গাইরুল্লাহর ইবাদত

0
37

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী | অনুবাদক: রাশেদুল আলম

ইসলামে-পূর্বে মানুষের চিন্তা-চেতনা ছিলাে বিক্ষিপ্ত এবং তাদের আকিদা-বিশ্বাস ছিলাে ছাড়ানাে-ছিটানাে। তারা বিভিন্ন মূর্তি-প্রতিমাপূজা করতাে। এরপর ইসলাম এসে তাদের সকল বাতিল ও মিথ্যা চিন্তা-আকিদা মুছে দিল। তাদের অসাড় বিক্ষিপ্ত চিন্তা ও বিশ্বাস নিয়ে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি –

ইমরুল কায়েস, জাহেলি আরবের বিখ্যাত কবি। এক লােক এসে তাকে বলল, ইমরুল কায়েস! অমুক তােমার বাবাকে হত্যা করেছে। ইমরুল কায়েস বলল, সে কি আমার বাবাকে হত্যা করেছে? লােকটি বলল, হাঁ সে তােমার বাবাকে হত্যা করেছে। ইমরুল কায়েস জানতাে যে, সে এখন বেশ উত্তেজিত হবে এবং বাবা-হত্যার প্রতিশােধ নিতে ছুটে যাবে; তাই সে বললাে, আজ মদ পান ও আমােদ-ফুর্তি করবাে, আর আগামীকাল বিষয়টি ভেবে দেখবাে; প্রতিশােধ নিবাে এবং বাবার হত্যাকারীর সাথে বােঝাপড়া করবাে। অর্থাৎ সে আজ মদ পান করবে আর আগামীকাল প্রতিশােধ নিবে। অতঃপর সে এটাই করলাে।

এরপর আগামীকাল, সে পিতা-হত্যার প্রতিশােধ নিতে চাইলাে; তাই সে ভাগ্য নির্ধারণের জন্যে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন কাগজে ‘শাজটি কর’ ‘শাজটি করাে না এই দু’টি বাক্য লিখল এবং একটি পাত্রে করে মূর্তির সামনে রাখল, অতঃপর সেখান থেকে একটি কাগজ বের করলাে। কাগজ খুলে দেখল তাতে লেখা ‘শাজটি করাে না’, এরপর আরেকটা কাগজ নিলাে এবং দেখল ততেও লেখা ‘শাজটি করাে না’ এরপর আবারও আরেকটা কাগজ খুললাে; তাতেও দেখা গেল সে-একই লেখা ‘শাজটি করাে না; তখন সে পাত্রটি মূর্তির মুখে ছুঁড়ে মারলাে। সে ভেবেছিলাে,গােপনপ্রকাশ্য সকল রহস্য মূর্তিটি জানে; তাই তারা মূর্তিকে সম্মান করতাে; আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা না করে তার কাছে প্রার্থনা করতাে।

কখনাে কখনাে তার সামনে পশু বলি দিতাে, বিভিন্ন রঙের বাতি জ্বালাতাে, নাচ-গান করতাে, তার চতুর্দিকে চক্কর দিতাে, এমনকি তুমি ইসলাম-পূর্ব কাবার দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাবে, তার চতুর্পার্শ্বে মূর্তি স্থাপন করা, আর কাফেররা বিভিন্নভাবে তার ইবাদত করছে। তারা বিশ্বাস করতাে, এই মূর্তিগুলাে তাদের উপকার করতে পারে, তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের অসুস্থকে সুস্থ করতে পারে, অনুপস্থিতকে উপস্থিত করতে পারে এবং গােপন-প্রকাশ্য সকল বিষয় জানে। একটা তুচ্ছ পাথরের ব্যাপারেই তারা এতসব ধারণা পােষণ করতাে।

অতঃপর ইসলাম এসে এসবকিছু বাতিল করে দিয়েছে। ইমরুল কায়েস মূর্তির সামনে পাত্র রেখে তার মাধ্যমে ভাগ্য যাচাই করতে চাচ্ছিল; কিন্তু তা থেকে বারবার বের হচ্ছিল, ‘শাজটি করাে না . ‘শাজটি করাে না অর্থাৎ তােমার বাবার হত্যাকারীকে হত্যা করাে না। প্রথমবার যখন ‘শাজটি করাে না’ লেখা বের হল তখন সে ভাবল, হয়তাে মূর্তিকে কিছু সম্পদ দিলে সে সঠিক পরামর্শ দিবে; তাই সে তার সামনে কিছু সম্পদ রাখলাে এবং দ্বিতীয়বার ভাগ্য নির্ধারণ করলাে, তখনাে বের হল ‘শাজটি করাে না’। এরপর সে ভাবলাে হয়তাে তার সম্পদের পরিমাণ কম হয়েছে; তাই সে তার সামনে আরাে সম্পদ রাখলাে এবং ভাগ্য নির্ধারণের জন্যে কাগজ বের করলাে; কিন্তু এবারও বেরুল ‘শাজটি করাে না’ লেখা। সে যখন তিনবার দেখলাে ‘শাজটি করাে না’ ‘শাজটি করাে না’ ‘শাজটি করাে না, তখন রাগান্বিত হয়ে পাত্রটি মূর্তির মুখে ছুঁড়ে মারলাে এবং বললাে, হে মূর্তি! যদি নিহত ব্যক্তি তাের বাবা হতাে, তাহলে তুই বলতি ‘শাজটি কর’, একথা বলে সে পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করতে গেল।

আমার এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য হল একথা বুঝানাে যে, জাহেলিয়াতে মানুষ মূর্তির ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের আকিদা পােষণ করতাে। আবু রাজা আল-আতারিদি রা. বলেন, আমরা জাহেলি যুগে মূর্তি ও পাথরের পূজা করতাম। তিনি বলেন, একবার আমরা সফরে বেরাম এবং আমরা যে মূর্তির পূজা করতাম তাকেও সফরে আমাদের সাথে নিয়ে নিলাম। সফরে আমাদের যখন রান্নার সময় হতাে তখন আমরা তিনদিকে তিনটি পাথর রেখে তার উপর পাতিল রেখে নিচে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করতাম; কিন্তু আমরা যখন তৃতীয় পাথর খুঁজে না। পেতাম তখন আমাদের সেই মূর্তিটিকে তৃতীয় পাথর হিসেবে ব্যবহার করতাম আর বলতাম, যখন আগুন এর নিকটবর্তী হবে তখন সে আগুনের তাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে।

তিনি বলেন, এরকম আমরা একদিন সফরে চলতে লাগলাম। (তুমি জাহিলিযুগে মানুষের নির্বুদ্ধিতার প্রতি একবার লক্ষ করে দেখাে, মূর্তিপূজার ব্যাপারে তারা কতটা নির্বোধ ছিলাে, এরপর দেখাে ইসলাম এসে কীভাবে তা ঠিক করেছে) তিনি বলেন, আমরা একদিন চলতে লাগলাম, তখন আমাদের গােত্রের এক লােক চিৎকার করে বলতে লাগলাে, তােমাদের ইলাহ তােমাদের প্রতিপালক হারিয়ে গেছে,তােমাদের ইলাহকে খুঁজে বের করাে। আমরা তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রতিটি জায়গায় তার খোঁজ করতে লাগলাম, এমন সময় এক লােক চিৎকার করে বললাে, আমি তােমাদের ইলাহকে দেখেছি, তােমাদের ইলাহ কি এমন এমন নয়? তিনি বলেন, আমি তখন তার নিকট গেলাম এবং দেখলাম গােত্রের লােকেরা তার ইবাদত করছে, তার সামনে সিজদাবনত আবস্থায় রয়েছে। আমরা তখন তার সামনে একটি উট বলি দিলাম।

আমি জানি তােমরা আমার এই ঘটনা শুনে হাসবে, যেমন তােমরা হাসাে ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর ঘটনা শুনে। ওমর রা. বলেন, আমার কোনাে সম্পদ ছিলাে না, যা দিয়ে আমি মূর্তি ক্রয় করবাে। তাই আমি কিছু খেজুর জমাতাম এবং তা দিয়ে মূর্তি বানিয়ে তার উপসনা করতাম, তারপর আমার যখন খিদে লাগতাে তখন আমি তা থেকে খেয়ে নিতাম।

জাহেলিয়াতে মানুষ এমন তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয়ের ইবাদত করতাে যেগুলাে না মানুষের কোনাে ক্ষতি করতে পারে আর না কোনাে উপকার করতে পারে। এই তুচ্ছ বিষয়গুলাের ইবাদত এখনও বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ এখনও মানুষ এ ধরনের মাটি ও পাথরের মূর্তির ইবাদত করে, তাদের সামনে মাথানত করে সিজদা করে, তাদের সামনে খাবার রাখে ও পশু বলি দেয়। উদহরণস্বরূপ, তুমি শ্রীলঙ্কা বা জাপানের দিকে তাকাও, তারা জাগতিক দিক থেকে উন্নতি ও অগ্রগতির শীর্ষে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সঠিক পথের সন্ধান পায়নি, তারা শিরকমুক্তভাবে এক আল্লার ইবাদত করে না। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধ ধর্মও মূর্তিপূজার অন্তর্ভুক্ত।

তুমি চিনে যাও, কোরিয়াতে যাও, সেখানেও একই চিত্র দেখতে পাবে। তারা বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী, তারা মূর্তির ইবাদত করে এবং মূর্তির নৈকট্য অর্জনের জন্যে তাদের সামনে মাথানত করে। তাদের ইবাদতের নিদর্শন ও পদ্ধতিগুলাে দেখলে তুমি আশ্চর্য হবে। কীভাবে তাদের আকল তাদেরকে এই অনুমতি দেয় যে, তারা নিজ হাতে স্বর্ণ, পাথর বা মাটি বা অন্য কোনাে পদার্থের মাধ্যমে যে মূর্তি নির্মাণ করলাে, আবার নিজেই সে মূর্তিকে রব হিসেবে ইবাদত করে! নিজ-হাতে নির্মিত মূর্তির সামনে গিয়ে বলে, হে প্রভূ আমাকে ক্ষমা করাে!! আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করাে, আমার অমুক প্রয়ােজন পূর্ণ করে দাও! 

আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে বলেন: হে লােক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হল, অতএব তােমরা তা মনােযােগ দিয়ে শােনাে; তােমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয় তাহলেতারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না; উপাসক ও উপাস্য উভয়েই দুর্বল।’ [সুরা হজ্জ, আয়াত : ৭৩]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: তােমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তােমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তােমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কেয়ামতের দিন তারা তােমাদেরশিরক অস্বীকার করবে। বস্তুত আল্লাহর ন্যায় কেউ তােমাকে অবহিত করতে পারবে না।‘ [সুরা ফাতির, আয়াত : ১৪]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এখানে বর্ণনা করে বলেছেন যে, ঐসকল বৌদ্ধরা যেসকল মূর্তির পূজা করে এবং পূর্বে যাদের পূজা করাহতাে তারা না কোনাে ক্ষতি করতে পারে না কারাে কোনাে উপকার দান করতে পারে।

ঐসকল লােকদের অবস্থা সত্যিই আশ্চর্যজনক। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে চিনে বা জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, হাসপাতালের ডাক্তার, বড় ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী অর্থাৎ অনেক জ্ঞানী ও পণ্ডিত কিন্তু সে লাল কাপড় পরে মূর্তির সামনে এসে মাথানত করছে, তার পাশে তাওয়াফ করছে, তার কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করছে এবং তার চিন্তাউদ্বেগ ও রােগ-শােক দূর করার জন্যে তার নিকট প্রার্থনা করতে চাচ্ছে।

সাথে সাথে ঐসকল লােকদের প্রতি লক্ষ করাে, যারা বিভিন্ন কবরের নিকট যায় এবং আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তার কাছে প্রার্থনা করে। কবরের উপর স্তম্ভ নির্মাণ করে, তার উপর গিলাফ বিছিয়ে রাখে, অতঃপর নিজ হাতে সেটাকে মুছে দেওয়াকে, তার উপর টাকা-পয়সা ছিটানােকে নিজের জন্যে কল্যাণকর ও সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির কারণ মনে করে। তারা সেই কবরের নিকট বিভিন্ন সমস্যার সমাধান কামনা করে। অথচ সেই কবরের অধিবাসী নিজেই নিজের কোনাে উপকার করার ক্ষমতা রাখে না।

হে ভাই! তুমি এসকল কবর নির্মাণের জন্যে টাকা খরচ করার পরিবর্তে কোনাে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করাে বা মানুষের চলাচলের জন্যে রাস্তা নির্মাণ করাে; কিন্তু আফসােসের বিষয় হল মানুষ এসকল কবরের জন্যে মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা খরচ করছে, এরপর তারা সেই কবরের কাছে আসছে এবং আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তার নিকট প্রার্থনা করছে, দয়া ভিক্ষা চাচ্ছে। মাজারের চৌকাঠে চুমু খাচ্ছে, মাথা ঠেকাচ্ছে এবং তাদের কল্যাণকর কাজগুলােকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করছে।

এসকল কবরের সাথে আর হিন্দুদের মূর্তির সাথে কি কোনাে পার্থক্য আছে? মূর্তির কাছেও মানুষ যায়, তার সামনে মাথানত করে, তার কাছে প্রার্থনা করে, রহমত ভিক্ষা চায়। আর কবর বা মাজারের কাছেওমানুষ আসে, তার সামনে মাথানত করে, তার কাছে প্রার্থনা করে রহমত ভিক্ষা চায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এটা পছন্দ করেন না তিনি চান না যে, তার সাথে অন্য কারাে ইবাদত করা হােক। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘এবং এই ওহিও করা হয়েছে যে, সমজিদসমূহ আল্লাহ আআলাকে স্মরণ করার জন্যে। অতএব, তােমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে ডেকো না।‘ [সুরা জিন, আয়াত : ১৮]

আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারাে জন্যে কোনােধরনের কোনাে ইবাদত কখনই জায়েয নেই। যে তার নিজের উপর থেকে একটা মশা তাড়াতে পারে না সে তােমার উপর থেকে বিপদ-আপদ কীভাবে দূর করবে? এবং সে তােমার উপকার করবে কীভাবে?

একেবারে শুরুতে ইসলামে প্রবেশকারী সাহাবায়ে কেরাম রা.ও বিষয়টি বুঝতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসআব ইবনে উমায়ের রা.কে মদিনায় ইসলাম প্রচারের জন্যে প্রেরণ করলেন। তিনি মদিনায় গিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কুরআন শিখাতেন এবং তাদেরকে ইসলামের বিধিবিধান ও হুকুম-আহকাম শিক্ষা দিতেন ও মানুষকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে বলতেন। তার দাওয়াতে আমর ইবনে জামুহ রা.-এর চার সন্তান ইসলাম গ্রহণ করলেন। আমর ইবনে জামুহ রা. একজন বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন, তার চার সন্তান তার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তারা চাচ্ছিল তাদের পিতাও ইসলাম গ্রহণ করুন। তাদের পর তাদের মাতাও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা তাদের পিতাকে বলল, বাবা!

এই শহরে একজন লােক এসেছেন, যিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছেন। তাহলে আপনি কেনাে তার কাছে যাচ্ছেন না এবং তার কথা শুনছেন না? তিনি বললেন, আমি যাচ্ছি না কারণ আমার কাছে ‘মানাফ আছে, আমার কাছে মূর্তি আছে, আমার ইলাহ আছে। তারা বললাে, সমস্যা কি? আপনি তার কাছে যাবেন এবং তার কথা শুনে চলে আসবেন, এতে আপনার কোনাে ক্ষতি হবে না। ছেলেদের কথায় তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন, তার কাছে বসলেন এবং তার কাছ থেকে কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন। অতঃপর তার ও তার মূর্তির সাথে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। আমর ইবনে জামুহ রা. মদিনার রাস্তায় হেঁটেহেঁটে মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন।

তখনকার মদিনা বর্তমানের মদিনার মতাে ছিলাে না। তখন মদিনার ঘরগুলাে ছিলাে পুরনাে, রাস্তাগুলাে ছিলাে মাটির এবং রাস্তার পাশে গাছপালা ছিল। তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গিয়ে তার পাশে বসলেন এবং তাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কিসের দিকে মানুষকে ডাকেন? মুসআব ইবনে উমায়ের রা. বললেন, আমি এক আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকি, যার কোনাে শরিক নেই এবং আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মানুষকে ইমান আনতে আহ্বান করি। অতঃপর মুসআব ইবনে উমায়ের রা. তাকে কুরআন পড়ে শুনালেন। কুরআন শুনে তিনি খুবই প্রভাবিত হলেন; কিন্তু তিনি বললেন, এ বিষয়ে কওমের লােকদের সাথে আমার পরামর্শ করতে হবে।

আমি আমার কওমের সরদার, আমি এখনই কোনাে সিদ্ধান্ত নিতে পারবাে না। অতঃপর তিনি বাড়িতে ফিরে এসে মূর্তি মানাফের নিকট গেলেন এবং বললেন, হে মানাফ! লােকটি তােমাকে ভেঙ্গে ফেলতে চায়, তুমি তাে তার আগমন সম্পর্কে জান। হে মানাফ! এ ব্যাপারে তুমি কি বলাে? তুমি কথা বলছাে না কেননা? তুমি মনে হয় গত রাতে আমার উপর রাগ করেছাে। ঠিক আছে আজ যাচ্ছি, আগামীকাল তােমার কাছে আসবাে। অতঃপর যখন রাত হল তখন তার ছেলেরা মূর্তিটির নিকট আসলাে এবং তা নিয়ে বাড়ির পেছনে ময়লা ফেলার স্থানে রেখে এলাে।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মূর্তির ঘরে গিয়ে সেখানে মানাফকে পেল। তখন সে বললাে, মানাফ কোথায়? আমাদের রব কোথায়? ছেলেরা বললাে, আমরা জানি না। সে তখন তাকে বাড়ির আশপাশে খুঁজতে লাগলাে, অবশেষে বাড়ির পিছনে ময়লার স্থানে গিয়ে পেল। তখন সে বললাে, মানুষ তােমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে, তুমি কি তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলে না? অথচ আমি তােমার কাছে নিজের বিপদাপদ থেকে মুক্তি কামনা করি। এরপরও সে তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে ভালভাবে ধৌত করে সুগন্ধি মেখে ঘরে রাখলাে। অতঃপর বললাে, হে মানাফ! লােকেরা তােমার সাথে খারাপ ব্যবহার করার । কারণে, তােমাকে অপমান করার কারণে মনে হয় গত রাতে তুমি আমার উপর রাগ করেছে। এরপর রাতে তিনি একটি তরবারি এনে তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন এবং বললেন হে মানাফ!

একটা বকরিও তাে তার পাছাকে হেফাযত করে। তাহলে তােমার কি হল? তুমি কেনাে নিজেকে রক্ষা করতে পারাে না? এই নাও তরবারি, এটা দিয়ে তুমি আত্মরক্ষা করবে। গভীর রাতে তার ছেলেরা এসে গলা থেকে তারবারিটা সরিয়ে তার সাথে একটা মৃত কুকুর বেঁধে একটি পরিত্যাক্ত কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসলাে। পরদিন সকালে উঠে সে মানাফকে খুঁজতে লাগলাে; কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিলাে না। তখন সে বলল, কে আমাদের ইলাহের সাথে শত্রুতা করছে? ছেলেরা বললাে, আমরা জানি না। অতঃপর সে খুঁজতে খুঁজতে সেই পরিত্যাক্ত কূপের কাছে গেল এবং তাতে তাকিয়ে দেখে তার ইলাহ যার ইবাদত সে করে তা একটি মৃত কুকুরের সাথে বাঁধা অবস্থায় সেখানে পড়ে আছে। তখন সে বললেন: যার মাথার উপর শিয়াল পেশাব করে সে কি রব হতে পারে। যার উপর শিয়াল পেশাব করে সে তাে ব্যর্থ।

অথবা তিনি বলেন: আল্লাহর শপথ, তুমি যদি ইলাহ হতে তাহলে তুমি একটি মৃত কুকুরের সাথে পরিত্যাক্ত কূপে থাকতে না।

এরপর তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।

যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারাে ইবাদত করে, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, রােগ মুক্তি চায়, আল্লাহ তাআলা তাদের বিষয়টা তার সাথেই সম্পৃক্ত করে দেন। সেটা কোনাে কবর হােক, মূর্তি হােক বা গরু-ছাগল যাই হােক। মানুষের কর্মকাণ্ড এবং তাদের ইবাদতের বস্তু দেখলে সত্যিই তুমি আশ্চর্য না হয়ে পারবে না।

সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ ইবাদত প্রবণ, সে কিছুর না কিছুর ইবাদত করবেই। তাই আল্লাহ তাআলা নবি-রাসুলদের মাধ্যমে মানুষের নিকট এই ওহি পাঠালেন যে, তারা যেনাে এক আল্লাহর ইবাদত করে, তার সাথে কারাে শরিক না করে; কিন্তু মানুষ সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে। বিভিন্ন জিনিসের পূজা করে। তুমি যদি বর্তমানে মানুষের ইবাদতের প্রকার ও প্রকৃতি দেখাে তাহলে অবাক হয়ে যাবে। উদহরণস্বরূপ, তুমি হিন্দুস্তানে গেলে দেখবে সেখানে মানুষ অতিতুচ্ছ জিনিসেরও পূজা করছে। তুমি সেখানে অনেক শিক্ষিত লােককে দেখবে সে গাভীর নৈকট্য অর্জন করার জন্যে, তার ইবাদত করার জেন্যে তার পিছনে ছুটছে। গাভী কখনাে যদি রাস্তা আটকে দাড়িয়ে থাকে তাহলে সেখান থেকে সেটাকে সরিয়ে দিতে তারা ভয় পায়। অথচ সেটা একটা গাভী! তুমি সেখানে এমন লােকও দেখতে পাবে, যে গাভীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে তার পিছনে অনেক সম্পদ ব্যয় করছে, অথচ এই পরিমাণ সম্পদ সে তার মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে ও পরিবার-পরিজনের জন্যেও ব্যয় করে না। একটা গাভী!! একটা প্রাণী!!!

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা খৃস্টানদের আলােচনায় বলেন: আল্লাহকে বাদ দিয়ে তােমরা যাদেরকে ডাকো, তারা সবাই তােমাদের মতােই বান্দা। অতএব, তােমরা যাদেরকে ডাকো, তখন তাদের পক্ষেও তাে সে ডাক কবুল করা উচিত, যদি তােমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।‘ [সুরা আরাফ, আয়াত : ১৯৪]

ইসা আ. আল্লাহর বান্দা, তাহলে কীভাবে তুমি তার ইবাদত করাে? অনুরূপভাবে গরু আল্লাহর সৃষ্টির একটা অংশ, সেও আল্লাহর ইবাদত করে, তাহলে তুমি কীভাবে তার পূজা করাে? আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে বলেন: সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলাের মধ্যে যা কিছু আছে সমস্তকিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘােষণা করে। এবং এমন কিছু নেই তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘােষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘােষণা তােমরা অনুধাবন করতে পারাে না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল।‘ [সুরা ইসরা, আয়াত : ৪৪]

অনুরূপভাবে সে নিজেও তাে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নাজাত কামনা করবে, কারণ কিয়ামতের দিন প্রতিটি প্রাণীর বিচার করা হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘নিশ্চয় কিয়ামতের দিন শিংবিহীন ছাগলের জন্যে শিংবিশিষ্ট ছাগলকে তাড়িয়ে নিয়ে আসা হবে। অর্থাৎ শিংবিহীন ছাগলকে দুনিয়াতে যদি শিংওয়ালা ছাগল তার শিং দিয়ে গুতা দেয়, তাহলে শিংবিশিষ্ট ছাগল থেকে শিং নিয়ে শিংবিহীন ছাগলকে দেওয়া হবে, অতঃপর সে দুনিয়াতে যেভাবে তাকে গুতা দিয়েছিলাে সেভাবে তাকে গুতা দিবে।

সুতরাং এই গরুও কিয়ামতের দিন নিজের মুক্তি কামনা করবে। সে জানে যে, কিয়ামতের দিন তার থেকে প্রতিশােধ গ্রহণ করা হবে, কারণ আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন এমন কাউকে শাস্তি দিবেন না যাকে তিনি দুনিয়াতে সে ব্যাপারে সতর্ক করেন নি। আল্লাহ তাআলা বলেন: কোন রাসুল না পাঠানাে পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।‘ [সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ১৫]

এই বিষয়টা গরুও জানে যে, তাকেও কিয়ামতের দিন হিসেবের মুখােমুখি হতে হবে। তা সত্ত্বেও এই লােকগুলাে তার সামনে আসে, তাকে পূজা করে। শিক্ষিত অনেক বড় বড় সার্টিফিকিটের অধিকারী লােকজন গরুর পিছন পিছনে দৌড়ায়- তার ইবাদত করার জন্যে, তার নৈকট্য অর্জন করার জন্যে।

মানুষ যদি আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়, তার সাথে অন্য কিছুর শরিক করা শুরু করে (আল্লাহর কোনাে শরিক নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়) তাহলেও আল্লাহর কোনাে ক্ষতি হবে না, কারণ এসবকিছু আল্লাহ তাআলার নিকট একটি মশার পাখার সমানও না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সারা দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহ তাআলার নিকট একটা মশার পাখার সমানও হত তাহলে তিনি একজন কাফেরকেও একফোঁটা পানিও পর্যন্ত পান করাতেন না।

হে ভাই! সারা দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহ তাআলার কাছে একটি মশার পাখার সমানও না হয় তাহলে ঐ কাফেরের ব্যাপারে তােমার কী মতামত, যে আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তাআলার সাথে অন্যকে শরিক করে?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দাউস গােত্রের নারী ‘যুল খুয়াইস’ নামক মূর্তির সামনে এসে তাদের পাছা নাড়াবে। (অর্থাৎ যুল খুয়াইস নামক মূর্তির পূজা করবে।)

যুল খুয়াইস একটি মূর্তির নাম। জাহেলি যুগে দাউস গােত্রের লােকেরা যার ইবাদত করতাে। আর দাউস হল আরবের দক্ষিণে অবস্থিত কয়েকটি গােত্রের নাম।

সুতরাং মানুষ আবারও মূর্তি পূজার দিকে ফিরে যাবে। আর একথাটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বলেছেন: কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দাউস গােত্রের নারী যুল খুয়াইস নামক মূর্তির সামনে এসে তাদের পাছা নাড়াবে। অর্থাৎ মানুষ তাওহিদ থেকে দূরে সরে গিয়ে আবার মূর্তিপূজায় লিপ্ত হবে। তারা বিভিন্ন শিরকের মধ্যে পতিত হবে।

কার্যতই বর্তমানে তুমি অনেক মানুষকে দেখবে কবরকে সম্মান করছে, তার পাশে তাওয়াফ করছে, ঘুরছে, তার সামনে বসে মাথানত করছে, তার কাছে প্রার্থনা করছে; কিন্তু তুমি তাকে কখনাে মসজিদে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে দেখবে না। এরপরও সে বলবে যে, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। সত্য কথা হল, তুমি আল্লাহর ইবাদত করাে না। তুমি যদি আল্লাহর ইবাদত করতে চাও তাহলে একনিষ্ঠ হয়ে শিরকমুক্তভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করাে। তুমি ইবাদতের ক্ষেত্রে কখনাে সীমালঙ্ঘন করাে না। তােমার ইবাদত, তােমার দোয়া-মুনাজাত, কান্না-কাটি যেনাে হয় একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যে। তা যেনাে কোনাে মূর্তি, কবর অথবা কোনাে মানুষ বা ভূতের জন্যে না হয়।

হে আল্লাহ! আপনি আমদেরকে শিরকমুক্ত একত্ববাদী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন!!

উৎস: আত্মবিশ্বাসপৃষ্ঠা: ১৯ – ৩০

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

দ্বীনী খিদমায় অংশ নিন

আপনার মন্তব্য লিখুন