা পিষতে হত, উট-ঘােড়ার খাবার দিতে হত, এছাড়াও বাড়ির সকল কাজ নিজেদেরই করতে হত। এখনকার মত তাদের সামনে প্রস্তুতকৃত আটা আসতাে না, কাপড় ধােয়ার জন্যে ওয়াশিন মেশিন ছিলাে না, কল ঘুরালেই পানিবেরুতাে না। বরং তারা অনেক পরিশ্রম করতেন, দূর থেকে পানি আনতেন, আটা পিষতেন, ঘােড়াকে খাবার খাওয়াতেন ইত্যাদি কঠিন ও কষ্টকর কাজগুলাে তখন মেয়েরাই করতেন।

আলি রা, ফাতেমা রা.কে বললেন, ফাতেমা! বাড়ির এত কাজ করতে কি তােমার কষ্ট হয়? আটা পিষতে, ঘােড়ার খাবার দিতে, পানি আনতে, ঝাড় দিতে কি তােমার একার পক্ষে কষ্ট হয়ে যায়? ফাতেমা রা. বললেন, হাঁ আমার কষ্ট হয়।

বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটতাে। তাদের খুব বেশি সম্পদ ছিলােতারা সামান্য যা কিছু জামা করতেন জিহাদ ও যুদ্ধের সফরের জন্যে তা খরচ করতেন। এমনকি আলি রা. ও স্ত্রী ফাতেমা রা, একদিন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। আলি রা. তখন এক ইহুদির ক্ষেতে গেলেন এবং তাকে বললেন, আমি তােমার ক্ষেতে কাজ করতে চাই। সে বললাে, কূপ থেকে পানি উঠাও। কূপের পাশে একটি হাউজ ছিলাে, আলি রা, কূপ। থেকে পানি উঠিয়ে হাউজে রাখতেন। তিনি তার সাথে প্রতি বালতি পানির বিনিময়ে একটি করে খেজুরের চুক্তি করলেন। ভাই! একবার চিন্তা কর, এক মুঠো খাবারের জন্যে তাদের কত কষ্ট করতে হয়েছে, বালতি নিয়ে গভীর কূপ থেকে পানি উঠিয়ে হাউজে রাখা। বিশেষ করে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্যে কতটা কষ্টের!! তা সত্ত্বেও তিনি পানি উঠিয়ে হাউজে রাখলেন। বারটি খেজুর নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং পরিবারকে বললেন, এই নাও তােমাদের খাবার।

আলি রা, ফাতেমা রা.কে বললেন, তােমার কি একজন খাদেমের প্রয়ােজন? ফাতেমা রা. বললেন, হাঁ। আলি রা. বললেন, তােমার বাবার কাছে আজ একজন বন্দি এসেছে, সুতরাং তুমি তার কাছে গিয়ে একজন খাদেম চাও। তখন ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন; কিন্তু তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাই তিনি আয়েশা রা.-এর নিকট গেলেন। কথার এক ফাঁকে আয়েশা রা. তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, বাড়ির সকল কাজ একা করতে আমার কষ্ট হয়, আমি এতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই আমার একজন খাদেম প্রয়ােজন। আয়েশা রা.-এর মন ছিলাে স্বচ্ছ-পরিষ্কার, তাতে ছিলােনা কোনাে হিংসা বা বিদ্বেষের লেশ। তিনি ফাতেমা রা.কে ভালবাসতেন, ফাতেমা রা.ও তাকে মুহাব্বত করতেন। কিছুক্ষণ পর ফাতেমা রা. চলে গেলেন।

অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরলেন আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. এসেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেননা এসেছিল? আয়েশা রা.-এর অন্তর ছিলাে স্বচ্ছ, তার অন্তরে কোনাে ধরনের হিংসা ছিলাে না, তিনি বিদ্বেষবশত এই সংবাদ লুকিয়ে রাখেননি বা বলেননি যে, আমিও তাে বাড়ির কাজ করি, আমিও তাে ক্লান্ত হই, আমারও একজন খাদেম প্রয়ােজন। না তিনি এমনটি বলেননি বরং তিনি ফাতেমা রা.-এর জন্যে সুপারিশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. বাড়ির সকল কাজ একা করে, বাড়ির কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তার কষ্ট হয়, তার একজন খাদেম প্রয়ােজন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনই ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে আসলেন এবং দরজায় আঘাত করে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি কীভাবে ঘরে প্রবেশ করলেন? তিনি কি এসে নিজে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন? তিনি কি ফাতেমা রা.কে খাদেম দিয়েছিলেন?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে এসে দরজায় আঘাত করে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভিতরে ফাতেমা রা.-এর সাথে আলিও রা. ছিলেন। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি সামান্য অপেক্ষা করুন, আমরা ঘরটা একটু গুছিয়ে নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন; বরং তােমরা তােমাদের আপন অবস্থাতেই থাক, কারণ ভিতরে যারা আছেন তাদের একজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে আর অন্যজন মেয়ের জামাই, তাঁর চাচাত ভাই, তার চেয়ে বয়সে অনেক ছােট, ছােটকাল থেকেই যাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তানদের মতই ছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খাদিজা রা. নিজ বাড়িতে তাঁকে লালন-পালন করে বড় করেছেন।তিনি তাে তার ছেলের মতই। তাই তিনি বললেন, তােমরা তােমাদের আপন অবস্থাতেই থাক।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর পাশে বসলেন এবং তাকে বললেন, তুমি কি আমার কাছে গিয়েছিলে? ফাতেমা রা. বললেন, হাঁ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেননা গিয়েছিলে? তিনি বললেন, আমার একজন খাদেম প্রয়ােজন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তােমাকে খাদেমের চেয়ে উত্তম কিছুর সন্ধান দিবাে না? তিনি বললেন, হাঁ অবশ্যই দিবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তােমরা যখন ঘুমাতে যাবে তখন তেত্রিশবার তাসবিহ তথা ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে। তেত্রিশবার হামদ তথা ‘আলহামদুলিল্লাহ, বলবে এবং চৌত্রিশবার তাকবির তথা ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে। তিনি বলেন, এটা তােমাদের জন্যে একজন খাদেম থেকেও উত্তম। তখন আলি রা. ও ফাতেমা রা. চোখে-চোখে তাকালেন, অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাহলে খাদেম? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, খাদেমকে আমি আসহাবে সুফফার জন্যে দিয়েছি, ক্ষুধায় যাদের পেট আর পিঠ একাকার হয়ে আছে।

আসহাবে সুফফা হল ঐসকল দরিদ্র সাহাবি যারা ইসলামগ্রহণ করে নিজ পরিবার-পরিজন ছেড়ে চলে এসেছে; তাদের নিকট আর ফিরে যেতে পারেনি,কারণপরিবারের লােকেরা ছিলাে কাফের এবং তাদেরকে আবারও কুফরির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তাদের উপর চালাতে চরম নির্যাতন। অন্যদিকে মদিনাতেও এমন কোনাে স্থান ছিলাে না যেখানে তারা থাকবে। মুসলিমরা তখন ছিলাে অনেক দরিদ্র অবস্থায়। তাই তাঁরা মসজিদে থাকতেন এবং কাঠ কেটে বিক্রি করতেন অথবা এ ধরনের সাধারণ কাজ করে নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতেন। রাসুলুল্লাহ তাদের জন্যে একটি সুফফা অথবা ছাতা বা শামিয়ানা টানিয়ে দিয়েছিলেন; তাঁরা যার নিচে থাকত। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি এই খাদেমদেরকে আসহাবে সুফফার জন্যে বিক্রি করবাে এবং এর মূল্য আসহাবে সুফফাকে দিবাে। আলি রা. বলেন, আমি এই কথা জীবনে আর কখনই ভুলিনি।

ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক প্রিয় ছিলেন। আর একারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা.ও তাকে অত্যন্ত মুহব্বত করতেন, কারণ তিনি তার মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আবু বকর রা. নিজ সন্তানদের চেয়েও ফাতেমা রা.কে বেশি ভালবাসতেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : নিশ্চয় নবি-রাসুলগণ মিরাস হিসেবে কোনাে সম্পদ রেখে যান না আমরা যে সম্পদ রেখে যাই তা সদকা।

নবি-রাসুলগণ যেনাে সাধারণ মানুষের মত দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে পড়ে এবং সম্পদ জমানাের মত মানবীয় গুণ যেনাে তাদের মধ্যে প্রবেশ না করে তাই আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে শরয়ি বিধান হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তারা যে সম্পদ রেখে যাবে তা মুসলমানদের জন্যেসদকা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কোনাে সম্পদ রেখে যাননি এবং তার পূর্বের কোনাে নবি-রাসুলও মিরাস হিসেবে কোনাে সম্পদ রেখে যাননি। এমনকি দাউদ আ. যিনি ছিলেন বাদশাহ, তিনিও সুলাইমান আ.এর জন্যে মিরাস হিসেবে কোনাে সম্পদ রেখে যাননি, তিনি তার জন্যে মিরাস হিসেবে নবুওত রেখে গেছেন। অনুরূপভাবে যাকারিয়া আ.ও কোনাে সম্পদ মিরাস হিসেবে রেখে যাননি, ইরশাদ হয়েছে :

আমি ভয় করি আমার পর আমার স্বগােত্রকে আর আমার স্ত্রী তাে বন্ধ্যা; কাজেই আপনি নিজ-পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে ইয়াকুব বংশের আমার স্থলাভিষিক্ত হবে। হে আমার পালনকর্তা! তাঁকে সন্তোষজনক করুন।‘ [সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৫-৬]

যাকারিয়া আ. ধনী ছিলেন না, তার নিকট অনেক সম্পদ ছিলাে না। তা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ! আমি একজন পুত্রসন্তান চাই, যে আমার ওয়ারিস হবে। তার যেহেতু সম্পদ ছিলাে না, তাহলে তিনি কিসের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যেতে চান? তিনি ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে নবুওয়ত রেখে যেতে চান, কারণ আম্বিয়া আ. যে সম্পদ রেখে যান তা সদকা। আর তারা পরবর্তীদের জন্যে ইলম ও নবুওয়ত মিরাস হিসেবে রেখে যান।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা. ফাতেমা রা.-এর নিকট এসে বললেন, হে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে! আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় তােমার সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে আমি নিজ সন্তানদের সাথে সম্পর্ক রাখার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি। নিশ্চয় তুমি আমার কাছে আমার সন্তানদের চেয়েও বেশি প্রিয়। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। তুমি কি আমার বাড়ি নিতে চাও, তাহলে নিয়ে নাও। আমার যদি উট, ভেরা বা অন্য কোনাে সম্পদ থাকে তাহলে তুমি তা নিতে চাইলে নিয়ে নাও। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তােমার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারা এবং তােমাকে সম্পদ দিতে পারাকে আমি আমার সন্তানদের সম্পদ দেওয়ার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভূমি সদকা হিসেবে রেখে গেছেন। আমি এখন খলিফা, মুসলমানদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। আল্লাহর শপথ, এই সম্পদ আমি আমার নিজের জন্যে নিচ্ছি না বরং এটা মুসলমানদের বাইতুল মালেসদকা হিসেবে থাকবে। অতঃপর ফাতেমা রা. খুশিমনে তা দিয়ে দিলেন। কেননাই-বা তিনি খুশি হয়ে তা দিবেন না? তিনি যে রাসুল-কন্যা জান্নাতি নারীদের সরদার।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতেমা রা.-এর ইন্তেকাল হয়। তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থতার সময় আবু বকর ও ওমর রা. তাঁকে দেখতে ও অবস্থার খোঁজখবর নিতে আসেন। আলি রা. তাঁদের আগমনের কথা তাঁকে বললেন এবং তাদেরকে আসার অনুমতি দিতে বললে তিনি তাদের আসার অনুমতি দেন। আবু বকর ও ওমর রা. ঘরে প্রবেশ করেন এবং ফাতেমা রা.-এর পাশে বসেন, ফাতেমা রা. তখন পূর্ণ পর্দার সাথে ঘরে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর তারা ফাতেমা রা.-এর জন্যে দোয়া করেন এবং ফাতেমা রা.ও তাদের জন্যে দোয়া করেন। তারা সেখান থেকে চলে আসেন। ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরদীক্ষায় বড় হয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বচ্ছ হৃদয় ও নিরাপদ অন্তরের অধিকারিণী। তিনি সর্বদা মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করতেন। কোনাে সাহাবির প্রতি তার মনে বিন্দু পরিমাণও হিংসা বা বিদ্বেষ ছিলাে না।

বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনিনের সাথে ফাতেমা রা.-এর সম্পর্ক ছিলাে খুব সুন্দর ও নির্মল। আয়েশা রা.-এর সাথে তার সম্পর্ক ছিলাে খুবই প্রশংসনীয়। হাফসা, সাওদা যাইনাব রা.সহ উম্মুল মুমিনিনের সকলের সাথেই তার সম্পর্ক ছিলাে অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকার। তিনি উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা.এর কন্যা ফাতেমা রা., যাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালন-পালন করে বড় করেছেন। এরপর আঠার বছর বয়সে আলি রা.-এর সাথে বিয়ে হয়ে আলি রা.-এর দায়িত্বে চলে যান। তিনি হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা। তিনি তাদেরকে পূর্ণ কল্যাণের উপর বড় করেছেন। এমনকি তিনি তাে হাসান ও হুসাইন রা.কে সঙ্গে নিয়ে বেশিরভাগ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কাটাতেন।

ফাতেমা রা. বর্ণনা করেন কীভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা.-এর সাথে খেলা করতেন, তাদের আদর করতেন। ফাতেমা রা. যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উঠে এসে ফাতেমা রা.কে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং তাকে নিজের ডান অথবা বাম পাশে বসাতেন। আর একারণেই ফাতেমা রা, তার সাথে ও তার সন্তানদের সাথে রাসুলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাঁটার বিভিন্ন হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি খুবই আগ্রহ নিয়ে আনন্দচিত্তে এই হাদিসগুলাে বর্ণনা করতেন।

আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনাে ফাতেমা রা.-এর প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তার মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন, এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনসহ সকল সাহাবিদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তাদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন এবং আমাদেরকেও তাদের সাথে জান্নাতে যাওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ২৪৮ – ২৫৬

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Whatsapp, Telegram, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। ইসলামি দা’ওয়াহ্‌র ৮০ টিরও বেশী উপায়! বিস্তারিত জানতে এইখানে ক্লিক করুন "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন